১, ডিসেম্বর, ২০২১, বুধবার

মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ: কঠিন পরীক্ষার সামনে বাংলাদেশ

“দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,/ ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?”- জাতির যেকোনও দুর্দিনে বিদ্রোহী কবির এ পঙক্তিগুলো মানুষকে আন্দোলিত করে, সাহসী করে, সমূহ বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে। এইতো মাত্র দেড়-দু’মাস আগের কথা, মানুষ প্রায় ভুলতেই বসেছিল করোনার ভীতি। কিন্তু মার্চের শুরু থেকে পুরো মাস জুড়েই একটু একটু করে আবারও চোখ রাঙাতে শুরু করে প্রাণঘাতি ভাইরাসটি। মাসের শেষ সপ্তাহে তো ব্যাপকভাবেই সংক্রমণ বেড়ে যায়। আর এপ্রিলের এ ক’দিনে দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে, গেল বছর করোনা শুরুর পর যা প্রথম।

কিন্তু করোনা থেকে মুক্তির উপায় কী? নিজেকে সুরক্ষিত রাখারইবা কী কৌশল? প্রতিদিন যে হারে রোগী বাড়ছে, তাতে করে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থাও নেই। আর আইসিইউ সংকট তো প্রকট আকার ধারণ করেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার প্রধান তিনটি উপায়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ১. নিয়মিত মাস্ক পরা, ২. বারবার সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া, ৩. প্রতিমুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।

যদি এ তিনটি উপায়কেই অবলম্বন ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের চিত্রটা কী? সরেজমিনে দেখা যাচ্ছে, মানুষ মাস্ক পরছে না। সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও মানুষ সেদিকে কান দিচ্ছে না। এমনকি আমাদের শিক্ষিতজনেরাও না।

রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে কিংবা কর্মস্থলে আজকাল করোনাকে কেউ গুরুত্বই দিতে চাচ্ছে না। আর সেই সুযোগে করোনা তার ভয়াল থাবা আরও জোরেসোরে বসাচ্ছে। প্রতিদিন সংক্রমণে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। মৃত্যুর সারিও দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু মানুষের সেদিকে কোনও গরজ নেই। যেন চারপাশে এক ধরনের ‘গা-সওয়া’ ভাব।

গেল ৫ এপ্রিল সরকার ৭ দিনের জন্য সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শিল্প কারখানা খোলা রাখা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অর্ধেক জনবলে পরিচালনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, গেল বছরের এপ্রিল থেকে জুন-জুলাই সময় পর্যন্ত দেশে এক ধরনের সাধারণ ছুটি বলবৎ ছিল। মানুষ তখন সেই নির্দেশনা যথাসম্ভব মেনেছিল কিংবা মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের নজরদারিতে মানুষকে মানতে বাধ্য করা হয়েছিল। এবার যেন দুটির কোনোটিই নেই। অথচ, সাধারণ ছুটির চেয়েও লকডাউন প্রক্রিয়াটা আরও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল।

দেশে লকডাউন শুরুর প্রথম দিন থেকেই এর বিরুদ্ধে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রদর্শন হতে দেখা যায়। বিশেষত দুটি কারণে তা হয়। প্রথম কারণটি হচ্ছে, সীমিত পরিসরে কর্মস্থল খোলা রেখে লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া। আর তাতে করে কর্মজীবী মানুষকে মাইলের পর মাইল পথ পায়ে হেঁটে অফিস-কর্মস্থলে যাওয়া। আর দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, শিল্প কারখানা কিংবা অফিস খোলা রাখলেও লকডাউনে দোকানপাট-শপিংমল বন্ধ রাখা। প্রতি লকডাউন চলাকালে কর্মজীবী ও ব্যবসায়ী এই দুই শ্রেণির মানুষকেই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। আর তাতে করে সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

গেল বছর সাধারণ ছুটির সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেভাবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে দেখা গেছে, এবার লকডাউনেও তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছে না। ফলে সরকার ঘোষিত লকডাউন যেন ‘নামেই’ কার্যকর হচ্ছে।

দেশে যে হারে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে চলেছে, তাতে করে এখনই যদি প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া না হয় তবে পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও শোচনীয় ও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

প্রথমবারের মতো দেশ দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায়ও যথাসাধ্য সফল হোক, মানুষের সেটিই প্রত্যাশা। তবে লকডাউনের নামে, সাধারণ ছুটির নামে শ্রমজীবী, দিনমুজুর কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষের পেটের ক্ষুধা যেন গুম হয়ে না যায়, সেদিকেও রাষ্ট্রের বিশেষ নজর থাকা উচিত বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনেরা। আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে বা মানাতে যত রকম কঠোরতা, মানুষ বাঁচাতে সব এখনই প্রয়োগের চূড়ান্ত সময়- বিশেষজ্ঞ মহল তেমনটিও বলছেন।

সর্বশেষ নিউজ