৩, ডিসেম্বর, ২০২১, শুক্রবার

করোনাঃ ঈদের পর দেশে তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেপরোয়া চলাচলের কারণে ঈদের পর ফের সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা করছেন খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, রাস্তাঘাট, ফুটপাত, শপিংমল, মার্কেট সব জায়গাই ঈদকে ঘিরে বাড়ছে জনসমাগম। মানুষ করোনাকে তোয়াক্কা না করেই কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়াও সরকার কঠোরভাবে বলেছে, যার যার কর্মস্থলে ঈদ করার জন্য। কিন্তু তাও মানছে না মানুষ। দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রাখার পরও বিকল্প উপায়ে গ্রামের পথে ছুটছে মানুষ। মানুষের এই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাতে অবহেলা ও গাদাগাদি করে গ্রামে ফেরার কারণে ভাইরাসটি সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার প্রকাশ ঘটবে ঈদের দুই সপ্তাহ পর।

এ সময় দেশে আঘাত আনতে পারে করোনার তৃতীয় ঢেউ। আর ভারতের ধরন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়লে দেশের অবস্থা ভয়বাহ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

করোনা ভাইরাসের জিনোমের উন্মুক্ত তথ্য ভাণ্ডার জার্মানির গ্রোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটার (জিআইএসএআইডি) ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে করোনার এ ধরন শনাক্তের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

গত শুক্রবার জিআইএসএআইডির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই দুই ব্যক্তির একজনের বয়স ৪১ বছর। বাংলাদেশে তার বাসা ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে। এই ব্যক্তি ভারতে ভ্রমণের সময় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি করোনা ভাইরাসের কোনো টিকা নেননি। এই ব্যক্তির কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইদেশি)।

ভারতীয় করোনার ধরন শনাক্ত হওয়া দ্বিতীয়জনের বয়স ২৩ বছর। তার বাসা খুলনায়। এই ব্যক্তিও ভারতে ভ্রমণের সময় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি করোনা ভাইরাসের টিকা নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।

জিআইএসএআইডির উপাত্ত ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) গবেষক সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট (ধরন) বি.১.৬১৭.২ পাওয়া গেছে। আইইডিসিআর এটি সাবমিট করেছে।

সৈয়দ মুক্তাদির বলেন, জিআইএসএআইডির উপাত্ত বলছে, এটি গত ২৮ ও ২৯ এপ্রিল সংগৃহীত নমুনা থেকে পাওয়া গেছে।

দেশে করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে শুরু থেকেই কাজ করছেন অনুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা। তিনি বলেন, ‘যে ভেরিয়েন্ট (বি.১.৬১৭.২) বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, সেখানে ই৪৮৪কিউ মিউটেশনটি নেই। এটা থাকলে খুব ক্ষতিকর হতো। এখানে আমাদের টিকা কাজ করবে বলে মনে হয়।’

এর আগে চলতি বছরে বাংলাদেশে করোনার নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যের ধরনের অস্তিত্বের খবর প্রকাশ করেছে জিসএআইডি। বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ভেরিয়েন্ট বা ধরন পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, করোনার ভারতীয় ধরনটি ‘বি.১.১৬৭.২’ নামে পরিচিত। করোনার এ ধরনকে অতি সংক্রামক বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এ ধরন ভ‚মিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের চরিত্র হচ্ছে এটি দ্রুত নিয়মিতভাবে রূপান্তর হয়। বিশ্বে করোনা ভাইরাসের হাজারো মিউটেন্ট আছে।

দেশে ভারতীয় ধরন ধরা পড়ার পর শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাসিমা সুলতানা বলেন, যশোরে আট ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া নমুনা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) এবং আইইডিসিআর আলাদাভাবে পরীক্ষা করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাতেই ভারতীয় ধরন ধরা পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে আটজনের নমুনা পরীক্ষা করে দুজনের শরীরে ভারতীয় করোনার ধরন শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া চারজনের শরীরে ভারতীয় ধরনের খুব কাছাকাছি ধরন শনাক্ত হয়েছে।

ভারতীয় ধরন ডাবল মিউট্যান্ট কি না, জানতে চাইলে নাসিমা সুলতানা বলেন, আমাদের সিকোয়েন্স এখনো শেষ হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত সিকোয়েন্স শেষ না হবে, ততক্ষণে আসলে বলা যাচ্ছে না এটা ডাবল মিউট্যান্ট কি না।

তিনি বলেন, যবিপ্রবি উপাচার্যের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাদের ল্যাবে কিছু সিকোয়েন্স করে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখন পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করার প্রক্রিয়া চলছে।

