১, জুলাই, ২০২২, শুক্রবার

সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার-ম্যাডাম’ সম্বোধনের সংস্কৃতি কীভাবে এলো

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবেন, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই – জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের এমন মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জোর আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্যার না বলায় এক ব্যবসায়ীকে লাঠিপেটা করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে।

স্যার না বলায় সাংবাদিকদের উপরে চটেছিলেন প্রশাসনের আর এক কর্মকর্তা।

এরকমই একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার এই মন্তব্য করেছেন বলে ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে জানিয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাধারণ জনগণ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্যার সম্বোধন করেন এটি যেকোনো সরকারি দফতরে, যেকোনো সময় গেলেই দেখা যাবে।

সাধারণ জনগণ চতুর্থ শ্রেণীর উপরে যেকোনো কর্মকর্তাকে স্যার বা ম্যাডাম বলবেন সেটাই সংস্কৃতি। এর ব্যত্যয় হলেই মুশকিল।

অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলছেন, এই বিষয়টা আস্তে আস্তে এই অঞ্চলের প্রশাসনে রয়ে গেছে।

যেসব কারণে এই সংস্কৃতি রয়ে যাচ্ছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান মনে করছেন এর বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

‘ধরুন আমার গবেষণার সময় আমি যেটা দেখেছি, একটি উপজেলায় যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রকল্প, তার অর্থ, কাগজে সই এরকম গুরুত্বপূর্ণ কাজের এক্সেকিউটিভ অথরিটি রয়েছে একজন ইউএনওর কাছে। ফলে আপনি যখন অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রকল্প বন্ধ করে দিতে পারেন, তখন সেই ক্ষমতার কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যায় এমনকি স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও আর সাধারণ জনগণ তো কিছুই না। সরকারি কর্মকর্তারা এই ক্ষমতার জায়গাটা উপভোগ করেন এবং সেটা তারা ছাড়তে চাইবেন না সেটাই স্বাভাবিক।’

তিনি বলছেন, স্যার শব্দটি একটি আস্ত বাক্য হয়ে উঠেছে প্রশাসনে।

‘‘বড় কর্মকর্তারা যখন কোনো আদেশ দেন তার জবাবে অধস্তনরা বলেন ‘স্যার’। হ্যাঁ কিংবা না নয়, শুধু এই একটি শব্দ। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কী কাজটা করেছেন, কেমন আছেন, তারও উত্তর ‘স্যার’। কোনো কিছুর হ্যাঁ সূচক উত্তরই হল স্যার।’’

‘এটা সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণে পড়ানো হয় না। কিন্তু পরম্পরায় চলে এসেছে। স্যার শব্দে সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মপ্রত্যয় বেড়ে যায়। যখন সাধারণ জনগণ তাদের এভাবে দেখে তখন তার মনে হবে স্যার বলা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই।’

অধ্যাপক আমিনুজ্জামান মনে করেন, প্রশাসনের ভেতরেই একে অপরের প্রতি আচরণবিধিতে আগে পরিবর্তন দরকার।

তিনি আরো মনে করেন শ্রেণীভিত্তিক একটি বিষয় রয়েছে এর সাথে।

‘আগে উচ্চবিত্ত, সরকারি কর্মকর্তার ছেলেমেয়েরা প্রশাসনে যেত। কিন্তু যে পরিবর্তনটা হয়েছে, যেকোনো শ্রেণির ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষ শেষ হওয়ার আগে বিসিএসের জন্য পড়া শুরু করে। তারা অনেকেই খুব মেধাবী নন, তাদের আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে থাকে, তবে তারা পরিশ্রমী। যে কখনোই ক্ষমতার উৎসে ছিল না, দক্ষতায় নয় মুখস্থ বিদ্যায় যখন কেউ সরকারি কর্মকর্তা হয় তখন ক্ষমতা তার কাছে নতুন বিষয়।’

তিনি আরো বলছেন, প্রশিক্ষণের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক এ ধারণাটি মাথায় গেঁথে দেয়া হয় না।

রাজনৈতিকভাবে তারা ব্যবহৃত হন বলে তারাও পাল্টা সুবিধা নেন। যে কারণে তাদের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে সেটির অপব্যবহার করেন।

রাজনৈতিকভাবে তাদের ব্যবহার বন্ধ না করা হলে তারা জনগণের উপরে এমন মানসিকতা পরিবর্তন হবে না।

তবে ইদানীং কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক আমিনুজ্জামান।

সময় কি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে?

