২৮, অক্টোবর, ২০২১, বৃহস্পতিবার

ওয়াসার পানি হবে আরও দামি, আপাতত স্বস্তিতে নগরবাসী

চৈত্রের তীব্র দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে দেশের ওপর দিয়ে। দিনের শুরু থেকেই সূর্যের প্রচণ্ড তেজ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবু শ্রমজীবী মানুষ সকাল-সন্ধ্যা জীবিকার সন্ধানে ছুটছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সময়ে ঢাকাবাসীর অবস্থা তো আরও নাজেহাল। দিনরাত মিলিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই মাত্রাতিরিক্ত গরমে অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে সময় কাটছে নিম্নবিত্ত মানুষের। এরইমধ্যে ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে এলো পানি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব। তবে আপাতত সে প্রস্তাবে সাড়া মেলেনি।

আগামী ১ জুলাই থেকে ৫ শতাংশ হা‌রে ফের পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল ঢাকা ওয়াসা। প্রস্তার অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাস থেকে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট অর্থাৎ এক হাজার লিটার পানির জন্য দাম দিতে হবে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা আর বাণিজ্যিক সংযোগে দিতে হবে ৪২ টাকা।

এদিকে নতুন করে পা‌নির দাম বাড়া‌নোর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী। নগরবা‌সী বল‌ছে, এম‌নিতেই ক‌রোনার কার‌ণে নগরবা‌সী নাজেহাল। তার ওপর অতিরিক্ত গরম। এ কঠিন সময়ে পা‌নির দাম বা‌ড়া‌নো সিদ্ধান্ত কি সঠিক হ‌চ্ছে। তা‌দের অভিযোগ, ওয়াসা নগরবাসীকে কখনোই ভা‌লো মানের পা‌নি সরবরাহ করতে পারে না, উল্টো আবারও পা‌নির দাম বাড়া‌নো হ‌চ্ছে। য‌দি ভা‌লো পা‌নি দি‌তে পার‌তো তাহ‌লে একটা কথা ছি‌লো।

তবে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত পানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা বোর্ড। গেল মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) বিকেলে বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পানির দামের ওপর ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

বিভিন্ন দফায় পানির দাম বাড়িয়ে বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট অর্থাৎ এক হাজার লিটার পানিতে বর্তমানে গ্রাহককে গুণতে হচ্ছে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সংযোগের জন্য গ্রাহককে গুণতে হচ্ছে ৪০ টাকা করে। যা ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ঢাকা ওয়াসা। করোনার শুরুর দিকে গত বছরের এপ্রিলেও এক দফা পানির দাম বাড়িয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। সে সময় প্রতি ইউনিটে দাম বাড়ানো হয়েছিল ২ টাকা ৮৯ পয়সা। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে যখন করোনা ফের আগ্রাসী রূপ ধারণ করছে সে সময়ই এসে আবারও পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করলো ঢাকা ওয়াসা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক কর্মকর্তা ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। বোর্ড সভায় সে প্রস্তাব নাকচ করেছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে পারে। তখন পানির দাম নতুন করে বাড়ানো হবে। পানি ও পয়ঃঅভিকর ছাড়া ওয়াসার আর কোনও আয় না থাকায় পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া পানির উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে দামও বাড়াতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে মোবাইলে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ওয়াসার পানির মূল্যবৃদ্ধি প্রস্তাব বিষয়ে সাধারণ নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ওয়াসা আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী, বাৎসরিক সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু করোনা কালে এমনিতেই অসহায় অবস্থায় আছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে পানির দাম বাড়ানোর জন্য ওয়াসার এমন প্রস্তাব করা আসলেই অমানবিক। এতে করে করোনাকালে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হবে ওয়াসার প্রতি। পরিচালন ব্যয়, ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের অজুহাতে আবাসিক এবং বাণিজ্যিক খাতে ঢাকা ওয়াসার পানির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অযৌক্তিক, গ্রাহকের ওপর এক ধরণের চাপিয়ে দেয়া নির্যাতনমূলক ব্যাপার এটি।’

তবে ওয়াসা বলছে, ঢাকা ওয়াসার এক হাজার লিটার পানির উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ২৮ টাকা। সে কারণে পানির মূল্যবৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এছাড়াও মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করতেও মূল্যবৃদ্ধি করা দরকার। ওয়াসা আইন ১৯৯৬ এর ২২(২) ধারা অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ড অনধিক ৫ শতাংশ হারে পানি ও পয়ঃঅভিকর সমন্বয় করতে পারে।

তবে করোনাকালে ওয়াসার পানির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন সাধারণ মানুষ। নগরবাসীর ভাষ্য, ক‌রোনার কার‌ণে মানুষ কর্ম হারিয়ে এমনিতেই সংসার চালা‌তে হিমশিম খাচ্ছে। এরম‌ধ্যে পানির দাম যদি আবারও বাড়ানো হয় তাহলে সেটা খুবই অন্যায় হবে। ঘর ভাড়া দিতে না পেরে অনেক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। অসংখ্য মানুষ চাকুরি হারিয়ে ঢাকা ছেড়েছে। তারা এখন কর্মহীন, তাদের চোখে অন্ধকার। তারা ঢাকায় এসে নতুন করে চাকুরিও জোটাতে পারছে না। এখন পানির দাম বাড়ানো মানে সাধারণ মানুষকে জুলুম করা।

ওয়াসার পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বিষয়ে রাজধানীর যাত্রাবা‌ড়ীর নুরুল হক ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘করোনাকালে যখন গ্রাহকদের প্রতি ওয়াসার মানবিক আচরণ করা উচিত ছিল সে সময় ওয়াসা পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করে পুরোপুরি অমানবিক আচরণ করলো। গ্রাহকদের এমনিতেই আস্থা নেই ওয়াসার ওপর, এরমধ্যে নতুন করে পানির দাম বৃদ্ধি তাদের ওপর ক্ষোভ আরও বাড়বে।’

আফছার উদ্দিন না‌মের আর একজন বলেন, ‘ওয়াসার পানি নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগ অনেক। এরমধ্যে কমন একটি ব্যাপার হলো, রাজধানীর অনেক স্থানেই ওয়াসের পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। অনেক সময় পানি সরবারহের ক্ষেত্রেও ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। এরপরও তারা সেবার মান না বাড়িয়ে পানির দাম বাড়ানোর পায়তারা করছে, যা খুবই দুঃখজনক। ওয়াসার উৎপাদন ও বিতরণ পর্যায়ে দুর্নীতি কমালে মূল্যবৃদ্ধির কোনোই প্রয়োজন হবে না। জনস্বার্থ বিবেচনা করে তাদের উচিত এই করোনাকালে পানির দাম না বাড়ানো।’

সর্বশেষ নিউজ