নতুন ধরন ধরা পড়া প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ৬ মে যশোর ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে ভারত ফেরত ১৬ জনের নমুনা পাঠানো হয়। নমুনা পরীক্ষা করে তাদের ৩ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়।

অধ্যাপক আনোয়ার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক মো. ইকবাল কবীর জাহিদের নেতৃত্বে গবেষকরা জেনেটিক সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করেন। তাতে দুজনের শরীরের পাওয়া করোনা ভাইরাস যে ভারতীয় ধরন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। স্যাম্পল অ্যানালাইসিস করার পর আমরা দুজনের শরীরে ভারতীয় ধরনের বি১.৬১৭.২ পেয়েছি। দুজনের মধ্যে একজন নারী, একজন পুরুষ।

ভারতীয় নতুন ধরনটির আরো বেশি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সীমান্তে আরো কড়াকড়ি আরোপের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বর্ডার পুরো বন্ধ করতে হবে। ভারত থেকে আসা পণ্যের সঙ্গেও লোকজন যাতায়াত করছে। এই মিক্সিংটাও সতর্কতার সঙ্গে হ্যান্ডল করতে হবে। বর্ডার অঞ্চলের মানুষকে দ্রুত টিকা দিতে হবে।

এর আগে আইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের একটি নমুনা পরীক্ষায় করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটাতে (জিএসআইডি) প্রকাশিত হয়েছে। এভারকেয়ার হাসপাতালে একটি নমুনা পাওয়া গেছে। সেটি আমি দেখেছি। ধরা পড়েছে বলেই এ ধরনের তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, দেশে ভারতীয় ধরন পাওয়া গেছে। এ ধরনে আক্রান্ত রোগীরা ভারত থেকে ফিরেছেন। তারা চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তারা যশোরে অবস্থান করছেন।

ঈদের পর ফের করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে দোকানপাট-শপিংমলগুলোতে যেভাবে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে। এতে বলা যায়, দেশে সংক্রমণ আবারো বাড়বে। যার প্রভাব আমরা ১৬ মের পরে দেখতে পারব।

তিনি বলেন, ‘একটা ঈদে কিছু জামাকাপড় না কিনলে কি হলো? কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কেনাকাটার কারণে ঈদের আনন্দটা যদি একটা ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়, তাহলে বিষয়টা কেমন হবে? এতে করে শুধু ওই ব্যক্তিই নয়, তার পরিবারকেও ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দেয়া হচ্ছে।’

স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দেশের বিখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ এখন কিছুটা কম। তবুও স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে যা আরো ভয়ানক হতে পারে।

আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে করোনার এ দুঃসময়ে আমাদের জাঁকজমক করে ঈদ পালন করার কোনো সুযোগ নেয়। যার যার অবস্থানে থেকেই এই নিউ নরমাল সময়ে ঈদকে পালন করতে হবে, যদিও সরকার দূরপাল্লা পরিবহন বন্ধ রেখেছেন। তার পরও অতি উৎসাহী অনেকে যে কোনো পরিবহনে বাড়ি যেতে অস্থির থাকে। ঈদের জামাতের ক্ষেত্রে বড় ময়দানে বেশি মানুষের ভিড় না করে ভালো হয় নিজের এলাকার কোনো মসজিদে ব্যবস্থা করার, নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে বাসা থেকে অজু করে, জায়নামাজ নিয়ে যাবেন এবং দূরত্ব মেনে নামাজ আদায় করবেন। মসজিদে পরিচ্ছন্নকর্মীদের পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে যাতে ফ্লোর জীবাণু নাশক দিয়ে যথাযথ পরিষ্কার করা হয়। এ ভাইরাস সাধারণত ড্রপলেট দিয়ে ছড়ায় যা ফ্লোরে পড়ে থাকতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের করোনার ধরন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছে সরকার। কিন্তু তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ভারতের সীমান্ত এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। যারা ভারত থেকে দেশে আসছেন, তাদের অনেকের ঠিকমতো কোয়ারেন্টিন হচ্ছে না।

ভারতের করোনা রোধে দেশের যথাযথ প্রস্তুতি নেই উল্লেখ করে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির এ সদস্য বলেন, ভারত থেকে আসার পর যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে তাদের কোয়ারেন্টিন করার পর ছেড়ে দিতে হবে। আর যাদের পজিটিভ আসবে তাদের কোয়ারেন্টিন এবং চিকিৎসা সুরক্ষা বাস্তবায়ন করাতে হবে।

সুত্রঃ মানবকণ্ঠ

সর্বশেষ নিউজ