২০, অক্টোবর, ২০২১, বুধবার

পদ্মা সেতুর প্রভাবে শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

এশিয়ার অন্যতম দুই বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং ও সিঙ্গাপুরের মতো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের শরীয়তপুরের। মূলত পদ্মা বহুমুখী সেতুকে কেন্দ্র করে এই সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, যা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথা সেতুর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প ও আশপাশের এলাকা ঘুরে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে শরীয়তপুরের সম্ভাবনার বিষয়টি দেখা গেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঠিক মাঝখানে অবিস্থত হওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর আশপাশের দেশগুলোর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। আর চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

আয়তনের দিক দিয়ে হংকং ও সিঙ্গাপুরের চেয়ে বড় পদ্মা-মেঘনার মিলিত স্রোতধারায় সিক্ত শরীয়তপুর জেলা। হংকংয়ের আয়তন ১ হাজার ১০৭ বর্গ কিলোমিটার এবং সিঙ্গাপুরের আয়তন প্রায় ৭২৩ বর্গ কিলোমিটার। যেখানে শরীয়তপুরের আয়তন ১ হাজার ১৮১ বর্গ কিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে মুন্সিগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল, পূর্বে চাঁদপুর এবং পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা অবস্থিত।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অংশ হওয়ায় শরীয়তপুর এখন বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। এই সেতু ও রেল প্রকল্প এশিয়ান হাইওয়ে রুটের অংশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. পারভেজ হাসান জানান, পদ্মা সেতুর কারণে এই জেলার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনোজাগতিক, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হবে। কোনোটা খুব দ্রুত, কোনোটা ধীরে ধীরে।

তিনি জানান, মাদারীপুরের মতো শরীয়তপুরেও চার লেনের রাস্তা হবে। এই চার লেন আর পদ্মা ও মেঘনা সেতু হয়ে গেলে এই অঞ্চলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে শরীয়তপুর। তখন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের ওয়্যার হাউজ বানাবেন। বিশ্রামাগার হবে, কিছু থ্রি স্টার ও ফাইভ স্টার হোটেল হবে। সব মিলে শরীয়তপুরের অনেকটাই হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, শরীয়তপুর এখন চাঁদপুরের সঙ্গে কানেক্টেড নরসিংহপুর যে ফেরিঘাট আছে তার মাধ্যমে। নরসিংহপুর ঘাট থেকে ফেরিতে করে চাঁদপুর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে চট্টগ্রাম। চাঁদপুর প্রান্তেও চার লেনের রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, আরেকটি সুখবর হচ্ছে মেঘনায় আরেকটি সেতু করার জন্য একনেক সভায় আড়াই শ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতু, মেঘনা সেতু আর মাঝখানে চার লেনের রাস্তা হলে বাংলাদেশের যে কোনো বন্দরেই যাওয়া যাবে শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে।

বিশেষ করে বেনাপোল, মোংলা ও চিটাগাং- এই তিন পোর্টের কানেক্টিং রাস্তা হবে শরীয়তপুরের বুকের ওপর দিয়ে। তখন কেউই কিন্তু ঢাকা ঘুরে চিটাগাং যাবে না। তখন শরীয়তপুরকে দেখতে হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো মনে হবে। এটা হলে শরীয়তপুরের রাস্তা ও ভূমি অটোমেটিক্যালি ডেভেলপ হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মনে করেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে পদ্মার দুই পাশেই চীনের হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, পদ্মার দুই পাশেই হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে। সেখানে বড় বড় শহর হবে, বড় বড় রিসোর্ট হবে। এখানে যদি আমরা প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করি, তাহলে ঢাকার যে ডিমান্ড, সেটা ওই খানেই পূরণ করা যাবে। সেজন্য আমাদের একটা মেগা পরিকল্পনা থাকা উচিত, যে আমরা কীভাবে ওই এলাকা সাজাব।

বহুমুখী এই সেতু প্রকল্পের কাজ গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৮৭.৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জুনের মধ্যেই সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। এই সেতু হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ১.২৩ শতাংশ বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে ড. আতিউর রহমান বলেন, আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি তাহলেও দক্ষিণ বাংলার যে ২১টি জেলা আছে সেখানে ২ শতাংশ জিডিপি বাড়বে। আর পুরো দেশের জিডিপি কম করে হলেও ১ শতাংশ বাড়বে, এর বেশিও বাড়তে পারে।