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে বলেছেন, ‘স্যার ও ম্যাডাম শব্দগুলোতো আসলে খারাপ কোনো শব্দ নয়। কিন্তু এগুলোর ব্যবহার চাকুরিবিধিতে নেই।’

তিনি বলছেন, প্রশাসনে এখনকার প্রজন্ম অনেকটাই বদলে গেছে। তার মতে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর তার একটি ভাল চিত্র ফুটে উঠেছে।

‘এই যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা দিন নেই, রাত নেই মানুষের বাড়ি বাড়ি সাহায্য নিয়ে যাচ্ছে। সশরীরে উপস্থিত হয়ে অসুস্থদের সহায়তা, দাফনে সহায়তা এতে বোঝা যায় যে তারা এখন অনেক প্রফেশনাল।’

তিনি বলছেন, ‘যারা নতুন করে প্রশাসনে যোগ দেন, তাদের বুনিয়াদি কোর্স দীর্ঘ করা হয়েছে। সেখানে আচরণবিধি, মানবিক আচরণ, এথিকস এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চাকুরি চলাকালীনও নানা রকম কোর্স চলতে থাকে।’

ফেসবুকে আলোচনা
প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বক্তব্য নিয়ে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকেই তা শেয়ার করছেন এবং মন্তব্য করেছেন।

যেমন শওকত আলী নামে একজন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘স্যার না বলে ভাই বলেছিলাম, আর ভূমি অফিসার দিল মামলা। সে বলে আমি তোমার কোন জনমের ভাই।’

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে জায়েদ আরমান লিখেছেন, ‘এগুলো আমজনতা জানে, আপনারা জানেন না। সরকারি চাকুরিজীবী মানে জনগণের সেবক, অথচ স্যার না বললে রাগ করে। যাদের স্যার না বললে রাগ হয় তাদের সমস্যা আছে।’

ফাহসিন উদ্দিন চৌধুরী লিখেছেন, ‘একমাত্র ছাত্র ও শিক্ষক ছাড়া আর কাউকে অফিস আদালতে বা অন্যত্র সবখানে সবাইকে স্যার বলার রীতি তুলে ফেলা উচিৎ বলে মনে করি।’

ইয়াসির আরাফাত লিখেছেন, ‘স্যার-ম্যাডাম’ বলেই কাজ করানো যায় না, এখন তো আর অফিসের ভিতরে আসতেই দেবে না।

যেভাবে এলো এই সংস্কৃতি

একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকালে।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন অবশ্য বলছেন, ঊর্ধ্বতন কাউকে সম্বোধনের প্রচলন আরো অনেক আগে।

তবে তার মতে সেগুলো ছিল সম্মানসূচক, কখনো উপাধি।

তিনি বলছেন, ‘‘আমাদের সংস্কৃতির মধ্যেই বিষয়টা সবসময় ছিল, সেটা মধ্যযুগ হোক বা মুঘল আমল হোক। যেমন ধরুন জাঁহাপনা, রাজা বাদশাহদের এভাবে সম্বোধন করা হতো। ব্রিটিশ আমলে যখন তাদের ভাষা চালু হল, তখন অন্যান্য সম্বোধনগুলো হারিয়ে হয়ে গেল স্যার। সেই জিনিসটাই এখন হয়েছে ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার’, ‘মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়’, ‘ভিসি মহোদয়’ ইত্যাদি। এটা না বললে তারা মাইন্ড করেন।’’

ভারতে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত অশোক মিত্রের আত্মজীবনীতে উল্লেখ করা একটি উদাহরণ টেনে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন অধ্যাপক মুনতাসির মামুন।

তিনি বলছেন, অশোক মিত্র লিখেছেন যে তিনি যখন লন্ডন থেকে আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরলেন, তখন সার্ভিসের উপরের দিকে একজন বড় কর্মকর্তার সাথে তিনি দেখা করতে গিয়েছিলেন। সে ব্রিটিশ আর অশোক মিত্র নেটিভ, তাকে স্যার না বলে তার পদ ধরে সম্বোধন করেছিলেন। সেসময় তিনি খেয়াল করলেন যে তার ভুরুটা একটু কুঁচকে গেল। কারণ ভারতে তিনি ‘ইওর অনার’ বা সম্মানসূচক সম্বোধন শুনতে অভ্যস্ত।

সূত্র : বিবিসি

সর্বশেষ নিউজ