১৭, সেপ্টেম্বর, ২০২১, শুক্রবার

ত্ব-হাকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়া বন্ধু সিয়ামের চাকরি গেল!

উগ্রবাদী তালেবানপন্থী বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে যেই বন্ধুর বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন, সেই বন্ধু সিয়াম ইবনে শরীফ চাকরি হারিয়েছেন।

ত্ব-হা তার দুই সঙ্গী ও গাড়িচালককে নিয়ে বন্ধু সিয়ামের গ্রামের বাড়ি ৭ দিন এবং নিজের শ্বশুরবাড়িতে একদিন আত্মগোপনে ছিলেন। এ ঘটনার জের ধরে সিয়ামকে চাকরিচ্যুত করেছে মোবাইল ফোন কোম্পানি অপ্পো। সিয়াম রংপুরে অপ্পোর মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

রোববার দুপুর পৌনে ২টার দিকে সিয়াম নিজেই তার চাকরি হারানোর বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি জানান, বন্ধু ত্ব-হা ইস্যুতে শনিবার (১৯ জুন) তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

সিয়াম দাবি করেন, আমার বন্ধু ত্ব-হাসহ ৪ জন গাইবান্ধায় আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, এটা আমাকে জানানো হয়নি। এ কারণে ত্ব-হার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে আমি নিজেও উদ্বিগ্ন ছিলাম। অন্য বন্ধু-বান্ধবদের মতো ত্ব-হার সন্ধান দাবিতে আমিও মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলাম।

পুলিশ ত্ব-হাকে উদ্ধারের পর জানলাম, সে আত্মগোপনে ছিল। সেটা নাকি আমাদের বাড়িতেই। আমার মা ত্ব-হাদের সেখানে লুকিয়ে থাকার ব্যাপারে আমাকে কিছু জানায়নি। অথচ এখন অভিযোগ করা হচ্ছে, আমি নাকি তাদেরকে লুকিয়ে রেখে মানববন্ধন করেছি। এটা মিথ্যা অভিযোগ, আমি কিছুই জানতাম না।

মা কেন ত্ব-হাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি জানাননি, এ প্রশ্নের উত্তরে সিয়াম বলেন, ত্ব-হা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে যেত। সে আমার স্কুল-কলেজের ফ্রেন্ড। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি। আমাদের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। ও নাকি আমাদের বাড়িতে গিয়ে আমার মাকে অনুরোধ করেছিল, তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি যেন আমার মা কাউকে না জানান।

সিয়ামের মা নিশাদ নাহার গণমাধ্যমকে জানান, ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা ৭ দিন তাদের বাড়িতে ছিল, কিন্তু আশপাশের কেউ জানত না। এমনকি সিয়ামও জানত না।

প্রসঙ্গত, গত ১০ জুন ত্ব-হা এবং তার সঙ্গে নিখোঁজ হন আব্দুল মুহিত, মোহাম্মদ ফিরোজ ও গাড়িচালক আমির উদ্দীন। নিখোঁজের ৮ দিন পর শুক্রবার রংপুরে বাড়িতে ফিরেছেন ত্ব-হা।

রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুর রশিদ জানান, বিকাল ৩টার দিকে তাকে রংপুর নগরের আবহাওয়া অফিস সংলগ্ন মাস্টার পাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে সেখান থেকে তাকে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পারে, ব্যক্তিগত কারণে ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা আত্মগোপনে ছিলেন। তবে ব্যক্তিগত কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ জানায় এই মুহূর্তে তারা বলতে পারবেন না। সেটা ভেরিফাই করতে হবে। তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করব। আসলে সব ব্যক্তিগত কারণ তো বলা যায় না।

পরে ডিবি পুলিশ জানায়, দাম্পত্য কলহে অতিষ্ঠ হয়ে ত্ব-হা আদনান স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে গিয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

ত্ব-হাকে উদ্ধারের পর শুক্রবার বিকালে রংপুর নগরীর ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন বলেন, পারিবারিক কারণে গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে বন্ধুর বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন ত্ব-হা আদনান।

ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা ঢাকা থেকে ফিরে তার এক বন্ধুর বাসায় আত্মগোপন করেছিলেন। তার বন্ধুর নাম সিয়াম।

পুলিশ জানায়, তার বন্ধু (সিয়াম) বাসায় ছিলেন না। তার মা বাসায় ছিলেন। তারা একটি ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন। তারা ওই রাতেই ঢাকা থেকে ফিরেছে অন্য কোথাও অবস্থান করেনি।

শুক্রবার ফিরে আসার পর প্রথমে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। পরে ওই দিন রাতেই তাকে রংপুরের আদালতে তোলা হয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি।

ত্ব-হার আইনজীবী জানিয়েছেন, দুই স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ থাকায় তার (ত্ব-হা) মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

তবে আদালতে জবানবন্দি দিলেও বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি ত্ব-হা আদনান। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তিনি অসুস্থ। তাই তিনি মিডিয়ার সামনে আসছেন না।

জঙ্গি সংগঠন তালেবানের প্রতি অনুরক্ত ও ব্যাপক সমালোচিত ৩১ বছর বয়সী উগ্রবাদী এই বক্তার পুরো নাম মো. আফছানুল আদনান ত্ব-হা। তবে আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান নামেই পরিচিত। তার বাড়ি রংপুরে।

রংপুর মহানগরীর সেন্ট্রাল রোডের আহলে হাদিস মসজিদ-সংলগ্ন গলিতে তার পৈতৃক নিবাস। বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শালবন এলাকার চেয়ারম্যানের গলিতে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

আদনানের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর নাম আবিদা নুর, দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন নাহার। প্রথম স্ত্রীর ঘরে ৩ বছরের একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান আছে।

দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন নাহার সারা মিরপুর আল ইদফান ইসলামী গার্লস মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক। ৩ মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। সাবিকুন এর আগেও আরও তিনটি বিয়ে করেন বলে সম্প্রতি জানা যায়। সেসব পরিবারে সন্তানও রয়েছে তার। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ডিভোর্স দিয়ে দেনমোহরের অর্থ নিয়ে সরে পড়েন।

এই বিষয়গুলো ত্ব-হা জানতে পারেন সম্প্রতি। আর তাতেই শুরু হয় পারিবারিক দ্বন্দ্ব।

সর্বশেষ নিউজ