এটাই হলো আমাদের পদ্মা সেতু, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা, সমৃদ্ধি, অহংকার ও সাহসের প্রতীক, যার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর মনে করেন, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ ঘটাবে পদ্মা সেতু।

তিনি বলেন, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। পদ্মা সেতু চালুর পর অর্থনীতিতে তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ ঘটবে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার কানেক্টিভিটি বেড়ে যাবে, যার কারণে সেখানকার কৃষি খাত বেগবান হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে বিপ্লব ঘটবে। দ্রুত পণ্য আনা-নেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সারা দেশে বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে শিক্ষাব্যবস্থায়।

এ ছাড়া কুয়াকাটা, সুন্দরবন ও বঙ্গবন্ধুর সমাধি ঘিরে পর্যটন খাত বিকশিত হবে। অল্প সময়ের মধ্যে মানুষ তখন টুঙ্গিপাড়া, ৬০ গম্বুজ মসজিদ, কুয়াকাটাসহ নদীর ওই পাড়ে যেতে পারবে। হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠবে। মোংলা বন্দর, পায়রা বন্দরেও এনার্জি হাব হবে। ওই এলাকায় অনেক শিপ বিল্ডিং প্রতিষ্ঠান হবে। এসব শিল্পের জন্য যদি আমরা আলাদা করে প্রণোদনা দিই, তাহলে সার্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে উল্লম্ফন ঘটবে।

ড. আতিউর রহমান বলেন, এখন জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের যেসব মানুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী হয়েছে, তারা এলাকায় ফিরে যাবে এবং সেখানেই উৎপাদন, সেবা ও বাণিজ্যমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে। এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে।

পদ্মা সেতুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ও প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। মৃত্যুর কিছুদিন আগে পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা ও বাস্তবতা নিয়ে লিখেছিলেন তিনি।

তিনি লিখেছেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বাংলাদেশজুড়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তখন পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে শুধু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই আমূল বদলে যাবে।

এই সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলী ও স্থপতি প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী লিখেছেন, এই পথটি ট্রান্স-এশীয় রেলপথের অংশ হবে। তখন যাত্রীবাহী ট্রেন যত চলবে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি চলবে মালবোঝাই ট্রেন। ডাবল কন্টেইনার নিয়েও ছুটবে ট্রেন। তখন পুরো দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।

ড. জামিলুর রেজা আরও বলেছিলেন, কোনো বিনিয়োগের ১২ শতাংশ রেট অফ রিটার্ন হলে প্রকল্পটিকে আদর্শ বিবেচনা করা হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বছরে ১৯ শতাংশ করে বিনিয়োগ উঠে আসবে।

পদ্মা সেতু বাঙালির স্পর্ধার সমান

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান মনে করেন, পদ্মা সেতু বাঙালির স্পর্ধার সমান, সাহসের সমান একটি স্থাপনা।

এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুর জেলার যে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে, সেটি হচ্ছে সোনালি সেতুর শ্যামলভূমি শরীয়তপুর। সেতুর কারণে শরীয়তপুরে সোনা ফলবে- সেই প্রত্যাশাই আমাদের।

তার মতে, পদ্মা সেতু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দেশপ্রেম সর্বোচ্চ শিখরে উত্তীর্ণ হওয়ার কারণেই। শুধু দেশের প্রয়োজনেই তিনি তার স্পর্ধিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাই পদ্মা সেতু আজ পদ্মা নদীর বুক চিড়ে দাঁড়িয়ে।

জাজিরার গনির মোড় এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা প্রতিবেদকের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, স্বপ্নের এই সেতুর জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু সেতুর সঙ্গে শরীয়তপুরের কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে তার সবই হচ্ছে মাদারীপুরকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচরকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ক্ষোভও আছে তাদের মধ্যে।

তাদের একজন বলেন, কই এখনও তো কিছু হলো না। দোকানের বেচা-বিক্রি আগে যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। আমাদের এলাকায় তো বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানও চালু হয়নি।

একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানান সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শরীয়তপুরের সভাপতি আহসান উল্লাহ ইসমাইলী, আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন।

ইসমাইলী বলেন, শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুতে ওঠার জন্য কোনো লিঙ্ক রোড রাখা হয়নি। এতে আমাদের এলাকার পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনকে মাদারীপুর দিয়ে যেতে হবে। এ কারণে যানজট ও হয়রানির শঙ্কা রয়েছে।

