২০, মে, ২০২২, শুক্রবার

সব পুড়ে ছাই, খোলা আকাশের নীচে ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ১২ থেকে ১৫ হাজার ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর তাতে করে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে নেমেছে অন্তত ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা।

বালুখালী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ৮ নম্বর ক্যাম্পে এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা ৪ বছর আগে সেনা নিপীড়নের মুখে সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার সময় সাধ্যমত জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। সর্বগ্রাসী আগুন তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে তারা এখন সর্বস্বান্ত।

গত সোমবার (২২ মার্চ) বিকেল ৪টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ৮-ডব্লিউ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা আশপাশের ৯, ১০ ও ১১ নম্বর ক্যাম্পে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

গতকাল সকালে অতিরিক্ত ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছু-দৌজা নয়ন জানান, ক্যাম্পের ঘরগুলো বাঁশ, কাঠ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি। ঘরগুলো খুব লাগোয়া হওয়ায় এবং বাতাসের গতি বেশি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক কর্মীসহ স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা চালায়। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়।

কক্সবাজার ১৪ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি আতিকুর রহমান জানান, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, এপিবিএন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের টানা প্রায় ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

দুর্যোগ ও ত্রাণসচিব মো. মহসীন জানান, আগুনে মৃতদের মধ্যে ৮ নম্বর ক্যাম্পের ‘ই’ ব্লকের একজন, ‘ডব্লিউ’ ব্লকের ৫ জন এবং ৯ নম্বর ক্যাম্পে ৫ জন মারা গেছেন। আগুনে ৯ হাজার ৩০০ বসতি পুরে ছাই হয়ে গেছে। এসব বসতির প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড হয়। গ্যাসের সিলিন্ডারটি বালুখালী ক্যাম্প-৮ ‘ডব্লিউ’ ব্লকের বাসিন্দা মৌলভী খলিলুর রহমানের ঘরে বিস্ফোরিত হয়।

এ বিষয়ে জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আইওএমের নেতৃত্বাধীন ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ তাফহিম জানিয়েছেন, ক্যাম্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তৈরি এক হিসাব অনুযায়ী, বালুখালী ৮ নম্বর ক্যাম্পে ঘরের সংখ্যা ৬ হাজার ২৫০টি, লোকসংখ্যা ২৯ হাজার ৪৭২ জন; ৮-ডব্লিউ ক্যাম্পে ঘর ৬ হাজার ৬১৩টি, লোকসংখ্যা ৩০ হাজার ৭৪৩ জন; ৯ নম্বর ক্যাম্পে ৭ হাজার ২০০টি ঘরে লোকসংখ্যা ৩২ হাজার ৯৬৩ জন এবং ১০ নম্বর ক্যাম্পে ৬ হাজার ৩২০টি ঘরে লোকসংখ্যা রয়েছে ২৯ হাজার ৭০৯ জন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনা নিপীড়ন, গণধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও ও গণহত্যার মুখে নতুন করে ৭-৮ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত ও সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে আশ্রয় নেয়। এরপর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নিজেদের নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে না মিয়ানমার।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও এর বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে সৃষ্ট সামাজিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোটামুটি ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে ১ লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরইমধ্যে কয়েক দফায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

সর্বশেষ নিউজ