১৯, অক্টোবর, ২০২১, মঙ্গলবার

এক জমিতেই ফল-সবজি চাষে সফল টাঙ্গাইলের শাকিল

ইমরুল হাসান বাবু,টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে এক জমিতে শসা, বিদেশি জাতের তরমুজ ও বাঙ্গি চাষ করে সফল হয়েছেন তরুণ কৃষিবিদ শাকিল আহমেদ। তার এক জমিতে তিন ফসলের ফলন ভাল হওয়ায় এলাকায় সাড়া ফেলেছে।

তার এই সফলতা দেখে আশেপাশের কৃষকরাও তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ করার সিদ্ধান্তনিয়েছেন। তিনি উপজেলার আতিয় াইউনিয়নের গোমজানি গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে ও নোয়াখালীবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

শাকিল আহমেদ জানান, ২০১২ সালে পার্শ্ববর্তী ছিলিমপুর এমএকরিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল শহরের মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি শেষ করেন। ২০২০ সালে নোয়াখালীবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কৃষিবিভাগ থেকে বিএসসি শেষ করেন। প্রথম লক ডাউনের কারণে পরিবারের সঞ্চয়করা অর্থ তখন প্রায় শেষেরদিকে। পরিবারে অর্থনৈতিকমন্দা, টানাপোড়েন। ভাবলেনবসেনা থেকে কিছু একটা করা উচিত।

লক ডাউন শিথিলের পর বেসরকারি চাকরির জন্য আবেদন কর শুরু করেন। লক ডাউনি শথিল হলেও করোনা দুর্যোগে তখন বেসরকারি সেক্টরগুলোও সংকটে। আবেদনের পর কয়েকটি মার্কেটিং কোম্পানি এব ংপ্রাইভেট হসপিটালের অ্যাডমিন শাখা থেকে ভাইভারজন্য ডাক পান তিনি। ভাইভা শেষে বেতন, কাজের চাপ এবং সময় সম্পর্কে জানার পর ভাবলেন বিএসসি শেষ করে চাকরিতে প্রবেশকরে খুব বেশি আরাম কিংবা একটুভালো বেতন আশা করা অবাস্তব।

এর পর চাকরির চিন্তামাথা থেকে ঝেড়ে নিজ সাবজেক্ট সম্পর্কিত কিছ ুকরার মনস্থিরকরেন, যেখানে তিনি নিজে কাজকরবেন এবংঅন্তত দুজন লোকতার সঙ্গে কাজ করে উপকৃত হবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এক ইঞ্চিজমিও যেনঅনাবাদি না থাকে’। কৃষিবিভাগেরশিক্ষার্থী হিসেবে কৃষিসম্প্রসারণ বিভাগের বসতবাড়িতে সবজিচাষ এবংপারিবারিক পুষ্টি চাহিদার প্রজেক্ট নিয়ে বাসায় কাজ করে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন শাকিল। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই ন্টারনেট এবং ইউটিউবে সার্চ করতে শুর ুকরেন বাণিজ্যিক ভাবে কি চাষ করা যায়।

ইউটিউবে কৃষি সমাচার চ্যানেলের ভিডিও থেকে তিনি স্কোয়াশ, শসা, তরমুজ ও বাঙ্গি চাষসম্পর্কে ধারণা নিয়ে তা রবাবাকে জানান। বাবার আশ্বাস পেয়ে চিš Íাকরেন ভিন œউপায়ে চাষাবাদ করার। কম পরিশ্রমে অধিকফলনের লক্ষ্যে ভারত থেকে আনাউন্নত প্রযুক্তির আধুনিকপদ্ধতিতে চাষাবাদ করেনতিনি। ফলেজমিতে অতিরিক্ত কোনো শ্রমিকের প্রয়োজনপড়েনি। প্রথমে তিনি স্কোয়াশ চাষ করে সফল হয়েছেন। এর পর শসা, তরমুজ ও বাঙ্গি চাষকরছেন। প্রথমে তিনি ৪৫ শতাংশ জায়গার মধ্যে ২৩ শতাংশজায়গায় ১২টি শস াগাছ লাগিয়েছেন তিনি। ১৫ শতাংশ জায়গায় তরমুজ বাকিজায়গায় তিনি বাঙ্গি চাষ করেছেন। এই প্রজেক্টে তার ১৮ হাজার টাক াখরচ হলেও ইতোমধ্যে তিনি গত ১৪ দিনেপ্রায় ৫০ হাজার টাক াশসা বিক্রি করেছেন।

এ ছাড়াও প্রতিদিন সাড়েতিন থেকে চার হাজার টাকা শসাবিক্রি হচ্ছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বাঙ্গি ও ঈদের আগের সপ্তাহে তরমুজতুলে বাজারেবিক্রি করবেন। এছাড়াও চারদিকে নেটদিয়ে বেড়াদিয়েকরোলা ও দুলদুলের চাষ করেছেন। বেডের ফাঁকাজায়গার মধ্যে লালশাক ও ডাটাচাষকরেওপাঁচহাজারটাকাবিক্রি করেছেন। তার এই চাষ দেখতে নিজ গ্রামসহ আশেপাশেরগ্রাম থেকে মানুষ দেখতে আসে। প্রজেক্টে পোকা দমনেরজন্য সেক্স ফেরোমনফাঁদ ব্যবহারকরা হচ্ছে।

