২৩, সেপ্টেম্বর, ২০২১, বৃহস্পতিবার

ইতিহাসে কিভাবে উপেক্ষিত পুলিশ?

১. বাংলাদেশের পুলিশ বরাবরই হতভাগা একটি বাহিনী। বাংলাদেশের ইতিহাসেও উপেক্ষিত একটি আত্মোৎসর্গকৃত বাহিনী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাজারবাগে পুলিশের আত্মত্যাগের ইতিহাস সবারই জানা। সেই কালো রাতে সবপ্রথম থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে অসীম সাহসিকতার পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেখিয়েছিলেন অকুতোবীর পুলিশ সদস্যরা। একরাতেই আটশতাধিক পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন তৎকালীন ঝিনাইদহ মহকুমায় পুলিশ প্রশাসক (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দিন আহমদ। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল থানার বাঙালি পুলিশ সদস্যরা থানার অস্ত্রাগার লুট করে সকল অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেয় এবং নিজেরাও বীরত্বের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পাক বাহিনীর সাথে বীরত্বের লড়াই করে পুলিশের ডিআইজিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কয়েক হাজার বাঙালি পুলিশ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এত আত্মত্যাগের পরও স্বাধীনতা অর্জনের পর বীরশ্রেষ্ঠ কিংবা বীরউত্তম খেতাবে স্থান হয়নি কোন অকুতোভয় শহীদ পুলিশ সদস্যের নাম। একাত্তরের সাহসিকতার জন্য ১৯৭৩ সালে যে খেতাব দেওয়া হয় সেটির নিয়ন্ত্রণ ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। ফলে তারা শুধু নিজেদের লোকদেরই খেতাব প্রদান করে। তাই পুলিশের কাউকে খেতাব দেওয়া হয়নি। তাইতো আজও মুক্তিযুদ্ধে অকুতোবীর পুলিশের ভূমিকা প্রবলভাবে উপেক্ষিত ?

২. ১৯৭৫ সালে পিজিআর গঠনের আগ পর্যন্ত ঢাকা জেলা পুলিশ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতো। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ ভোররাতে পিজিআর সদস্যরা অস্ত্র হাতে আত্মসমর্পণ করেছিল। সেদিন রক্ষিবাহিনীরও কেউ বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে নাই। তাই ভোরে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর আক্রান্ত হলে সবপ্রথম পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্য বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে তার নিকট থাকা ক্ষুদ্র অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। তার খেসারত হিসেবে ঘাতক সেনাদের গুলিতে ঘটনাস্থলে শহীদ হন পুলিশের এএসআই ছিদ্দিকুর রহমান। গুলিবিদ্ধ হন পুলিশের ডিএসপি অফিসার নুরুল ইসলাম খান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শহীদদের তালিকার মধ্যে কর্নেল জামিলের ছবি দেয়া হয়। তাই সবাই মরহুম জামিল সাহেবের আত্মত্যাগের ইতিহাস জানার সুযোগ পান। কিন্তু শহীদ এএসআই ছিদ্দিকুরের নাম ক’জন জানেন? কারণ কোন সরকার বিষয়টিকে সামনে আনেনি। শুধু তাই নয় স্বামী মারা যাওয়ার পর অদ্যবধি কোনো পেনশন দেয়া হয়নি এএসআই ছিদ্দিকুরের পরিবারকে। শেখ মুজিবের ভালবাসায় জীবন দিয়েছিল এএসআই ছিদ্দিকুর। তাঁর কন্যা এখন ক্ষমতায়। শেখ হাসিনা দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করছেন। আজও জাতির কাছে প্রশ্ন কেন এএসআই ছিদ্দিকুরের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না ?

৩. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার শাসন আমলে ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিপার্টমেন্টাল পুলিশ ও বিসিএস ক্যাডার পুলিশের সংখ্যা পুলিশে অর্ধেক-অর্ধেক করার নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। সেই নির্দেশও ৫০ বছরের বাস্তবায়ন হয়নি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৬ষ্ঠ গ্রেড) পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৫০% ইন্সপেক্টর (৯ম গ্রেড) এবং ৫০% সরাসরি এএসপি(৯ম গ্রেড) হতে পূরন করার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাধা কোথায়? বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার সেই ফাইল কোথায় ? কেন এটা উপেক্ষিত ? কতিপয় স্বার্থবাদী পুলিশের কর্মকর্তার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও পুলিশের দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। ফলে ৯৩ ভাগ ডিপার্টমেন্টাল পুলিশ পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে চলে যান। পুলিশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর দেখা প্রায় সব স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূরণ করেছে। তবে কেন এটা উপেক্ষিত ?

৪. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন প্রথমে হল দেশপ্রেম। তোমরা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত থেকো। নিজের মাকে যেভাবে ভালবাস, তেমনি দেশের প্রতি ভালবাসা নিয়ে নিজের কাজটুকু কর। পুলিশ সেই কথা মনে রেখেছিল। কোভিড-১৯ কারণে মানবিক বিপর্যয় যখন তুঙ্গে, চিকিৎসক যখন রোগী রেখে হাসপাতাল ছেড়েছে, আপনস্বজনরা যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখন করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর পাশে দাড়িয়েছে পুলিশ, জঙ্গলে ফেলে যাওয়া মাকে, জ্বর নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবককে কিংবা করোনা রোগীকে হাসপাতালে নিয়েছে ও নিচ্ছে পুলিশ। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফন করার কেউ নেই তখন পুলিশ লাশ কাঁধে নিয়েছে ও নিচ্ছে, দাফন করেছে। অসহায় অভুক্তদের নিজেদের অর্থে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে দিয়েছে ও দিচ্ছে। ২০২০ সালে বৈশ্বিক অদৃশ্য অনুজীব করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম অগ্রনী ভূমিকা সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। হাজারের উপরে পুলিশ সদস্য এই করোনা যুদ্ধে দেশের সেবায় আত্মোৎসর্গ করেছে। তাদের পরিবারও বিসর্জন দিচ্ছে অনেক কিছু। তবু অবিচল এই সম্মুখযোদ্ধারা লড়াইয়ে বিন্দু মাত্র ক্ষান্ত হয়নি। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে পুলিশ যেভাবে জীবনের পরোয়া না করে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, ইতিহাস বলে তবু পুলিশের এই নিরলস ও আন্তরিকতার একদিন জাতির কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।

পলাশী থেকে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীর ইতিহাস বলে, পুলিশ কখনই দেশ মাতৃকা এবং কোন রাষ্টনায়কের বিশ্বাসের সাথে বেইমানি করেনি। কোন পুলিশ সদস্যের গুলিতে রক্তাক্ত হয়নি বঙ্গবন্ধুর কিংবা কোন রাষ্টনায়কের বুক। তবু বারবারই দেশে মাতৃকার সেবার পুলিশের আত্মত্যাগের ইতিহাস বরাবরই ট্রাডেজি হয়ে আছে। যদিও স্বীকৃতির পাতায় বরাবরই বাংলাদেশ পুলিশের অবদান উপেক্ষিত থেকে যায়, তবু বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ও পুলিশের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি জাতি একদিন অবশ্য স্মরণ করবে এটা আশা করছি।
লেখক : জাহাঙ্গীর হোসেন, এএসপি (অবঃ)।

সর্বশেষ নিউজ