১৪, জুন, ২০২১, সোমবার

ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইহুদী রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে করণীয় পর্ব-০২

ফিলিস্তিন ভূখন্ডটি মূলত ইহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ভূখন্ডের সর্বত্র ইহুদী ধর্মের ও সভ্যতার স্মৃতিবিজড়িত নানা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ইহুদীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর জেরুজালেম, এখানে রয়েছে ইহুদী মন্দির টেম্পল মাউন্টেন ও বিখ্যাত পশ্চিম দেয়াল। অপরদিকে মুসলিম ও খ্রিস্টানদেরও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থান এই জেরুজালেম শহর। এখানে রয়েছে যিশুখ্রিস্টের জন্মস্থান বেথেলহেম, বাসস্থান নাজারেথ। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান হারাম আল শরীফ (আল-আকসা মসজিদ) এখানে অবস্থিত। আল আকসা মসজিদ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা হিসাবেও পরিচিত।
ইহুদীরা বিশ্বাস করে বাইবেলে বর্ণিত পিতৃপুরুষ আব্রাহাম এবং তার বংশধরদের জন্য যে পবিত্রভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, আজকের আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই ভূমি নিয়ে সংঘাত চলছে। আসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়ান, পার্সিয়ান, ম্যাসিডোনিয়ান এবং রোমানরা সেখানে অভিযান চালিয়ে, সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। রোমানরা সেখানে ‘জুডেয়া’ নামে একটি প্রদেশ তৈরি করেছিল।
এই ‘জুডেয়া’ প্রদেশের ইহুদীরা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করেছেন। ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের আমলে এক বিরাট জাতীয়তাবাদী ইহুদী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিলো। সম্রাট সেই বিদ্রোহ দমন করে জুডেয়াকে রোমানদের অধীনে নিয়ে সিরিয়াকে যুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ তৈরী করে সিরিয়া-প্যালেস্টাইন প্রদেশ নাম দিয়েছিলো
এসব যুদ্ধ-বিগ্রহে ইহুদীদের ব্যাপক হারে হত্যা করা হয়।ফলে ইহুদীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে থাকে। অসংখ্য ইহুদী বিভিন্ন অঞ্চলে সেচ্ছায় নির্বাসিত হয়েছে। অনেক ইহুদীকে আবার দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য দ্বারা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের ফলে গ্রিকো-রোমান খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠের দিকে অগ্রসর হয় এটি। অস্টম শতকে ইসলামের উত্থান ঘটলে প্যালেস্টাইন জয় করে আরবরা। এর পরে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা সেখানে অভিযান চালায়। (১০৯৯-১২৯১) পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার পরে ভূখন্ডটি ধীরে ধীরে মুসলিম অধ্যুসিত হয়ে উঠে। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মূলত এটি আরব ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর অঞ্চল হিসেবে মামলুক সালতানাতের সিরিয়ান প্রদেশের অংশ হিসেবে পরিণত হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে ওসমানীয় শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে অটোমান শাসকরা ফিলিস্তিন ভূখন্ড দখল করে নেয়।
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের কাছে তুরস্কের ৪০০ বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে ইহুদী বিদ্বেষ মারাত্মক রুপ ধারণ করলে ফিলিস্তিনি ভুখন্ডে ইহুদীদের প্রত্যাবর্তন বৃদ্ধি পেতে থাকে। অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ফিলিস্তিনি জনগণের সমর্থন পাবার জন্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর্ড প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে যুদ্ধে তারা জয়ী হলে ফিলিস্তিনি ভুখন্ডে এতদ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি স্বাতন্ত্র জাতীয় আবাসস্থল তৈরী করবেন। যুদ্ধে ব্রিটেন জয়ী হওয়ার পরে বেলফোর্ডের ঘোষণা অনুযায়ী লীগ অব নেশনস কর্তৃক ফিলিস্তিন ভূখন্ড শাসন করার ম্যান্ডেট ব্রিটেন লাভ করে।
তখন এই অঞ্চলটির নতুন নামকরণ হয় মেন্ডেটরী প্যালেস্টাইন। ফিলিস্তিনি ভুখন্ডে আরবরা ইহুদীদের চেয়ে সংখ্যায় চারগুণেরও বেশী হওয়ায় তাদের ধারণা ছিলো ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিন ভুখন্ডে যে স্বাতন্ত্র রাষ্ট্র গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে তা আরবদের অনুকুলেই হবে। ফলে আরব জাতীয়তাবাদ ও পূর্বের অটোমান অঞ্চলসমুহের নাগরিকরা তাদের অধিকার দাবি করে এবং ফিলিস্তিনে ইহুদীদের অভিবাসন রোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইহুদীরা প্রতিনিয়তই ফিলিস্তিনি আরবদের উপর আগ্রাসী হয়ে উঠতে থাকে। ফলে আরব ইহুদী উত্তেজনা দানাবেধে উঠতে থাকে।

-চলমান

লেখকঃ শ্যামল কুমার রায়, সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

সর্বশেষ নিউজ