উইনডোমাচাংপদ্ধতিতেচাষাবাদ করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা এবং সমালোচনার মুখোমুখিহতে হয়েছে কৃষিবিদ শাকিলকে। তিনিবলেন, ‘আধুনিকপদ্ধতিতে চাষাবাদ করতেগিয়েনতুনঅভিজ্ঞতাহয়েছেআমার। আশেপাশের গ্রামসহ আমার পুরো এলাকাতে আধুনিকপদ্ধতিতে চাষাবাদ পুরোপুরি নতুন ধারণা। আগে কখনোতারা এটি দেখেনি। এটাসম্পর্কে তাদের কোনোধারণানা থাকায়আমিআমারজমিতে দেওয়ার পর সবাই সমালোচনা করতে শুরু করেন তিনি নাকি ভার্সিটি পাসকইরা এসে পাগল হয়ে গেছে। কৃষক হইতে আসছে। কটুকথা সহ সবকিছুসহ্য করে গেছি, পরিবারেরসাপোর্ট ছিল বলে আজকে যখন আমি সফলতা অর্জন করেছি এবং তারা আধুনিক পদ্ধতিতে উপকারিতা লক্ষ্য করেছেন, এখনতারা নজের াও এটাসম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে, এজন্য আমার ভালোলাগা কাজ করে। এতে করে নতুন একটা প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিচিতি এবং সেটার গ্রহণ যোগ্যতা তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।’

শাকিল আহমেদ জানান, করোনায় গ্রামে যারযার বাড়িতে ফাঁকা জমি ছিল সবাইে কসবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি এবংনিজ থেকে বীজ এবংপরামর্শ দিয়েছেন। তার গ্রামে সবসময় সবাই এক ফসল করতেন এর আগে। ধানচাষাবাদ ছাড়া তার াঅন্য কিছ ুকরেননি। স্থানীয় কৃষকদের বুঝিয়ে কয়েকটি উঠান বৈঠক করে আল ুএবং ভুট্টা চাষেউদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। শসা, তরমুজ ও বাঙ্গি প্রজেক্ট দেখে গ্রামের বেশকয়েকজন কৃষক স্কোয়াশচাষেআগ্রহীহয়েছেন। কৃষককেউন্নত কৃষি ব্যবস্থায় আগ্রহী করতে ধানেরজন্য লাইন, লোগো, পার্চিং (এলএলপি) পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ প্রদানকরেছেন।

একই গ্রামের জাহিদুর রহমান, শহরআলী ও সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আগে আমাদের গ্রামে শুধু ধান চাষ করা হতো। আগে কখনও তরমুজ চাষ করাহয়নি। সবজিচাষের কোনো চিন্তা ছিলনা। শাকিলেরআধুনিকপদ্ধতিতেচাষ দেখে প্রথমে পরিহাসকরলেওএখনতারসফলতা দেখে আমরাগর্বিত। আমর াতার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তার মতো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার চাষপদ্ধতি দেখতে অনেক দূর থেকে লোকআসে।’

গ্রামীণ কৃষিনিয়েবিস্তৃৃত পরিসরে কাজ করার স্বপ্নশাকিলের। তিনিবলেন, ‘বসতি জমি বাড়ছে। তবে কৃষি জমি দিনদিন কমছে। কৃষি নিয়ে বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষি নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছে আমার। আমিএবংতিন-চারজনবন্ধুমিলে এই কাজটি করতে চাই। কিভাবে কম খরচে অধিক ফসল উৎপাদন করাযায়, তানিয়ে কাজ করার পাশাপাশি দালাল, ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তাদের নিকট কিভাবে বিপণন কর াযায় ,সেটা নিয়েও কাজ করবো। আগামী বন্যার আগে আরেক বার সবজি চাষ করা হবে। বন্যায় কচুরি পানার উপর সবজি চাষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।’

শাকিলের বাব াআব্দুলক রিমবলেন, ‘তারপ্রজেক্টে আমিও সহযোগিতা করি। ফলন দেখে আমিমুগ্ধ। আমি তার আরও সফলতা কামনা করছি।’

দেলদুয়া রউপজেলা কৃষিঅফিসার মো. শোয়েবমাহমুদ বলেন, ‘এক জমিতেএকাধিক ফসল চাষ করে তিনি সাড়া ফেলেছেন। ফলনও বেশভালোহয়েছে। আমি আশাকরি এলাকার যারা তরুণ রয়েছেন, শাকিলের দেখাদেখি কৃষিকাজে তারাও উদ্বুদ্ধ হবেন। উপজেলা কৃষিঅফিস থেকে তাকে পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে। শাকিল এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সর্বশেষ নিউজ