১৩, জুন, ২০২১, রোববার

জানুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনা: এক মাসেই মারা গেছে ৪৮৪ জন!

সদ্য গত হওয়া জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে ৪২৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে নিহত হয়েছেন ৪৮৪ জন মানুষ। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৭৩ জন। নিহতের মধ্যে ৯২ জন নারী ও ৪৭ জন শিশু আছে।

শনিবার (০৬ ফেব্রুয়ারি)রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমনটি জানানো হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সারাদেশে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬৮ জন, যা মোট নিহতের ৩৪.৭১ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৭.২৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৪৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ৩০.১৬ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, অর্থাৎ ১০.৯৫ শতাংশ। এই সময়ে ৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত, চারজন আহত এবং ছয়জন নিখোঁজ হয়েছেন। ১১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া লোকজনের মধ্যে বাসের যাত্রী ৩১, ট্রাক যাত্রী ১৪, পিকআপ যাত্রী ৪, ট্রলি যাত্রী ১, ট্রাক্টর যাত্রী ৩, মাইক্রোবাস যাত্রী ২, প্রাইভেটকার যাত্রী ৭, অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী ২, জিপ যাত্রী ৭, সিএনজি যাত্রী ১১, ইজিবাইক-অটোরিকশা-মিশুক-লেগুনা-টেম্পু যাত্রী-৫৫, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র-বোরাক যাত্রী ২১, টমটম ৪, বাই-সাইকেল ৬, মাটিকাটার ভেকু মেশিন গাড়ি ১ এবং হ্যালোবাইক আরোহী রয়েছেন একজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৫৩টি (৩৫.৮৩%) জাতীয় মহাসড়কে, ১০৭টি (২৫.০৫%) আঞ্চলিক সড়কে, ৯৭টি (২২.৭১%) গ্রামীণ সড়কে, ৫৯টি (১৩.৮১%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ১১টি (২.৫৭%) সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনাসমূহের ৮৮টি (২০.৬০%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৩৯টি (৩২.৫৫%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৪৪টি (৩৩.৭২%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৪৭টি (১১%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৯টি (২.১০%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী-ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ২৪.৭৫ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ৩.৬৫ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ ৩.২৩ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১১.৬৭ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৩.০৬ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-লেগুনা-মিশুক) ২০.৮১ শতাংশ, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র-বোরাক-টমটম ৮.২৯ শতাংশ, রিকশা-রিকশাভ্যান, বাই-সাইকেল ২.৮১ শতাংশ এবং অন্যান্য (পুলিশের পিকআপ, কোস্ট গার্ডের ট্রাক, হ্যান্ড ট্রলি, হ্যালোবাইক, মিকচার মেশিন, মাটি কাটার ভেকু মেশিন) ১.৬৮ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৭১১টি। (ট্রাক ১১৯, বাস ৮৩, কাভার্ডভ্যান ২১, পিকআপ ৩৬, লরি ৫, ট্রলি ১৩, ট্রাক্টর ৮, মাইক্রোবাস ৭, প্রাইভেটকার ৯, অ্যাম্বুলেন্স ৪, জিপ ৩, পুলিশের পিকআপ ৩, কোস্ট গার্ডের ট্রাক ১, ডিসিসি’র ময়লাবাহী ট্রাক ১, হ্যান্ড ট্রলি ২, হ্যালোবাইক ৩, মিকচার মেশিন ১, মাটিকাটার ভেকু মেশিন গাড়ি ১, টমটম ৬, মোটরসাইকেল ১৬৪, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র-বোরাক ৫৩, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-লেগুনা-মিশুক ১৪৮, বাই-সাইকেল ৯ এবং প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান ১১টি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ২.১০%, সকালে ৩২.৩১%, দুপুরে ১৯.২০%, বিকালে ২২%, সন্ধ্যায় ৯.৬০% এবং রাতে ১৪.৭৫%।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৬.২২%, প্রাণহানি ২৬.৪৪%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১১.৪৭%, প্রাণহানি ১১.৯৮%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯.২০%, প্রাণহানি ২০.০৪%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৭৭%, প্রাণহানি ১২.৩৯%, ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.০২%, প্রাণহানি ৭.৪৩.%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৮৩%, প্রাণহানি ৮.২৬%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৯৬%, প্রাণহানি ৭.৮৫% এবং সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৪৯%, প্রাণহানি ৫.৫৭%।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১২টি দুর্ঘটনায় নিহত ১২৮ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। ৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৭ জন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ৩১টি দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত। সবচেয়ে কম ঝালকাঠি জেলায়। ২টি দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য সাতজন, সেনা সদস্য ২ জন, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১৬ জন, চিকিৎসক ৩ জন, ব্যাংক কর্মকর্তা ৩ জন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর টেলিফোন অপারেটর ১ জন, দেশীয় পর্যটক ৪ জন, ক্রিকেটার ১ জন, মানসিক প্রতিবন্ধী ৩ জন, একাত্তর টিভির ভিডিও এডিটরসহ সাংবাদিক ৪ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৯ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৩ জন, পরিবহন শ্রমিক ২ জন, প্রবাসী শ্রমিক ২ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৪ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক ৩ জন, পল্লী বিদ্যুতের সুপরভাইজার ১ জন, বিটিসিএল’র লাইনম্যান ১ জন, ইটভাটা শ্রমিক ৭ জন, মাটিকাটা শ্রমিক ৩ জন, কাঠমিস্ত্রি ২ জন, নৈশ প্রহরী ৩ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪৬ জন, ইউপি সদস্য ২ জনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ৭ জন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এবং বরিশাল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে যেসব বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

প্রতিবেদনে দুর্ঘটনা রোধে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো- দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি করা, পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করা, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

সর্বশেষ নিউজ