২১, জানুয়ারী, ২০২২, শুক্রবার

শরীয়তপুরের আওয়ামীলীগের নেতা হাবিব ও তার ভাই মনির হত্যায় ৬ জনের ফাঁসি

নাছির আহম্দে আলী, শরীয়তপুর প্রতিনিধি : দীর্ঘ ২০ বছর পর আজ রোববার সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে শরীয়তপুরের বহুল আলোচিত জেলা আওয়ামীলীগে নেতা ও জজ কোর্টে সাবেক পিপি হাবিবুর রহমান ও তার ভাই যুবলীগ নেতা মনির হোসেন মুন্সি হত্যা মামলার রায়ে ৬ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। ৪ জনের যাবজ্জীবন, ৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। বাকি ৪০ আসামীকে খালাস দেয়া হয়েছে।
রোববার ২টার দিকে শরীয়তপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসাইন এ রায় ঘোষনা করেন। মৃত্যুপ্রাপ্ত ৪ আসামীসহ ৩৯ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

৫ জন আসামী পলাতক রয়েছে বলে পিপি এ্যাভোকেট মিজা হরযত আলী জানিয়েছেন। রায়ে বাদী পক্ষ পুরোপুরি সন্তোষ প্রকাশ করেনি তারা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আসামী পক্ষ বলছেন ন্যায় বিচার পায়নি। তারাও উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন, শাহিন কোতোয়াল, শহীদ কোতোয়াল, শফিক কোতোয়াল, শহীদ তালুকদার, মো: মজিবুর রহমান তালুকদার ও মো: সলেমান সরদার।

শরীয়তপুর জেলা জজ আদালতের পিপি মীর্জা মো. হযরত আলী ও কোট সুত্রে জানা গেছে, রায় ঘিরে রোববার সকাল থেকেই আদালতপাড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল ৯ টা থেকে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবি ও সাংবাদিকদের তল্লাশি করে আদালত ভবনের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। সকাল ১১ টায় জেল হাজত থেকে ২৬ আসামীদের আদালতে আনা হয়। এর আগে জামিনে থাকা ১৩ জনকে আদালতে আসেন। এর পর সাড়ে ১১ টার শরীয়তপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসাইন আদালতে আসেন।

এ মামলায় দীঘ শুনানী ও ২৮ জন সাক্ষ্য গ্রহন করে। ১৩৩ পৃষ্টা রায়ের কপি বিশেষ বিশেষ অংশ পড়ে শুনানো হয়। বেলা ২ টার দিকে আদালত এ মামলায় ৬ জন আসামী শাহিন কোতোয়াল, শহীদ কোতোয়াল, শফিক কোতোয়াল, শহীদ তালুকদার, মজিবুর রহমান তালুকদার ও সলেমান সরদারকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। রায়ে মামলার অন্যতম আসামী সরোয়ার হোসেন বাবুল তালুকদার, বাবুল খান, ডাবলু তালুকদার ও টোকাই রশিদকে যাবজ্জীবন স্বশ্রম কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৬ মাস করে কারাদন্ডাদেশ প্রদান করে।

এ মামলায় মন্টু তালুকদার, আসলাম সরদার ও জাকির হোসেন মজনু সরদারকে ২ বছরের স্বশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়। মামলায় বাকি ৪০ জন আসামী নির্দোষ প্রমান হওয়ায় বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। এ মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী শহীদ তালুকদার,শাহীন কোতোয়াল, যাবজ্ঝীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত বাবুল তালুকদার,টোকাই রশিদ ও ২ বছর কারাদন্ড প্রাপ্ত মজনু সরদার সহ ৫জন পলাতক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ মামলার আসামী পক্ষের আইনজীবি ছিলেন এড. মাসুদুর রহমান এবং সরকার পক্ষে ছিলেন সরকারী কৌশলী (পিপি) এড. মীর্জা হজরত আলী।

মামলার এজাহার ও বাদীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-১(পালং-জাজিরা)আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন, জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও জাজিরা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোবারক আলী সিকদার। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন কে এম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ জেব। তখন আওরঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ।

২০০১ সালে ১ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সংঘর্ষের কারনে ১২ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়। স্থগিত হওয়া সেই নির্বাচন নিয়ে ৫ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলা শহরের পালং উত্তর বাজার এলাকার হাবীবুর রহমানের বাসভবনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে একটি সভা চলছিল। সেখানে হামলা চালান স্বতন্ত্র প্রার্থী আওরঙ্গ-সমর্থক যুবলীগের সাবেক নেতা সরোয়ার হোসেন বাবুল তালুকদারের লোকজন। তাঁর ভাই মঞ্জুর হোসেন মন্টু তালুকদার সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। কিছুক্ষণ পর ওই বাসভবনে আবার হামলা হয়। তখন হাবীবুর রহমান ও তাঁর ভাই মনির হোসেনকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে খুন করে।

হাবীবুর রহমান তখন শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার ছোট ভাই মনির হোসেন মুন্সি ছিলেন শরীয়তপুর পৌরসভা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ব্যবসায়ী।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, হাবীবুর রহমানের স্ত্রী জিন্নাত হাবীব রহমানের করা হত্যা মামলায় আওরঙ্গকে প্রধান আসামি করা হয়। মোট ৫৫ ব্যক্তিকে আসামি করেন তিনি। পুলিশ তদন্ত শেষে তৎকালিন (পাংল জাজিরা) শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য আওরঙ্গের নাম বাদ দিয়ে ২০০৩ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। মামলার বাদী তখন আদালতে নারাজি দেন। আদালত ওই আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর জিন্নাত রহমান উচ্চ আদালতে রিট করেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জিতে সাংসদ হয়েছিলেন আওরঙ্গ। তিনি নানাভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। ২০১৩ সালের ৩ আগস্ট এক সড়ক দুর্ঘটনায় আওরঙ্গ মারা যান। এরপর উচ্চ আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেন পুলিশকে। পুলিশ ২০১৩ সালের অক্টোবরে আদালতে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। আওরঙ্গ ছাড়াও ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামী শাহজাহান মাঝি ও স্বপন কোতোয়াল মৃত্যুবরণ করেছেন। আর মামলার ৫ আসামি পলাতক রয়েছেন বলে শরীয়তপুর জেলা জজ আদালতের পিপি মীর্জা মো. হযরত আলী জানিয়েছে।

শরীয়তপুর জেলা জজ আদালতের পিপি মীর্জা মো. হযরত আলী বলেন, মামলায় বাদীপক্ষ পুরোপুরি ন্যায় বিচার পায়নি। তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
আসামী পক্ষের আইনজীবি এড্যাভোকেট. মাসুদুর রহমান বলেন, মামলায় আসামীরা ন্যায় বিচার পায়নি। তারাও উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
নিহতের ছেলে ও শরযিতপুর পৌরসভার মেয়র পারভেজ রহমান জন বলেন, আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হকে পারেনি। কারন মামলার মুল আসামীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাজা হয়নি। তাই আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো।

সর্বশেষ নিউজ