৩, ডিসেম্বর, ২০২১, শুক্রবার

বিধ্বস্ত গাজা যেন ধ্বংসস্তূপের সমুদ্র

গাজার বাতাসে এখন শুধুই লাশপচা দুর্গন্ধ। ১১ দিনের ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত শহরটি। ব্যস্ততম শহরের ঘনবসতিগুলো এখন যেন ইট-পাথরের মরুভূমি।

যুদ্ধবিরতি শুরু হতেই তল্পিতল্পা নিয়ে ফিরতে শুরু করেছেন ‘ধ্বংসস্তূপের সমুদ্রে’। ধসে পড়া বিধ্বস্ত ভবনগুলোতেই লেপ-তোশক-আসবাব পেতে কোনোরকমে শুরু করেছে তাদের নতুন জীবন।

পানি নেই, খাবার নেই-বিদ্যুৎবিহীন এলাকাগুলোতে ‘মহামারির’ মতো ছড়িয়ে পড়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়। ইসরাইলের কামানের গোলা থেকে বেঁচে যাওয়া গাজাবাসীর জীবনযুদ্ধের এমন কিছু করুণ খণ্ডচিত্রই তুলে ধরেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।

ইসরাইল ও হামাসের যুদ্ধবিরতির প্রথম দিন। গাজা শহরের উপকণ্ঠে একাকী দাঁড়িয়ে যুবক সামি। করুণ দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন একটি খালি জায়গার দিকে।

ওখানেই তার বোনের বাড়িটি ছিল। এখন সেখানে শুধু ইট-পাথরের গুঁড়িয়ে যাওয়া স্তূপ। তার নিচেই চাপা পড়ে আছে সামির স্বজনরা।

তার ঘন নিঃশ্বাসের সঙ্গে গাল বেয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ইসরাইলি বিমান হামলায় তার পরিবারের ১২ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি আতঙ্কে আছেন। আবার কখন যেন শুরু হয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলা। বললেন, ‘ওরা আমাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেবে না।’

গাজার ক্ষতি পূরণ হবে না। ইসরাইলি বিমান হামলায় ৬৬ শিশুসহ ২৩০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এক হাজারের বেশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধ্বংস হয়েছে। ৭৭ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ১৭টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, ৫৩টি স্কুল ভবনও গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। পানি, বিদ্যুৎ ও সুয়ারেজ লাইনের অবকাঠামো উপড়ে ফেলেছে তারা।

সামি আবুল ওউফ বলেন, ‘যখনই গাজায় যুদ্ধ হয় তখনই তা আমাদের ২০ বছর পেছনে ফেলে দেয়। যখনই আমরা অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হতে শুরু করি, তখনই ওরা পরিকল্পিতভাবে আমাদেরকে পেছনে ফেলে দেয়।’ যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও পূর্ব জেরুজালেম এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে শুক্রবার স্থবিরতা অব্যাহত ছিল।

ইসরাইলি পুলিশ শুক্রবারের নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে অভিযান চালিয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেষ্টা করছেন।

সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসেছেন ২৫ বছরের যুবক শাহেদ আবু খোসা। তিনি বললেন, ‘আমি আশা ছাড়িনি। আমরা একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবই।’ মুদি দোকানি মোহাম্মদ কোল্লাকের বয়স ২৪। গত রোববারের আক্রমণে ধ্বংস হওয়া নিচে আটকে পড়েছিলেন তিনি। কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও হাত হারিয়ে পঙ্গু তিনি।

তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকেই হারিয়েছেন সেদিন। এখন আর থাকার জায়গা নেই। বোমা হামলায় ধসে যাওয়া বাড়ির ওই ধ্বংসাবশেষই তার একমাত্র আশ্রয়।

তিনি বললেন, ‘এই যুদ্ধবিরতির কোনো মানে হয় না। ওরা আবার আক্রমণ করবে। আমাদের অর্থনীতি আর পুনর্নিমাণ সম্ভব হবে না।’ রেস্তোরাঁ মালিক মুনির সালের বয়স ৫৩। তিনি বললেন, ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে।

আল-আকসার জন্য আমাদের যা কিছু আছে, ত্যাগ করতে হবে।’ এক মধ্যবয়সি ফিলিস্তিনি একটি বিশাল আকারের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখানে কোনো পানি নেই।

জানালেন এখানেই তার বাড়িটি ছিল। বোমার আঘাতে তার ভবনটি ধ্বংস হয়ে ওখানে পুকুরের মতো গর্ত হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘আমাদের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। সামনে বহু পথ বাকি।’

সর্বশেষ নিউজ