৩, ডিসেম্বর, ২০২১, শুক্রবার

প্রতিরক্ষা ব্যয়ে রাশিয়াকে টপকে গেল ভারত

বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার ফ্যান্টারিতে সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে চলেছে ভারত। বিশ্বের দ্বিতী জনবহুল দেশটি প্রতিবছরই সামরিক বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশি পাকিস্তান ও শক্তিশালী চীনকে রুখতে গিয়ে তাদের এটা করতেই হচ্ছে। এবার এই খাতে বরাদ্দের হিসাবে রাশিয়াকে টপকে বিশ্বের প্রথম তিনটি দেশের তালিকায় নাম উঠল ভারতের।

সুইডেনভিত্তিক প্রতিরক্ষা সমীক্ষা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) সোমবার (২৬ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরই ভারতের অবস্থান। দেশটি প্রথমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় সমরাস্ত্র উৎপাদক রাশিয়াকে পেছনে ফেলল।

২০২০ সালের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এসআইপিআরআই বলছে, সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ছিল ৭৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। চীনের দুই লাখ ৫২ হাজার কোটি ডলার। আর, ভারতের সাত হাজার ২৯০ কোটি ডলার। এই তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা রাশিয়ায় ২০২০ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ছয় হাজার ১৭০ ডলার, পঞ্চম যুক্তরাজ্যের পাঁচ হাজার ৯২০ কোটি ডলার, ষষ্ঠ সৌদি আরবের পাঁচ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। যৌথভাবে সপ্তম ফ্রান্স ও জার্মানির সামরিক বরাদ্দের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনালের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে মোট সামরিক ব্যয়ের ৩৯ শতাংশই করে যুক্তরাষ্ট্র। চীন ১৩ শতাংশ এবং ভারত ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির তুলনামূলক পরিসংখ্যানেও এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশে এক বছরে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। বৃদ্ধির হারে চীনকে (১ দশমিক ৭ শতাংশ) ছাপিয়ে গেছে ভারত (২ দশমিক ৯ শতাংশ)।

এদিকে, করোনাভাইরাসের ভয়াবহ থাবায় বেসামাল বিশ্ব। ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ৩১ লাখেরও বেশি। অর্থনৈতিক বিপর্যয় সারাবিশ্বেই। ভেঙে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। অনেক দেশে শুধু ভঙুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে। ক্ষুধা আর দারিদ্র্য বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমলেও বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম।

এর মধ্যে বর্তমানে করোনায় ভারতের অবস্থাই সবচেয়ে নাজুক। দেশটি প্রবল অক্সিজেন সঙ্কটে ভুগছে। তারপরও ভঙুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নে গত এক বছরেও কোনও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। অক্সিজেনের অভাবে বহু রোগী মারা গেছে। হাসপাতালে শয্যা শঙ্কট।

করোনাকালীন এই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেও ২০২০ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়েছে। ২০২০ সালে এই ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ ওই বছরে সামরিক খাতে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। সোমবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রির্সাচ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এসআইপিআরআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বড় বড় দেশে কিছু প্রতিরক্ষা তহবিল স্থানান্তর করা হলেও বিশ্বে মোট সামরিক ব্যয় কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে পাঁচটি দেশ। তাদের সম্মিলিত ব্যয় বিশ্বজুড়ে মোট ব্যয়ের ৬২ শতাংশ।

এই বৈশ্বিক মহামারির মধ্যেও সামরিক ব্যয় বাড়ানো দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্য। অথচ এই মহামারির ভয়াবহ থাবায় দেশগুলোর অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

এসআইপিআরআইর গবেষক দিয়েগো লোপেজ দ্য সিলভা বলেছেন, ‘কিছু নিশ্চয়তাসহ আমরা বলতে পারি ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয়ের ওপর মহামারির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ছিল না।’

মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী জিডিপি হ্রাস পেলেও জিডিপির অংশ হিসেবে সামরিক ব্যয়ের বৈশ্বিক গড় ২০১৯ সালের চেয়ে দুই দশমিক দুই শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে দুই দশমিক চার শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

যদিও চিলি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশ তাদের পরিকল্পিত সামরিক ব্যয়ের কিছু অংশ মহামারি মোকাবিলার জন্য স্থানান্তর করেছে। এ ছাড়া ব্রাজিল ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ ২০২০ সালের জন্য তাদের প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত বাজেটের চেয়ে অনেক কম ব্যয় করেছে।

২০২০ সালে সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্র ৭৭৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ ব্যয় ২০১৯ সালের চেয়ে চার দশমিক চার শতাংশ বেশি। বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে ২০২০ সালের বৈশ্বিক মোট সামরিক ব্যয়ের ৩৯ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ নিয়ে টানা তৃতীয় বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বাড়ল। এর আগে টানা সাত বছর ধরে দেশটি এ খাতে ব্যয় হ্রাস করেছিল।

গত বছর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় ছিল চীনের। ওই বছর এ খাতে দেশটির মোট হিসাবকৃত ব্যয় ২৫২ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের চেয়ে যা এক দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। চীনের সামরিক ব্যয় গত ২৬ বছর ধরে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এসআইপিআরআইর তথ্য অনুযায়ী, কোনো বিঘ্ন ছাড়াই সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে ধারাবাহিকভাবে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করা একমাত্র দেশ চীন।

বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় বলা হয়, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির হারে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে দিয়েছে চীন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তাদের সামরিক বাহিনীর কলেবরও বড়। এখন এর সঙ্গে তারা অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র যোগ করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই গতিতে এগোতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলবে বেইজিং।

সর্বশেষ নিউজ