২৩, সেপ্টেম্বর, ২০২১, বৃহস্পতিবার

‘জানের সদকা’ হিসেবে টাকার মায়া ছাড়তে বললেন মাশরাফি!

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন সংসদ সদস্য জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাঁকে দেখেই বিনিয়োগ করার ভরসা পেয়েছেন বলে জানান ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির অনেক গ্রাহক। কিন্তু এখন আর তিনি কোনো দায় নিতে চাচ্ছেন না। ‘জানের সদকা’ হিসেবে টাকার মায়া ছাড়তে বলছেন।

আজ সোমবার ই-অরেঞ্জের নারী গ্রাহকেরা মাশরাফির মিরপুরের বাসায় যান। এ সময় মাশরাফি তাঁদের এমন কথা বলেন বলে জানান প্রতারিত এই গ্রাহকেরা।

মাশরাফির বাসা থেকে বেরিয়ে আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেন ই-অরেঞ্জের বেশ কয়েকজন নারী গ্রাহক। এর মধ্যে মৌ আক্তার নামে একজন গ্রাহক জানান তিনি ই-অরেঞ্জে ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। মৌ বলেন, ‘মাশরাফি ভাইকে আমরা বলেছি, তিনি ছিলেন বলেই আমরা টাকা দিছি। আপনি না থাকলে আমরা কখনোই ই-অরেঞ্জে যেতাম না। তখন তিনি বলেন, আপনারা জানের সদকা হিসেবে এই টাকা ছেড়ে দেন!’

মাশরাফির বাসায় যাওয়া কয়েকজন গ্রাহক জানান, দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত তাঁরা মাশরাফির বাসায় ছিলেন। এ সময় মাশরাফি তাঁদের কয়েক ধরনের কথা বলেন। প্রথমে মাশরাফি তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তবে তিনি এটাও জানিয়ে দেন যে, তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এক দেড় বছরের আগের টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো আশা নেই বলেও জানিয়ে দেন তিনি।

একজন গ্রাহক বলেন, মাশরাফি আমাদের বলেছেন উনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। কিন্তু তিনি এটাও বলেছেন, তাঁর করার তেমন কিছু নেই। তিনি আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেতে বলেছেন।

এই গ্রাহকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাশরাফি তাঁদের জানান, ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, তুমি এটার মধ্যে কেন জড়াচ্ছো? মাশরাফি গ্রাহকদের আরও বলেন, তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে বলা হয়েছে, এখানে তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

গ্রাহকেরা জানান, মাশরাফি একপর্যায়ে রেগে যান এবং বলেন, আমার অ্যাড করার কথা আমি অ্যাড করেছি। আমি কি আপনাদের বলছি ই-অরেঞ্জে টাকা দিতে? কয়েকজন গ্রাহক তখন বলেন, আমরা আপনাকে দেখেই টাকা দিয়েছি। কারণ আপনি তো অভিনেতা নন, আপনি ক্যাপ্টেন, আপনি সাংসদ। সাকিব খান বা অন্য কাউকে দেখলে আমরা টাকা দিতাম না। আপনি জনগণের প্রতিনিধি বলেই আপনাকে দেখে আমরা ই-অরেঞ্জে আস্থা রেখেছি। এর উত্তরে মাশরাফি বলেন, আমার যতটুকু সম্ভব আপনাদের টাকা যেন ফিরে পান সেই চেষ্টা আমি করছি।

এ বিষয়ে জানতে মাশরাফির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি সেটি দেখেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গ্রাহক বলেন, সবার মতো মাশরাফিও আমাদের খেলার পুতুলের মতো খেলাচ্ছেন। মাশরাফি বলছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেতে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে যেতে। আমরা জুন মাসে টাকা দিয়েছি। তখন মাশরাফি ই-অরেঞ্জের অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। তিনি তো কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।

উম্মে হানি নামের একজন গ্রাহক বলেন, মাশরাফি আমাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আমরা কোনো কিছুতেই আসলে ভরসা করতে পারছি না।

আরেকজন গ্রাহক বলেন, আমরা যতটুকু বুঝলাম, মাশরাফি দায় এড়াতে চাইছেন। ‘জানের সদকা’ হিসেবে টাকার মায়া ছাড়তে বলে মাশরাফি প্রতারকদের মতোই কথা বললেন। আমরা প্রত্যেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের। আমরা তো কোটিপতি না যে, জানের সদকা হিসেবে সারা জীবনের জমানো সঞ্চয়টুকু দিয়ে দেব!

ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তাঁর স্বামী ও প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা মাসুকুর রহমান এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আমানুল্লাহ বর্তমানে গ্রাহকদের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় কারাগারে। গ্রাহকেরা বলছেন, মাশরাফিকে ই-অরেঞ্জের শুভেচ্ছা দূত হতে দেখেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটিতে পণ্য অর্ডার করেছিলেন। তবে মাশরাফি বলছেন, তিনি শুধু জুন মাসে ই-অরেঞ্জের দূত হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। জুলাইয়ের ১ তারিখে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই গ্রাহকদের টাকা না পাওয়ার বিষয়ে তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

সর্বশেষ নিউজ