রোকন বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলেও আমাদের শরীয়তপুরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান কিংবা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কতটা হবে, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। কারণ এই জেলার সঙ্গে পদ্মা সেতুর সরাসরি কোনো লিংক নেই। এশিয়ান হাইওয়ে থেকেও আমরা বঞ্চিত। পদ্মা সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প-অর্থনৈতিক জোন, যা কিছু হচ্ছে সবই মাদারীপুর ও শিবচরকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। এতে শরীয়তপুরের বৃহৎ অংশ এসব উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে জাজিরার নাওডোবা এলাকার বেশ কয়েকজন জানান, তারা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছেন। আশা করছেন, এই সেতু তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।

জাজিরার বাসিন্দা দৈনিক সংবাদের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-চিকিৎসা সবক্ষেত্রেই এখানকার মানুষকে ঢাকা যেতে হয়। অনেক সময় চিকিৎসা নিতে ঢাকা যেতে যেতেই রোগী মারা যান। সবজি পচে যায় নদীর তীরেই। কখনও কখনও চাঁদপুর বা চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা যেতে হয়। এতে যাতায়াত ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পদ্মা সেতু চালু হলে এসব সমস্যা সমাধান হবে।

জাজিরার কাজিরহাট বন্দরের ব্যবসায়ী বরকত মোল্লা বলেন, এ বন্দরে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার ব্যবসায়ীরা আসেন। তারা সব ধরনের পণ্য এখান থেকেই নেন। এসব পণ্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আনা হয়। নদীপথে পণ্য আমদানির যেমন বাড়তি খরচ, তেমনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেতু হলে কম মূল্যে আনা-নেয়া করা সম্ভব হবে। তাতে সরাসরি উপকৃত হবেন প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকরা।

‘আমরা কী পাইলাম’ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক

স্থানীয়দের অসন্তোষের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক পারভেজ বলেন, পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা জাজিরায়। কিছু দূর যাওয়ার পর সুন্দর রাস্তাটা চলে যাচ্ছে মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরের দিকে। আর এই পাশের রাস্তাটা ভালো না, যেটি ট্রেন লাইনের নিচ দিয়ে শরীয়তপুরের দিকে গেছে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে- আমরা কী পাইলাম? কিন্তু বিষয়টা তা না। এই সেতু শরীয়তপুরকে রেললাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত করবে মোংলা, বেনাপোল ও সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরকে।

তিনি জানান, পদ্মা সেতুর মূল প্রজেক্টে শরীয়তপুরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক ছিল না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে বলার পর সংযোগ সড়কের অনুমোদন পাওয়া গেছে।

এগিয়ে নেবে মৃৎশিল্প ও পিতল শিল্পকে

স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেদককে জানান, শরীয়তপুর অনেক আগে থেকেই মৃৎশিল্প ও পিতলের জিনিসপত্রের জন্য বিখ্যাত। এখানকার টেরাকোটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পটারি ইউরোপসহ বিশ্বের ২০টি দেশে যায়।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মনে করেন, পদ্মা সেতু এই দুই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেবে। এর বাইরে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে কৃষি খাতে, বিশেষ করে কালো জিরা, ধনিয়া ও কাঁচা মরিচের।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণে নড়িয়া উপজেলা ও চাঁদপুর পর্যন্ত পদ্মা নদী, নদীর পাড় ও চরগুলো পর্যটন শিল্পের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান।

তিনি বলেন, দুর্দান্ত সম্ভাবনা আছে আমাদের পর্যটনের ক্ষেত্রে। পদ্মা সেতু দেখার জন্য প্রচুর মানুষ আসবে। শরীয়তপুর থেকে জাজিরার দিকে যেতে ডান পাশে রূপবাবুর হাট বলে চমৎকার একটি জায়গা আছে, যেটি জলমহাল হিসেবে ইজারা দেয়া হয়। এ বছর ইজারা শেষ হবে। এটি মূলত পদ্মার একটি চ্যানেল, যেটি মারা গেছে।

