৫, জুলাই, ২০২২, মঙ্গলবার

খাদের কিনারায় বাংলাদেশ, শেষযাত্রায় ছুটছে সবাই

নিজের ক্ষতি নিজেই ডেকে আনাকে অনেকে বলেন- ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’। তবে এখন পরিস্থিতি হচ্ছে, যেচে পড়ে কুড়ালে নিজের পা মেরে দিয়ে আসার মত। জীবনের শেষ ঈদ মনে করে লোকজন ছুটছে দিকবিদিক। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, লঞ্চে উপচে পড়া ভিড়, চারদিকে মাস্ক ছাড়া মানুষের ভিড়।

শুধুমাত্র রেলই ব্যতিক্রম। সেখানে কঠোরভাবে মাস্ক এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে। এছাড়া আর অন্যদিকে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এখনও সংক্রমণের হার ৩০ শতাংশের আশেপাশে।

গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেছে ১৮৭ জনের, আক্রান্ত হয়েছে ১২ হাজারের ওপরে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রা যেন মানুষের শেষযাত্রায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সতর্ক করছেন মানুষকে। কিন্তু মানুষ যেন বেপরোয়া! এর পর আর ঈদের দেখা মিলবে কি না, সেজন্য লোকজন সরকারি বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে সামিল হয়েছেন শেষযাত্রায়। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু কেউই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। ভয়াবহ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলো এখন উপচে পড়ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ বলেছে সিট খালি থাকা সাপেক্ষে নতুন করোনা রোগী ভর্তি করা যাবে। সবচেয়ে বড় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ডিএনসিসি হাসপাতালে পর্যন্ত সিট খালি নেই! শুধু ডিএনসিসি নয়, নতুন করোনা রোগীর জন্য জায়গা নেই ঢাকার প্রায় কোন হাসপাতালেই।

আর এরকম পরিস্থিতিতে সামনের ১০টা দিনে যে কত ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, আর সেই পরিস্থিতি বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে- তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত সচেতন মহল।

পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ঈদের অভিজ্ঞতা থেকেই সরকার এবারের ঈদের বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল। কারণ গত ঈদে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, গণপরিবহনও বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে মানুষকে ঠেকানো যায়নি। গণপরিবহন বন্ধের আদেশকে থোড়াই কেয়ার করেছেন তারা। যে যেভাবে পেরেছেন ছুটে গেছেন বাড়িতে। আর তাতেই অনেকটা সহনশীল হয়ে আসা করোনা পরিস্থিত বদলে যায়; করোনার সংক্রমণ বেড়ে যায় হু হু করে।

করোনার সবচেয়ে ভয়াবহ সংস্করণ- ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল তখনই। আর পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ যেন মোটামুটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে বাড়ি যেতে পারে এবং ঈদ করে ফিরে আসতে পারে সেজন্যই সরকার ৮ দিনের জন্য লকডাউন শিথিল করেছে। যেন গাদাগাদি না করে ধীরে সুস্থে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই চেষ্টা ছিল সরকারের।

কিন্তু মানুষ এই শিথিল লকডাউনকে মরণযাত্রা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিভিন্নভাবে মানুষ বাড়িতে যাচ্ছে। ঈদুল আযহার আছে মাত্র ৪ দিন। স্বাস্থ্যবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাদাগাদি করে ছুটছে সবাই। মাস্ক নেই কারো মুখে। কেউ দাড়ির নিচে ঝুলিয়ে রেখেছেন, কারো বা পকেটে। গরুর হাটও চলছে পুরোদমে। সেখানেও নেই স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম প্রচেষ্টা।

এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে ঈদের পরে যখন কঠোর লকডাউন দেয়া হবে, তাতেও করোনা সংক্রমণ কমবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, দুরকম সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, এই ঈদ যাত্রার ফলে ঘরে ঘরে করোনা সংক্রমণ ঢুকে পড়বে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, গত ঈদুল ফিতরে সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায়, তখন খুব একটা সমস্যা হয়নি। হাসপাতালগুলো সংকট মোকাবেলা করতে পেরেছে। কিন্তু এখন ইতিমধ্যে হাসপাতালগুলো খেই হারিয়ে ফেলছে, স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া প্রায় দুরূহ হয়ে পড়েছে।

সংকট দেখা দিয়েছে আইসিইউ, লাইফ সাপোর্ট, ভেন্টিলেশন, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন সামগ্রীর। সেই সাথে সাধারণ শয্যাও খালি নেই। সাথে যোগ হয়েছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।

এরকম পরিস্থিতিতে আবার সংক্রমণ বাড়লে পরিস্থিতি কোথায় যাবে, সহজেই অনুমেয়। গত ঈদে সারাদেশে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর সতা ২ মাসেও ঠেকানো যায়নি। এই ঈদে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে তা ঠেকাতে কতদিন লাগবে সেটিই দেখার বিষয়।

সর্বশেষ নিউজ