২৯, এপ্রিল, ২০২১, বৃহস্পতিবার

আনমনা আনুর চলে যাওয়ার আজ দুই বছর

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : আনোয়ার হোসেন আনু ওরফে আনমনা আনোয়ার একেধারে একজন কবি, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মী ও সংগঠক ছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ ঠা জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ শহর লাগোয়া পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তিনি। শহরের মানিকপুর গ্রামে নতুন বাড়ি করে মা, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন আনোয়ার হোসেন আনু। তার প্রয়াত বাবা আবুল হোসেন মেম্বার ছিলেন পঞ্চসারের একজন সমাজসেবক।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মানুষটি মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের একদল সহকর্মীর সাথে আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল ভোর সকালে কক্সবাজারের একটি হোটেলে হ্নদযন্ত্রের ক্রীয়াাবদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি তার মা, স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, এক ভাই ও দুইবোনসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আনু ছিলেন সবার বড়।

আনোয়ার হোসেন আনু ছিলেন একজন আড্ডা প্রিয় ও ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। নিজ খরচেই বন্ধু, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে আনন্দ আড্ডায় বের হয়ে যেতেন। ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল রাত ১২ টার দিকে মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সহকর্মীদের সাথে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ২৬ এপ্রিল ভোরে বান্দরবান থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর ২৭ এপ্রিল রাত ৯ টার দিকে কক্সবাজারের সী-গাল হোটেলে উঠেন সহকর্মীদের সাথে। এরপর ২৮ এপ্রিল ভোর সকালে আকস্মিক স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেন আনমনা আনোয়ার।
আনমনা আনোয়ার ছিলেন মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য। তিনি সংস্কৃতি কর্মী ও সাংবাদিক হলেও তার অধিক পরিচয় ছিলো একজন কবি হিসেবে।

‘অচলায়তনের মুখোশ পরা সচল মানুষ আমি, নিজেকে ভাঙছি আর জানছি, মানুষ হওয়া অতো সোজা নয় এবং সংগ্রামের ইতিহাস হচ্ছে মূলত প্রতিরোধের ইতিহাস, গোলাপ জল দিয়ে গা ধুয়ে কখনো সংগ্রাম হয়না। মনে রাখতে হবে সুন্দর জীবন ভাগ্যের লিখন নয়, কাজ আর সংগ্রামের মাধ্যমে সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে হয়, নিজের দেশ আর নিজের মর্যাদার জন্য মানুষের সংগ্রাম চিরকালীন-এমনসব কবিতা লিখেছেন তিনি।

তিনি ছিলেন মূলত প্রেম ও দ্রোহের কবি। তিনি কোন কবিতা পান্ডুলিপি করেননি। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন এবং স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে অসংখ্য কবিতা ছাপা হয়েছে তার। তিনি অধিকাংশ কবিতা তার ফেসবুকে পোস্ট দিতেন। সৃজনশীল মানুষদের ম্যাসেনজারে দিতেন।

আনোয়ার হোসেন আনু ছিলেন, মুন্সীগঞ্জের অন্যতম নাট্য সংগঠন থিয়েটার সার্কেলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি।

নিজের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন কালেরছবি। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কালের ছবি সংগঠনকে প্রতিষ্ঠিত করতে তার শেষ চেষ্ঠা ছিলো। তার সংগঠনের কর্মীদের পাশে থাকতে সবসময়। উৎসাহ ও শক্তি যোগাতেন। প্রায়ই নিয়ে যেতে আনন্দ ভ্রমণে। আড়িয়ল বিলে কালের ছবির আয়োজনে একাধিকবার ভ্রমণে গিয়েছেন কর্মীদের নিয়ে।

এতোকিছুর পরও তিনি কখনো নিজেকে একজন সাংবাদিক, কবি, সংস্কৃতি কর্মী বা সংগঠক হিসেবে পরিচয় দেননি। নিজের সংগঠনের বাইরের অন্যান্য সংগঠনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন গোপনে।

তার কাছের মানুষগুলোর বিপদে শারীরিক ও আর্থিকভাবে এগিয়ে গেছেন সবসময়। এলাকার বহু অসচ্ছল মানুষের পাশে দাড়িয়েছে আর্থিক সহায়তা করে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির মাংস পৌছে দিতেন।

আনোয়ার হোসেন আনু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকার মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে গেছেন। মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের তিনবারের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন সজলের হাত ধরে তার সাংবাদিকতা শুরু। মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত তারা দুইজন একসাথে ছিলেন। নির্বাচনী পেশাগত দায়িত্ব পালনেও তারা একসাথে ছুটে বেড়াতেন।

আনোয়ার হোসেন আনুর কর্মময় জীবন ধরে রাখার জন্য তার নামানুসারে ২০২০ সালে ১৮ মার্চ ‘আনমনা প্রাঙ্গণ’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন তার সহকর্মী মোজাম্মেল হোসেন সজল। এরই মধ্যে দেশে দেশে করোনা ভাইরাস দেখা দেয়। সংগঠনটির একদল কর্মী করোনা মহামারির শুরু থেকে বিভিন্ন মানবিক কাজ শুরু করে। আনমনা প্রাঙ্গণ শুরুতে মুন্সীগঞ্জ শহরের বিভিন্ন মসজিদ ও শহরে মাস্ক বিতরণ করে। এরপর মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তায় করে। গত বছর শহরের অভুক্ত কুকুরের পাশেও দাঁড়ায় আনমনা প্রাঙ্গণ। আনমনা প্রাঙ্গণের কর্মীরা সন্ধ্যার পর মুন্সীগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানে থাকা অভুক্ত কুকুরদের মাঝে খাবার বিতরণ করে।
শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ এলাকায় বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করে।

গত বছর আনোয়ার হোসেন আনুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আনমনা প্রাঙ্গণের পক্ষ থেকে মসজিদে মসজিদে দোয়া, ইমাম ও দরিদ্রদের মাঝে করোনা সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। দেশে করোনা ভাইরাসে সে সময় মসজিদে মুসল্লি কমে যাওয়ায় ইমামদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের মাসিক বেতনও অনিশ্চিত ছিলো। অনেক ইমাম তার পরিবার অন্য জেলায় রাখেন। সেদিকটি বিবেচনা করে মানবিক সহায়তা হিসেবে তাদের মাঝে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়। এছাড়া মসজিদে মসজিদে দোয়া ও গরীবদের মাঝেও নগদ অর্থ বিতরণ করে সংগঠনটি। আজ আনোয়ার হোসেন আনুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আনমনা প্রাঙ্গণ একই কর্মসূচি পালন করছে বলে সংগঠনের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন সজল জানিয়েছেন।
এদিকে, আনমনা প্রাঙ্গণের কর্মীদের উৎসাহ ও শক্তি যোগাতে সংগঠনটির সভাপতি বিভিন্ন সময়ে আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করে। সংগঠনের পক্ষ থেকে আড়িয়ল বিল ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। নানা শ্রেণিপেশার কমীদের নিয়ে যাওয়া হয় পানাম নগরী ও সোনাগাঁ যাদুঘরে। সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীতে। এরপর কর্মীরা আনন্দ আড্ডায় ফটোগ্রাফিতে বের হয় চাঁদপুরের ল্যাংটা মেলা ও মেঘনা নদী ভ্রমণে।
এছাড়া সংগঠনের কর্মীদের জন্মদিনও পালন করা হয়

সর্বশেষ নিউজ