২৭, অক্টোবর, ২০২১, বুধবার

কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফিরছে মানুষ, কর্মসংস্থানের দাবি

করোনা মহামারীতে আবারও স্থবির হয়ে পড়েছে দেশ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কর্মক্ষেত্র। গত সোমবার থেকে সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। আর এর প্রভাব পড়ছে খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত খেটে খাওয়া মানুষগুলো।

ইতোমধ্যে করোনার কারণে কাজ হারিয়ে রংপুর অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ ঢাকা তথা কর্মসংস্থান ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছেন। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত যাদের উপার্জন একেবারেই সীমিত, সাতদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় কর্ম না থাকাসহ অর্থ সংকটে ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়ে ফিরেছেন গ্রামে।

এতে ভয়াবহ করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন উন্নয়ন গবেষকরা। তাই এই অঞ্চলের মানুষের দাবি পিছিয়ে পড়া উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আলাদা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।

জানা গেছে, করোনার থাবায় এমনিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন গ্রামাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়া এসব মানুষের সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই, দিন আনে দিন খায়। হঠাৎ করোনা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন বাহনে বেশি ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে যা ছিল তাও ইতোমধ্যে ফুরিয়ে এসেছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সমাজের নানা স্থরে। মানুষের মনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে, ভর করছে এক অজানা শঙ্কা। কর্ম হারানো বিশাল অঙ্কের জনগোষ্ঠি গ্রামে যুক্ত হওয়ায় পড়ছে কাজের আকাল। অভাব-অনটনে পড়ে অনেকেই জীবিকার তাগিদে অসৎ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে অভাবী এলাকা হিসেবে পরিচিত চরাঞ্চল। তিস্তা, ঘাঘট, বক্ষ্মপুত্র, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদ নদীর ভাঙনে সর্বশান্ত হওয়া এই সব চরের পরিবারের প্রধানরা আয়ের সন্ধানে বছরের বেশিরভাগ সময় থাকতেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে তারা কৃষি শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করাসহ কেউ রিকশা চালাতেন, কেউবা কাজ করতেন পোশাক কারখানায়। কিন্তু করোনাকালে সেখানে কারোরই আর কাজ মিলছে না। কাজ-চাকরি হারিয়ে বাধ্য হয়ে তারা ফিরে এসেছেন বেকারত্বের এলাকা নিজ গ্রামে।

কথা হয় তিস্তার চর বেষ্টিত গ্রাম রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষীটারি জয়রাম ওঝা গ্রামের সোনা মিয়া ও নুরুল হক নামের দুই জনের সাথে। তারা দুইজনেরই ঢাকার মিরপুরে একটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধিতে সৃষ্ট নিষেধাজ্ঞায় ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে ফিরে এসেছেন।

তারা বলেন, ‘কয় বছর থাকি ওইখানে চাকরি করি কোনমতে সংসার চলছিল। এ্যালা বাড়িত আসি দুইদিন থাকি বসি আছি, কোন কাম (কাজ) নাই। বউ-ছাওয়া নিয়া খুব কষ্টে আছি।’

ওই এলাকার ইউপি সদস্য দুলাল মিয়া জানান, এই চরে ৮০০ পরিবারের বাস। জীবিকার তাগিদে ৬০০ পরিবারের প্রধানই বছরের বেশিরভাগ সময় কাজের সন্ধানে ছুটে যান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নিষেধাজ্ঞায় কাজ না থাকায় বর্তমানে তারা অনেকেই বাড়িতে ফিরে এসেছেন। বেকার হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

নগরীর মেডিকেল মোড় এলাকায় কথা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেন তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শার আয়শা সিদ্দিকা, একই উপজেলার হাড়িয়ালকুটির মোসলেমা খাতুন ও গঙ্গাচড়া উপজেলার তুলশীঘাট এলাকার জয়নব নেসার সাথে।

তাদের সাথে আরও কয়েকজন নারী পোটলাসহ ফিরছিলেন। এ সময় তাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ঢাকায় বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। করোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞার কারণে বাড়িওয়ালা তাদের কাজ থেকে বাদ দেওয়ায় নিজ এলাকায় ফিরে যাচ্ছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা জানান, ‘বাড়িত তো কিছুই নাই। কাম না করলে হামার পেটোত ভাত যায় না। এ্যালা কী খ্যায়া বাঁচমো আল্লায় জানে।’

উন্নয়ন গবেষকরা বলছেন, করোনাক্রান্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা রংপুর বিভাগের আট জেলার লক্ষাধিক মানুষ এলাকায় ফিরে এসেছেন। শহর থেকে কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফিরে আসা মানুষদের নতুন করে কর্মসংস্থানের অভাব সৃষ্টি হয়েছে। এতে কর্মহীনদের মাঝে হতাশাসহ বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বিশেষ করে কর্ম হারিয়ে পিছিয়ে পড়া রংপুরের মানুষজন এলাকায় ফিরে আসার বিষয়টি হতাশাজনক। কর্মহীন মানুষদের মূল স্রোতধারায় আনতে না পারলে দেশের দারিদ্র্য মানচিত্রে বড় ক্ষতি হবে। সেজন্য কৃষিনির্ভর এই এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দাবি জানান তিনি।

সর্বশেষ নিউজ