২০, এপ্রিল, ২০২১, মঙ্গলবার

ধীরে ধীরে মুখ খুলছেন মামুনুল, জানাচ্ছেন চাঞ্চল্যকর তথ্য

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এরইমধ্যে গেল রবিবার (১৮ এপ্রিল) মোহাম্মদপুরের একটি মাদরাসা থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে।

প্রথম বিয়ে ছাড়াও দুই জান্নাতকে কন্ট্রাকচ্যুয়াল (চুক্তিভিত্তিক) বিয়ে করেছিলেন মামুনুল। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে তিনি দাবি করেছেন, মূলত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতেই দুই ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করেছিলেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক বলেছেন, সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টকাণ্ডে শুরুতেই অন্য স্ত্রীদের কথা স্বীকার করলে প্রথম স্ত্রী আমেনা তৈয়বা বড় ধরনের কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতেন বলে ধারণা ছিল তার। এ কারণে তৎক্ষণাৎ স্বীকার করেননি। গত রবিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিনেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যের সঙ্গে এসব কথাও বলেছেন এই হেফাজত নেতা।

পুলিশ জানিয়েছে, কথিত দুই বিয়ের সাক্ষীদের শিগগিরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে। একইসঙ্গে রিমান্ডে তাকে মোদবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে।

মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলায় সোমবার (১৯ এপ্রিল) মামুনুলের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবদাস চন্দ্র অধিকারীর আদালত।

ডিবি কার্যালয়ে মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, নিরাপত্তার স্বার্থেই মামুনুলকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেও থাকবেন।

হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মামুনুল প্রথম বিয়ে ছাড়া বাকি দুই বিয়ের স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এমনকি বিয়ের সাক্ষীদের নাম প্রকাশের ব্যাপারেও গড়িমসি করছেন। দ্বিতীয় জান্নাতের ভাই শাহজাহানের জিডি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

এদিকে গতকাল রিমান্ডের প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বলেছেন, তার যে দুটি বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওই দুই নারীর সঙ্গে অনেক দিন ধরে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করে আসছেন তিনি। তবে বিয়ে সংক্রান্ত কোনও বৈধ কাগজপত্র তার কাছে নেই। কাবিনও নেই। ওই দুই নারীর ডিভোর্স হওয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই তাদের দিকে এগিয়ে যান তিনি। একজনকে মোহাম্মদপুরের একটি মাদরাসায় চাকরিও দিয়েছেন।

কিন্তু কাগজপত্র ও কাবিননামা না থাকা সত্ত্বেও বিয়ে কীভাবে বৈধ হলো- এমন প্রশ্নে অসংলগ্ন উত্তর দিয়েছেন মামুনুল। রিমান্ডে নেয়ার প্রথম দিন পর্যন্ত কোনও স্বজন, সহকর্মী বা অনুরাগী তার খোঁজ নেননি বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

মারধর, হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত, গুরুতর জখম, চুরি, হুমকি ও ধর্মীয় কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে গোলযোগের অভিযোগ এনে স্থানীয় এক ব্যক্তি গত বছর মোহাম্মদপুর থানার মামুনুলের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেন। সেই মামলায়ই মামুনুলকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল হক। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামুনুলকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।

গত রবিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম ও ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের যৌথ অভিযানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসার দোতলার একটি কক্ষ থেকে মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর প্রথমে তাকে মিরপুর সড়কে পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকে নেয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেখান থেকে মামুনুল হককে নেয়া হয় তেজগাঁও থানায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুলকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডিসি হারুন জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই মামুনুল হকের কাছে তার কথিত বিয়ে ও হজরত মুহম্মদকে (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গ করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি নিজের মতো ব্যাখ্যা দেন। তবে এটা স্বীকার করেছেন যে, এসব বিষয়ে কোনও আইনগত প্রমাণ তার কাছে নেই। অন্য প্রশ্নে চুপ থাকেন।

মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অপর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামুনুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়, হেফাজতের অধিকাংশ কর্মসূচি ঘিরে কেন তাণ্ডব ও নৃশংত হামলার ঘটনা ঘটে। ইসলাম তো এসব সমর্থন করে না। সংগঠনটির নাম যখন হেফাজতে ইসলাম তখন কেন এর নেতাকর্মীরা এসব বর্বরতা এড়াতে আরও সতর্ক থাকেন না। এসব প্রশ্নে মামুনুল হক বলেন, ‘আমি যেহেতু নেতা, এর দায় আমারও রয়েছে। আমাকে এর দায় নিতেই হবে। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনও তো সংঘাতে জড়ায়।’ অন্যান্য দলের খারাপ দৃষ্টান্ত হেফাজত কেন অনুসরণ করবে- এমন প্রশ্নে চুপ থাকেন মামুনুল।

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে জ্বালাও-পোড়াও, পবিত্র কোরআন শরিফে আগুন দেয়া, বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তাদের কোনও স্পষ্ট জবাব দেননি মামুনুল হক।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরইমধ্যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মামুনুল। ভেতরে-বাইরে তিনি দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী। এটি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কথিত বিয়ের কাহিনি ফাঁস হওয়ার পর থেকে ঘরে-বাইরে চাপে আছেন তিনি। হেফাজতের ভেতরেও একটি অংশ তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ। রয়েল রিসোর্টকাণ্ডের পর প্রথম স্ত্রীসহ নিজের পরিবারের সদস্যদের কারও কারও কাছে তিনি বিরাগভাজন হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে বাসায়ও যাননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদপুরের যে মামলায় মামুনুলকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে, সে সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ গতকাল জব্দ করেছেন তারা। মূলত তাবলিগ জামাতকে কেন্দ্র করে জুবায়ের ও মোহাম্মদ সাদ কান্ধালভি গ্রুপের মধ্যে এ মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। মামুনুল ছিলেন জুবায়েরপন্থি।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, মামুনুলের কথিত ছোট স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি। তবে জান্নাত আরা ঝর্ণাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেছেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রীর নাম আমেনা তৈয়বা। কথিত মেজো ও ছোট স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের কোনও কাবিন হয়নি বলে পুলিশকে জানিয়েছেন মামুনুল।

কাবিন হলো বিয়ের আইনি দলিল। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের নিবন্ধন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। নিবন্ধন ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন। বিয়ের নিবন্ধন না থাকা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে দু’বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও তিন হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অপর একজন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল হক অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। হেফাজতের অর্থনৈতিক প্রবাহ কোথা থেকে আসে এ প্রশ্নটি তিনি কৌশলে এড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে এটি হয়তো তিনি পারবেন না। মাত্র তো রিমান্ডে পেলাম, দেখা যাক।’

তবে দেশব্যাপী বেপরোয়া তাণ্ডবের নেপথ্যে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের যে উস্কানি ছিল মামুনুল হক তাদের অন্যতম বলেও জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

গেল রবিবার (১৮ এপ্রিল) গ্রেফতারের পরই প্রথমে তাকে মিরপুর সড়কে পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের ডিসি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখান থেকে নেয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে মামুনুলকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনাসহ মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি এজাহারনামীয় আসামি। এছাড়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সাম্প্রতিক মোদীবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতার মূল হোতা হিসেবেও মামুনুলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টে এক নারীর (ঝর্ণা) সঙ্গে অবস্থানকালে অবরুদ্ধ হন হেফাজত নেতা মামুনুল হক। ওইদিন তিনি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সঙ্গে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। দুই বছর আগে শরিয়া আইন মোতাবেক ওই নারীকে তিনি বিয়ে করেন। যদিও পরবর্তীতে তার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

অবরুদ্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই হেফাজত নেতারা ওই রিসোর্টে লাঠিসোটা নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও নাশকতা চালিয়ে মামুনুল হককে মুক্ত করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর মামুনুলে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ওইদিনই হেফাজতের নেতাকর্মীরা রিসোর্ট, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়, বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। এছাড়া তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে।

পুলিশের ওপর হামলা ও রিসোর্টে ভাঙচুরের অভিযোগে মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। এছাড়া মামলায় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামিও করা হয়।

মামলায় সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও রিসোর্টে ভাঙচুরের অভিযোগ এনে ৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় মামুনুল হককে প্রধান আসামি করা হয়।

এ মামলা ছাড়াও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ২৫০/৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে আরেকটি মামলা করা হয়। ওই মামলায় হেফাজতে ইসলাম, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতাকর্মীদেরও এজাহারভুক্ত করা হয়।

সর্বশেষ নিউজ