২৮, অক্টোবর, ২০২১, বৃহস্পতিবার

জল-স্থল-আকাশ, বন্ধ হলো সব পথ

দেশে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি মোকাবিলায় সারা দেশে ৭ দিনের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। সোমবার (৫ এপ্রিল) সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এ লকডাউন চলবে ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত। সংক্রমণ পরিস্থিতি বুঝে লকডাউনের মেয়াদা আরও বাড়ানো হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশে যে হারে আক্রান্ত হচ্ছে তাতে করে ৭ দিনের লকডাউনে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

লকডাউন ঘিরে গত ২-৩ দিন ধরেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এবং একইসঙ্গে গণপরিবহন বন্ধ হওয়ায় ঘরমুখো মানুষের চাপ ব্যাপক বেড়েছে। হঠাৎ করেই সরকারের এমন ঘোষণায় অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থাতেই আপন ঠিকানায় ফিরছে নগরবাসী।

সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে আজ থেকে সড়ক, রেল, আকাশ ও নৌপথে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার থেকেই রাজধানীর বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে।

সরেজমিন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূলত এই করোনাকালীন রাজধানীতে যাদের কোনও কাজ নেই তারাই দীর্ঘমেয়াদি আটকা পড়ার ভয়ে বাড়ির পথে ছুটছেন। আর তাতে করে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সব গণপরিবহনে মানুষের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। গাদাগাদি, ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কিতে মানুষের এই ঢাকা ছাড়ায় স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম বালাই নেই কোথাও। ফলে সংক্রমণ এড়াতে যে লকডাউন দিয়েছে সরকার সেটা শেষ পর্যন্ত কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। বিপরীতে অর্ধেক যাত্রীর পরিবর্তে গণপরিবহনগুলো দ্বিতীয় যাত্রী পরিবহন করলেও ভাড়া ঠিকই ৬০ শতাংশ বেশি গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিবহন বিভাগের উপপরিচালক এহতেশামুল পারভেজ জানিয়েছেন, তারা সবসময়ই স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য যাত্রীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রতিটি লঞ্চে কড়াকড়ি নির্দেশনাও দেয়া রয়েছে। তবু যাত্রীরা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

এদিন গাবতলী বাস টার্মিনালেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাড়তি ভাড়া নেয়া হলেও বাসের ভেতর নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কর্মকর্তারা বাড়তি ভাড়া নেয়া ঠেকানো, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ ও যাত্রীদের মাস্ক পরা নিশ্চিতে সকাল থেকেই তৎপর থাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে নজরদারি এড়িয়েও বাসগুলো অতিরিক্ত যাত্রী ও বাড়তি ভাড়া নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছে।

একই অবস্থা রেলপথেও। সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, টিকিট কাউন্টারে মানুষের দীর্ঘ সারি। কোথাও কোনও সামাজিক দূরত্ব নেই। নেই স্বাস্থ্যবিধি। স্টেশনে মাইকিং করে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে যাত্রীদের সচেতন করা হচ্ছে।

কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. মাসুদ সারোয়ার জানান, সকালে যাত্রীর চাপ তেমন ছিল না। বিকেলে চাপ বাড়তে পারে। অনেকক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হচ্ছে না। সোমবার সারা দিনে কমলাপুর থেকে ৭২টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর অধিকাংশই যাত্রীতে ঠাসা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, একদিকে বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রীও নেয়া হচ্ছে গাদাগাদি করে। তাতে করে এই লকডাউন কিংবা সরকারি বিধিনিষেধ বাস্তবে কতটা সফল হবে তাই নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় গত ৩ এপ্রিল সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের ঘোষণা দেন ওবায়দুল কাদের।

ওই ঘোষণার পরপরই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে এক সপ্তাহের এই লকডাউন সোমবার অথবা মঙ্গলবার শুরু হতে পারে। জনগণকে প্রস্তুতি নেবার সুযোগ দেয়া হবে। অনেক লোক বিভিন্ন স্থানে গিয়ে আটকে থাকতে পারে, তাদের স্ব স্ব স্থানে ফেরার সুযোগটা দিয়ে একদিন পর লকডাউন দেয়া হচ্ছে।’

ওই প্রজ্ঞাপন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দেয়ার পরই গতকাল দুপুরে দেশে লকডাউন জারি করা হলো।

গতকাল অপর এক ঘোষণায় ওবায়দুল কাদের জানান, এক সপ্তাহ লকডাউন শুরু প্রথম দিন অর্থাৎ সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে গণপরিবহন চলাচল বন্ধেরও সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার।

দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে গত ২৯ মার্চ ১৮ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়। ৩১ মার্চ থেকে গণপরিবহনে ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। ১ এপ্রিল থেকে নৌপথেও অর্ধেক যাত্রী পবিবহন কার্যকর হয়। অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা কার্যকরে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে এরইমধ্যে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ দেশের অধিকাংশ পর্যটন স্পট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করে গত ১ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ইউরোপের দেশ ছাড়াও আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়ে থেকেও বাংলাদেশে আসায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আজ সোমবার থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলও বন্ধ হচ্ছে।

সর্বশেষ নিউজ