২১, সেপ্টেম্বর, ২০২১, মঙ্গলবার

যেভাবে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের উত্থান

মিয়ানমরে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতার মসনদে এখন মিন অং হ্লাইং। ফলে তিনি কিভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেন, বিশ্ববাসী তার বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেয়- তা এখন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জনবিচ্ছিন্ন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সামান্যই জানতে পারে বাইরের মানুষ। মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিয়ে বিশ্লেষণমূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।

রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা

১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে সেনাবাহিনী সরাসরি শাসন করেছে আর দীর্ঘদিন তারা নিজেদের জাতীয় ঐক্যের রক্ষক হিসেবে দেখিয়েছে। মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধানের প্রণেতা হিসেবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী নিজেদের একটি স্থায়ী ভূমিকা নিশ্চিত করে রেখেছে। পার্লামেন্টের আসনে তারা অনির্বাচিত ২৫ শতাংশ কোটা এবং এর প্রধান প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রেখে দেয়, তাতে নিশ্চিত হয় রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা। আর এই সংবিধান নিশ্চিত হয় এনএলডি’র সঙ্গে তাদের ক্ষমতা ভাগাভাগির ভীতিজনক আয়োজনের ভিত্তিতে। দলটির নেতা অং সান সু চি-সহ বহু নেতা সাবেক জান্তা সরকারের বিরোধিতার কারণে বহু বছর নিপীড়ন সহ্য করেছে।

ধীর এবং অবিচল উত্থান

৬৪ বছর বয়সী মিন অং হ্লাং রাজনৈতিক অ্যাকটিভিজমের বিষয়ে স্পষ্টবাদী। ১৯৭২-৭৪ সালে তিনি যখন ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন তখন ছড়িয়ে পড়া অ্যাক্টিভিজমেও আগ্রহী ছিলেন না তিনি। ২০১৬ সালে তার এক সহপাঠী রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘তিনি খুব অল্প কথার মানুষ আর সাধারণত লো প্রোফাইলের।’

সহপাঠী শিক্ষার্থীরা যখন বিক্ষোভে যোগ দিতেন তখন মিন অং হ্লাং প্রতি বছরই মিলিটারি বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য ডিফেন্স সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে (ডিএসএ) ভর্তির আবেদন করতেন। তৃতীয়বারের চেষ্টায় ১৯৭৪ সালে তিনি সফল হন।

ডিএসএ-তে তার ক্লাসের এক সদস্য ২০১৬ সালে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন। ওই সদস্যের সঙ্গে মিন অং হ্লাংয়ের প্রতিবছর ক্লাস রিইউনিয়নে দেখাও হয়। ক্লাসমেট জানান, তিনি নিয়মিত এবং ধীরে ধীরে প্রমোশন পেতেন।’ তাকে অফিসারদের মাঝামাঝি র‍্যাংকে উঠে আসতে দেখার সময়ই ওই ক্লাসমেট অবাক হয়েছিলেন।

সেনাসদস্য থেকে রাজনীতিবিদ

২০১১ সালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হতেই মিন অং হ্লাং সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালে অং সান সু চির প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে মিন অং হ্লাং স্বল্পভাষী সেনা সদস্য থেকে নিজেকে একজন রাজনীতিবিদ এবং পাবলিক ফিগার হিসেবে বদলে ফেলেন।

পর্যবেক্ষকরা এক্ষেত্রে উল্লেখ করে থাকেন তার কার্যক্রম, মঠ পরিদর্শন কিংবা যাজকদের সঙ্গে বৈঠকের মতো কার্যক্রম ফেসবুকে প্রকাশ করার কথা। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণে মুছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তার সরকারি ফেসবুক পাতায় ছিল লাখ লাখ অনুসারী।

মিন অং হ্লাং অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়েও পড়াশোনা করেছেন। পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, ২০১১ সালে শাসক পরিবর্তনের পর তিনি লিবিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বিশৃঙ্খলা এড়ানোর প্রয়োজনের কথাও বলেছেন।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান কোনও সময়েই পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ সামরিক আসনের বিধান বাতিল কিংবা সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার বন্ধ পথ খুলে দিতে সংবিধান সংশোধনের আগ্রহের কোনও লক্ষণ দেখাননি।

শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজের ক্ষমতার মেয়াদ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ান মিন অং হ্লাং। ওই সময়ে ধারণা করা হচ্ছিলো, সামরিক নেতৃত্বের নিয়মিত রদবদলের অংশ হিসেবে হয়তো তিনি সরে যাবেন। তবে তিনি নিজের মেয়াদ বাড়ানোয় অনেক পর্যবেক্ষকই অবাক হন।

নিষেধাজ্ঞা

২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের কারণে সাত লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের মধ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গণঅগ্নিসংযোগ চালানো হয়েছে আর এসব করা হয়েছে গণহত্যার উদ্দেশ্য থেকে। এর জেরে জাতিসংঘ ২০১৯ সালে মিন অং হ্লাং ছাড়াও আরও তিন সেনা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ আরও কয়েকটি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। এমনকি ২০১৯ সালে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাণিজ্য করা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানায়।

সর্বশেষ নিউজ