২৭, অক্টোবর, ২০২১, বুধবার

দুই দশকে আফগান যুদ্ধ: হিসেবেই আটকে আছে লাভ-ক্ষতি

আফগানিস্তানের দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সেখান থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোও তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ওই সেনারা আফগানিস্তান ছাড়বেন। এখানে ১১ সেপ্টেম্বর তারিখটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ ঠিক ২০ বছর আগে ২০০১ ‍সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার প্রতিশোধ নিতে আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। উৎখাত করা হয় ওই সময়ে আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারকে।

আফগানিস্তানে এখনো আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মার্কিন সেনা দায়িত্বরত আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ মাসে আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সব সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অবস্থানের উচ্চ মূল্য সব পক্ষকেই চুকাতে হয়েছে। সেই মূল জীবন দিয়ে, জীবনযাপননে ক্ষতি এবং অর্থমূল্যে শোধ করতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ও বোস্টন ইউনিভার্সিটির পারডি সেন্টারের এক যৌথ গবেষণায় আফগান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে। দ্য কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট শীর্ষক এক প্রকল্পের অধীনে এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় অনুযায়ী শুক্রবার এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

ওই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বলছে, এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রাণহানি হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তির। অন্যদিকে ২০ বছর ধরে ক্রমাগত চাপ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও। শুধু এ যুদ্ধ চালাতে গিয়েই গত ২০ বছরে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, এ যুদ্ধে জীবন ও সম্পদের হানি হয়েছে অনেক। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আফগান ও পাকিস্তানি বেসামরিক নাগরিক রয়েছে ৭১ হাজার ৩৪৪ জন। দেশ দুটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মারা গিয়েছে ৭৮ হাজার ৩১৪ জন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৪৪২ সৈন্য ও প্রতিরক্ষা বিভাগের ছয় বেসামরিক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর সামরিক ঠিকাদার মারা গিয়েছে ৩ হাজার ৯৩৬ জন। যুদ্ধে মার্কিন মিত্র অন্যান্য দেশের ১ হাজার ১৪৪ জন সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নিহত হয়েছে ৮৪ হাজার ১৯১ জন।

এছাড়া এ যুদ্ধ চলাকালে ১৩৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী এবং ৫৪৯ জন মানবাধিকারকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয়, এ তালিকায় শুধু যুদ্ধকালীন সহিংসতায় মৃতদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধসৃষ্ট খাদ্য ও পানীয়র অভাব, অবকাঠামো ধ্বংস, রোগব্যাধি ইত্যাদিসহ পরোক্ষ প্রভাবে মৃতদের এ তালিকায় আনা হয়নি। বেশ কয়েকটি প্রাথমিক উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এই দীর্ঘ যুদ্ধে আসলে লাভ হয়েছে কার? আর ক্ষতির ভাগই বা টানবে কে? এসব কী আসলেও ন্যায়সঙ্গত ছিল? বিষয়গুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে তার উপর এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে আল-কায়দার হামলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তালেবান সরকারকে দায়ীদের তাদের হাতে তুলে দিতে বলেছিল। কিন্তু সেবারও তালেবান ওই প্রস্তাব অস্বীকার করে। তার পরই আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী বাহিনী ‘দ্য নর্দান অ্যালায়েন্স’ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাহিনীর সহায়তায় কাবুলে হামলা চালিয়ে তালেবান সরকারকে উৎখাত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, তারপর আফগানিস্তান থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হামলার আর কোনো পরিকল্পনা সফল হয়নি। সেক্ষেত্রে বলা যায়, দেশটিতে পশ্চিমা সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে।

যদিও এটা অবশ্যই খুব স্থুলভাবে বিবেচনা করলে। কারণ, সেখানে যুদ্ধে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যুদ্ধে সেখানে সামরিক এবং বেসামরিক উভয় পক্ষকেই অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়েছে। ২০ বছর হতে চলেছে, এখনো আফগানিস্তানে শান্তি ফেরেনি। গবেষক দল ‘অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্স’ গ্রুপের তথ্য মতে, ২০২০ সালেও বিস্ফোরণে সবচেয়ে বেশি মানুষ আগানিস্তানে নিহত হয়েছেন।

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিক কার্টার বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানে এমন একটি নাগরিক সমাজ তৈরি করেছে যারা তালেবান কী ধরনের জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে তাদের বৈধতা চায় তার হিসাব পাল্টে দিয়েছে। দেশটি এখন ২০০১ সালের তুলনায় ভালো স্থানে পরিণত হয়েছে এবং তালেবান এখন আগের তুলনায় অনেক উদার হয়েছে।”

আবার অনেকে ভিন্ন কথাও বলছেন, যেমন এশিয়া প্যাসেফিক ফাউন্ডেশনের ড. সজ্জন গোহেল বলেন, ‘‘সেখানে এখন সত্যিকারের উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান আবারও নব্বইয়ের দশকের মত চরমপন্থিদের কারণে রক্তাক্ত ভূমিতে পরিণত হতে পারে। এখন নানা দেশ থেকে জঙ্গিরা আবারও আফগানিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য যেতে পারবে। কিন্তু পশ্চিমারা এটার বিরুদ্ধে আর কিচ্ছু করতে পারবে না। কারণ, এরইমধ্যে তারা আফগানিস্তানকে পরিত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।”

পশ্চিমা নানা গোয়েন্দা সংস্থাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে হয়তো এটাই আফগানিস্তানের অনিবার্য পরিণতি নয়। বরং দেশটির ভবিষ্যত অনেক কিছুর উপর নির্ভর করছে।

আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে কাতারের দোহায় আফগান সরকার ও তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তিও হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী তালেবান আবারও আফগানিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

‍তাই অনেক কিছু নির্ভর করছে শেষ পর্যন্ত জিতে যাওয়া তালেবানের উপর। প্রথমত, ক্ষমতায় ফিরে যেতে পারলে তারা কী আবারও আল-কায়দা ও আইএস জঙ্গিদের আফগানিস্তানে সক্রিয় হওয়ার এবং এলাকা দখল করার অনুমতি দেবে। দ্বিতীয়ত, যে চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে সেটার কতখানি বাস্তবায়ন হবে। যে চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তানে না থেকেও পশ্চিমবিশ্ব দেশটির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখার পরিকল্পনা করেছে।

সর্বশেষ নিউজ