২০, মে, ২০২২, শুক্রবার

জঙ্গি নেতা মুফতি শফিকুরের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

২০ বছর আগে রাজধানীর রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি শফিকুর রহমান গতকাল (১৪ এপ্রিল) কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। এতদিন তিনি ছদ্মনামে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন। করতেন বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও ইমামতি।

তাকে গ্রেফতারের পর বিস্তারিত তথ্য দিতে শুক্রবার কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে আসেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে কমান্ডার মঈন বলেন, শফিকুর নাম বদল করে হন আব্দুল করিম। নরসিংদীর বিভিন্ন মাদ্রাসায় এ নামে শিক্ষকতা করেন। ছদ্মনামেই ওই এলাকার একটি মসজিদে মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে ইমামতি করতেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘রমনা বটমূলে হামলার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে থেকে সংগঠনের (জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ) সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। ২০০৮ থেকে নরসিংদীতে একটি মাদ্রাসায় কাজ শুরু করে। আত্মগোপনে থেকে ইমামতির আড়ালে ধর্মের নামে বিভ্রান্তিমূলক অপব্যাখ্যা প্রচার করতেন এই জঙ্গি নেতা।’

সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন জঙ্গি হামলায় শফিকুরের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন মঈন। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানাধীন বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। বৈদ্যের বাজারে হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত এবং কমপক্ষে শতাধিক আহত হন।’

‘পলাতক থাকাকালে শফিকুর অত্যন্ত কৌশলে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেন’ জানিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, ‘২১ বছর তিনি এভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। পরিবার বলতে শফিকুর রহমান তার ছেলের সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা করতেন। এই পয়েন্ট থেকেই তাকে চিহ্নিত করা হয় এবং গ্রেফতার করা হয়।’

এই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, শফিকুর কিশোরগঞ্জে নিজের গ্রাম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকার চকবাজারের একটি মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। হেদায়া পাশ করার পর ১৯৮৩ সালে ভারতে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পড়েন। এরপর দেশে ফিরে আসেন তিনি। পরে ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে ইউসুফ বিন নুরী মাদ্রাসায় ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হয়ে তিন বছরের ইফতা (ফতোয়া) কোর্স শেষ করেন।

মঈন বলেন, ‘১৯৮৯ সালে পাকিস্তানে অবস্থানকালে তিনি আফগানিস্তানে চলে যান এবং তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশে ফিরে শফিকুর ঢাকার খিলগাঁও একটি মাদ্রাসায় পার্ট টাইম শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচির নিউ টাউনে লেখাপড়া করার সময় মুফতি হান্নানের সঙ্গে পরিচয় হয়। হান্নানও সেখানে পড়তে গিয়েছিলেন।পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে গেলে সেখানে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। আফগানিস্তান থেকে দেশে এসে হরকাতুল জিহাদ (বি) নামে একটি জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা করেন। পরে ১৯৯০ সালে দেশে ফিরে সমমনাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে হরকাতুল জিহাদ (বি) সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এবং দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তারা।’

তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত হরকাতুল জিহাদ (বি) এর প্রচার সম্পাদক ছিলেন শফিকুর। ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি হরকাতুল জিহাদের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন শুরা সদস্য।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখের দিন ভোরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানস্থলে দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয় এবং পরে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে তা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে একটি এবং ১০-১৫ মিনিট পর আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাস্থলে সাত ব্যক্তি প্রাণ হারান। পরে আরও তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। এতে ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

এ ঘটনায় করা দুই মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ দেন আদালত।

কারাগারে থাকা অপর ৯ আসামি হলেন- মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া। এ ছাড়া সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সীর ফাঁসি কার্যকর হয়। ফলে এই মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে পলাতক ৪ আসামি হলেন- সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই।তাদের মধ্যে মুফতি শফিকুরকে গ্রেফতার করল র‌্যাব।

৬১ বছর বয়সী শফিকুর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলাতেও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। রমনায় হামলার তিন বছর পর ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট পল্টনে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। তাতে ২৪ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়।

ওই মামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। রায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, খালেদার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ যে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯ আসামির মধ্যে একজন হলেন শফিকুর।

সর্বশেষ নিউজ