৩, ডিসেম্বর, ২০২১, শুক্রবার

শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভনে ডেকে ছাত্রদল নেতাকে খুন

পাবনা প্রতিনিধিঃ পাবনা জেলা যুবদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী (৪০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত যুথী আক্তার ওরফে আদুরী (২৮) এবং তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে (৩৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রোববার (২৩ মে) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাদের ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার উত্তর গাজীর চট এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার জাহাঙ্গীর আলম পাবনা পৌর সদরের শালগাড়ীয়া শাপলা প্লাস্টিক মোড় মহল্লার বাসিন্দা। তার গ্রামের বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার বনকোলা ঈদগাহ মাঠ এলাকায়। তিনি মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।

জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী যুথী আক্তার ওরফে আদুরীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে শাহজাহানকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।

মঙ্গলবার (২৫ মে) দুপুরে পিবিআই জানায়, চলতি বছরের ৩১ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পাবনা পৌর সদরে নিজের ফটোস্ট্যাট দোকান থেকে কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে যান যুবদল নেতা শাজাহান আলী। তারপর থেকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো খোঁজ পায়নি পরিবার। পরদিন ১ এপ্রিল এ ঘটনায় সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার স্বজনরা। নিখোঁজের পাঁচদিন পর ৫ এপ্রিল বিকেলে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলায় তার গলিত মরদেহ পাওয়া যায়।

উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নের গঙ্গারামপুর হাফিজিয়া মাদরাসার কাছে জনৈক কাসেম প্রাংয়ের বসতবাড়ির একটি টয়লেটের হাউজ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরিবারের লোকজন শাহজাহানের মৃতদেহ শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে শাহজাহানের ভাই আব্দুল গফুর পাবনা সদর থানায় ৭ এপ্রিল একটি হত্যা মামলা (মামলা নম্বর ১৫) দায়ের করেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইতে গত ১০ এপ্রিল স্থানান্তর করা হয়। মামলাটির তদন্তর দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সবুজ আলী। পিবিআই পাবনার একটি চৌকস টিম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১১ এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ইব্রাহিম প্রাংকে গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডের ‘ক্লু’ উদঘাটন করেন।

পিবিআই পাবনা ইউনিট প্রধান পুলিশ সুপার ফজলে এলাহী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সবুজ আলী জানান, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরকীয়া প্রেমের জের ধরে মামলার ভিকটিম শাহজাহান আলীর সঙ্গে যুথী আক্তার ওরফে আদুরী খাতুনের সম্পর্কের টানাপোড়ন চলতে থাকে। যুথী আক্তার আদুরী তার পরিবারসহ যে বাসায় ভাড়া থাকতেন সে বাড়ির মালিক চট্টগ্রামে বসবাস করেন। ওই বাসার ভাড়া ওঠানোর দায়িত্বে ছিলেন শাহাজাহান আলী।

শাহাজাহান আলীর বাসাও ছিল পাশাপাশি স্থানে। শাহজাহান-যুথী মোবাইল ফোনে মাঝেমধ্যে কথা বলার এক পর্যায়ে তারা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

‘শাহজাহান যুথীকে বিবাহিত স্ত্রীর মতো করে পেতে চাইতেন। কিন্তু যুথী এক সময়ে শাহাজাহানের প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। তিনি সব ঘটনা তার স্বামীকে খুলে বলেন। তখন যুথী ও তার স্বামী তাদের নিজস্ব লোকজন নিয়ে শাহজাহানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। যুথীর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক শাহজাহানকে হত্যার নীল নকশা করে ঘুমের ওষুধ কিনে স্ত্রীকে দেন।’

ঘটনার দিন (৩১ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে প্রেমিকা যুথী শাহজাহানকে শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে দোকান থেকে ডেকে নেন। তাকে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার গঙ্গারামপুরে যুথী-জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজন ইব্রাহীম প্রাংয়ের (আগেই গ্রেফতার) নিকটাত্মীয় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বাড়িতে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শাজাহানকে খাওয়ানো হয়। এতে শাহজাহান অচেতন হয়ে যান। এরপর ওই নারী, ইব্রাহিমসহ অন্যরা মিলে তার হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে শ্বাসরোধ করে খুন করেন।

হত্যার পর মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন তারা। মরদেহ বস্তাবন্দি করে গঙ্গারামপুর হাফিজিয়া মাদরাসার কাছে জনৈক কাসেম প্রাংয়ের বসতবাড়ির টয়লেটের সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেন। ওপরে খড়কুটো দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরবর্তীতে যুথী ও তার স্বামী জাহাঙ্গীর ঢাকা পালিয়ে যান।

পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার দম্পতিকে সোমবার (২৪ মে) আদালতে সোপর্দ করা হয়। তারা আদালতে শাহজাহানকে সুকৌশলে অপহরণ, হত্যা ও মরদেহ গুম করার ঘটনার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ইব্রাহীম প্রাংকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই। পরদিন ১২ এপ্রিল ইব্রাহিমকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনিও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি সে সময় অন্যান্য আসামিদের নাম-পরিচয়ও প্রকাশ করে দেন।

উল্লেখ্য, নিহত শাহজাহান আলী পাবনা শহরের শালগাড়ীয়া গোরস্থান রোড এলাকার তোফাজ্জল হোসেন ছেলে। তিনি একটি ফটোস্ট্যাট দোকান চালাতেন এবং অবিবাহিত ছিলেন। তিনি পাবনা জেলা যুবদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

সর্বশেষ নিউজ