৪, আগস্ট, ২০২১, বুধবার

এসএসসি ও এইসএসসিতে কি আবারও অটোপাশ?

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি।

মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী ৪৩ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি ও টিউশন ফি প্রদান সংক্রান্ত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আর বেশি দিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হবে না।

শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, করোনার এই সময়ে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। আমরাই চাইছি তাদের এই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার অবসান হোক। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমরা এই দুটি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব।

হঠাৎ মধ্যরাতে এমন বিজ্ঞপ্তি পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে। ঘুরেফিরে সবার একটাই প্রশ্ন আবারও কি অটোপাশ?

দেখা গেছে, ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষা হয়েছিল সেটার ফলাফল প্রকাশ করলেও এইচএসসিতে অটোপাশ দিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আবার ঝুলান্ত না রেখে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাধুবাদও জানান। তবে এবার বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়ন কিভাবে হবে তা নিয়ে যেন চিন্তার শেষ নেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে।

অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে ঝুঁকছে। আমরা চাইলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিনা। বিকল্প হিসেবেওতো কিছু দিতে পারছি না। এভাবে তাদের মেধাও নষ্ট হচ্ছে। এভাবে অটোপাশ দিলেতো তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়নও পাবেনা। সরকারের উচিৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে পরিক্ষার মাধ্যমে মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা।

তারা বলছেন, গতবছর এইচএসসি অটোপাশ দেয়ার কারণে অনেকেরই ভালো রেজাল্ট হয়। যার ফলশ্রুতিতে এতসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে অংশ গ্রহণ করতে দিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এছাড়া অটোপাশের কারণে রেজাল্ট এর উপর কারো হাত ছিল না। যারা পূর্বে খারাপ করেছে, এবার হয়ত ভালো করার আসায় বসে ছিল। তারা ভালো করার আর সুযোগ পায়নি। এমনও দেখা গেছে অনেক কম জিপিএ পাওয়া ছাত্রটিও আজ ভার্সিটিতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে বিসিএস ক্যাডার।

ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে দুই ধরনের ইস্যু আছে। একদিকে পরীক্ষা সময় মতো না হলে সেশনজট হবে। অন্যদিকে অল্প সময় দিয়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীদের ওপর বিরাট বোঝা বা মানসিক চাপ দেওয়া হবে। মানসিক চাপে পড়লে এর কিছু ফলাফল হতে পারে যেমন, পারফর্মেন্স খারাপ হতে পারে, মোটিভেশন কমে যাবে, ড্রপআউট হতে পারে। অনেকে ভয়ে এবার পরীক্ষা নাও দিতে পারে। এসব মানসিক চাপের ফলে অনেকে ড্রাগ নেওয়াও শুরু করে। এ জন্য সব বিষয় ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া।’

কিন্তু প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন, এক. করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এর মধ্যে কীভাবে পরীক্ষা হবে সেটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। টিকা আসলেও তা কী পরিমাণ আসবে এবং ২০ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য কতটা টিকা বরাদ্দ হবে তা নিশ্চিত নয়। দুই. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে তা সবার আগে নিশ্চিত হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নিশ্চিত করতে হবে। তিন. এটি নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে কতটা সময় পাবেন শিক্ষার্থীরা, তা ঘোষণা করতে হবে। যেহেতু এসএসসি পরীক্ষা সময় দোরগোড়ায় সেহেতু সময় ঘোষণা না করে স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ মানসিক চাপে পড়বে। চার. যদি পর্যাপ্ত সময় দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা হয় তাহলে পরবর্তী পরীক্ষা ও সেশনের জটিলতা হতে পারে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এসএসসি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। পরিস্থিতির কারনে ফেব্রুয়ারি মাসে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এপ্রিলেও করোন পরিস্থিতি খারাপ দেখিয়ে বাতিল করা হয় এইচ এসসিও। এমনকি এক বা দুই মাস সময় দিয়েও পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না। এটি করা হলে শিক্ষর্থীদের ওপর জোর করে পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হবে। এতে প্রায় সবারই পরীক্ষায় খারাপ করার শঙ্কা দেখা দেবে। পরীক্ষা নিতে হলে কমপক্ষে চার-পাঁচ মাস সময় দেওয়া প্রয়োজন।

বিকল্প হিসেবে সরকার সিলেবাস ছোট করার চিন্তা করতে পারে। সম্ভবত এই বিষয়টি বলতে চেয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ খুব একটা লাঘব হবে বলে মনে হয় না। কারণ, দীর্ঘ সময় পড়ার টেবিলে না থাকায় মানসিকভাবে শিক্ষার্থীরা একেবারেই এ ধরণের পরীক্ষার জন্য অপ্রস্তুত।

আবার সিলেবাস ছোট করে স্বল্প সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে আসলে শিক্ষার্থীদের আদৌ কোনো উপকার হবে কিনা তা ভাবা দরকার। যদি পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের বিষয়গুলো পড়ানোই না হয় তাহলে ছোট সিলেবাস আর অটোপাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য কোথায়? এখানে একটি পার্থক্য হয়তো হবে যে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্ট পেয়েছে। কিন্তু এভাবে পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেওয়াটা নৈতিক দিক দিয়ে কতটা শক্তিশালী হবে?

অন্যদিকে অটোপাস ঘোষণা করা হলে সুবিধা-অসুবিধা কী তা দেখা দরকার। পরিস্থিতির কারণে অটোপাসের নজির রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরপর একবার এমন অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতিও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এসএসসি’২১ ব্যাচের অটোপাস দিলে, সময় দিয়ে পরীক্ষা নিতে গেলে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হবে সেগুলো এড়ানো যাবে। এছাড়া ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে মানসিক চাপ মুক্ত করা যাবে।

এসএসসি পাস দিয়ে কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, কবি বা সাহিত্যিক হয়ে যায় না। শিক্ষাজীবনে এসএসসি সনদ পেয়ে এইচএসসি ভর্তি হতে হয়। এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্নাতক। সুতরাং এসএসসি অটোপাস দিলে তার এইচএসসি ও উচ্চ শিক্ষায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা নেই। কারণ, অটোপাস দিলেও শিক্ষাজীবনে এই সনদের মূল্যায়ণ স্বাভাবিক সনদের মতোই। কোনো কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অটোপাসের সনদ বাধা নয়। সুতরাং আসন্ন এসএসসি’২১ ব্যাচকে অটোপাস দেওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নৈতিকও মানবিক শিক্ষায় গড়ে উঠবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সর্বশেষ নিউজ