আমাদের পরিকল্পনা আছে এটির দুই পাড় বাঁধাই করে একটি ফাইভ স্টার হোটেল করার। সেখানে গলফ খেলার মাঠ হতে পারে। এত সুন্দর একটি তট তৈরি হয়েছে, যেখানে ওয়াচ টাওয়ারও করা যেতে পারে সেতু দেখার জন্য। ওখান থেকে মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর জেলার কানেক্টিভিটি রয়েছে। এই অঞ্চল চর ট্যুরিজমের জন্য খুবই উপযোগী। নদীপথে যদি আমরা রিভারক্রুজের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে দর্শনীয় একটি পর্যটন স্পট হতে পারে।

জেলা প্রশাসক জানান, জাজিরা প্রান্তে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম হতে পারে। কারণ ঢাকা থেকে বিকেএসপি যেতে যে সময় লাগে, তার চেয়ে জাজিরায় আসতে কম সময় লাগবে। শরীয়তপুর জেলা স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এটিও আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচের জন্য অনুশীলন ভেন্যু হতে পারে।

এটা করা গেলে এখানে হোটেল-মোটেল তৈরির সম্ভাবনা জেগে উঠবে। পদ্মা সেতুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শরীয়তপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা যায় কি না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা চলছে।

শরীয়তপুরে শেখ হাসিনা কৃষি ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বেশকছিু হিমাগার হচ্ছে জাজিরা রোডে। পদ্মা সেতুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে যারা শিল্প-কারখানা করতে চান, তাদের সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত জেলা প্রশাসন।

পদ্মার পাড় দিয়ে রিভার ড্রাইভ

জেলা প্রশাসক পারভেজ আরও জানান, গোসাইরহাট থেকে শুরু করে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পাশ দিয়ে রিভার ড্রাইভ হবে। ইতিমধ্যে নড়িয়ার অংশে হয়ে গেছে। নড়িয়ার যে রাস্তাটা করা হয়েছে সেটাকে জাজিরা পর্যন্ত নিয়ে আসার চিন্তা-ভাবনা চলছে। মোটরসাইকেল নিয়ে যে ছেলেটি পদ্মা সেতু পার হলো সে আর শরীয়তপুরে না গিয়ে রিভার ড্রাইভ দিয়ে সরাসরি গোঁসাইরহাটে চলে যেতে পারবে।

জমির দাম বেড়েছে ১০ গুণ

শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে। শেখ হাসিনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। সখিপুর থানা উপজেলা হচ্ছে।

এই জনপদের চরাঞ্চলেও বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শরীয়তপুরের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ মুন্সিগঞ্জ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কার্তিকপুর, ব্রজেশ্বর ও চরসেনসাসে হচ্ছে বিদ্যুতের সাবস্টেশন।

তিনি জানান, মেঘনা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। চার লেনের রাস্তা হচ্ছে। এসব উন্নয়নের কারণে এই এলাকার জমি আগের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। এখন এক শতাংশ জমির দাম উঠেছে ৩-৪ লাখ টাকা, যেখানে আগে কেউ এখানে জমি কিনত না। পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই কুর্নিশ করছে বলে মন্তব্য করেন এনামুল হক শামীম।

স্বপ্ন দেখছে নিম্ন আয়ের মানুষ

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ এই এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ দিন বদলের স্বপ্ন দেখছেন।

নড়িয়ার কেদারপুরের কালাচান ব্যাপারী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তিনি বলেন, পদ্মার দক্ষিণ পাড় থেকে ঢাকা আসা-যাওয়া অনেক সহজ হবে। আগে ৫ ঘণ্টা লাগছে। সেতু চালু হইলে কম লাগব। মিল-কারখানা হইলে আমাগো তো সুবিধা হবেই।

মুলফতগঞ্জের বাবুল খাঁ প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পদ্মায় ডিঙি নৌকায় করে মাছ ধরেন। সেই মাছ বিক্রির টাকায়ই চলে সংসার। তিনি মনে করছেন, পদ্মা সেতু হলে ঢাকার মানুষ আসবে মাছ কিনতে। তাদের কাছে বেশি দাম পাবেন।

একইভাবে স্থানীয় বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা আশায় বুক বেঁধেছেন একসময়কার গ্রাম বা পিছিয়ে পড়া অঞ্চল পুরোদস্তুর শহরে পরিণত হবে, ব্যবসা, চাকরিসহ বিভিন্ন ধরণের কর্মসংস্থানে সম্পৃক্ত হবেন হাজার হাজার মানুষ। নিউজবাংলা।

সর্বশেষ নিউজ