২০, এপ্রিল, ২০২১, মঙ্গলবার

সাড়ে ৫ ঘণ্টায় আয় ৩০ টাকা, চালের কেজি ৪৫!

করোনায় যখন কমেছে আয়-রোজগার তখন বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বেশি ব্যবহৃত মোটা চালের বাজার। হঠাৎ করে মোটা চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে মোটা চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে দাম। তাছাড়া ভারতীয় চাল আমদানিতে ভাটা পড়াকেও কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন তারা।
দিনাজপুর শহরের কসবা এলাকার ৫৫ বছর বয়সী রিকশাচালক আব্দুর রহমান। সোমবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে রোজগার করেছেন মাত্র ৩০ টাকা। করোনার কারণে লকডাউনে দোকান-পাট বন্ধ, রাস্তাঘাটে মানুষজনও কম। ফলে রিকশা নিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিনটাতে তেমন ভাড়া পাননি তিনি।

তাছাড়া ইজিবাইকের শহর দিনাজপুরে আজকাল মানুষজন রিকশায় খুব কমই ওঠেন। তাই তার রোজগারও কমেছে, আর সোমবারে রোজগার একেবারেই কম। অথচ চালের বাজারে এসে দেখেন চালের দাম কেজি প্রতি আরও ২ টাকা করে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি। সকাল থেকে ভাড়া মারছি মাত্র ৩০ টাকার। এমন আয়ে ৪৪-৪৫ টাকা চালের কেজি আমাকে কিনে খাইতে হইতেছে। তারপরে আবার করোনার জন্য দোকান-পাট সব বন্ধ। দোকানিরাই যদি না বিক্রি করতে পারে, মানুষে যদি বের না হতে পারে তা হলে আমার কিভাবে ভাড়া হবে? আমার একদম সংসার চলে না। দিন শেষে বাড়িয়ালি (তার স্ত্রী) বলে, ‘সারাদিন খাটি (খেটে) এই কয়টা মাত্র টাকা? এতে চলিবে? ভাতের চালে তো হবে না।’ সোজাসুজি বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে…।

এমন মোটা চালও এখন খেটে খাওয়া মানুষদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

শুধু আব্দুর রহমানই নন। তার মতো নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষজনদের জন্য মোটা চালের দাম কেজিতে দুই টাকা বাড়াও অনেক বড় দুঃসংবাদ।
দিনাজপুর বাহাদুর বাজার এলাকার চালের দোকান ঘুরে দেখা গেছে চিকন চালের দাম গত সপ্তাহের মতোই থাকলেও বেড়ে গেছে মোটা চালের দাম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুটি স্বর্ণা আর সুমন স্বর্ণা চালের দামটাই বাড়তি দিকে। যারা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত তারাই এসব গুটি স্বর্ণা আর সুমন স্বর্ণা চাল খায়। আবার বাজারে এসব চালের চাহিদাও বেশি। বাজারে গুটি স্বর্ণ, সুমন স্বর্ণ জাতের ধানের সংকট দেখা দেওয়ায় মোটা চালের দাম কেজিতে দেড় থেকে দুই টাকা বেড়ে গেছে।

আফরোজা বেগম নামে এক নারী চাল কিনতে এসে বলেন, ‘সপ্তাহে সপ্তাহে চালের দাম বাড়তেই আছে। দোকান পরিচিত থাকায় বস্তা দামে ৫ থেকে ৭ কেজি করে চাল কিনি সপ্তাহে সপ্তাহে। দুই সপ্তাহ আগে গুটি স্বর্ণা চালের দাম ছিল ২১শ’ টাকা বস্তা। গত সপ্তাহে চাইছে ২১শ’ ৬০ টাকা। আবার আজকে কিনতে এসে চাইছে ২২শ’ টাকা। কেজি পড়তেছে ৪৪ টাকা। বাজারে তো এরচেয়ে কমদামে কোনও চাল নাই। বলেন, আমাদের কী আর ভাত খাওয়ার উপায় আছে?’

এই নিম্নবিত্ত নারী বলেন, এমন ভাবে চলতে থাকলে গরিব মানুষরা চলবে কিভাবে? রমজান মাস, সেই সাথে লকডাউন। কামাই নাই রোজগার নাই মানুষের। মানুষের চলা খুব কঠিন হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে চালের দামটা কমানো খুব দরকার। সরকার কী গরিবদের দিকে তাকাবে না?

পাশে বসা এক বৃদ্ধ গজ গজ করে ওঠেন, ‘শুনছি, এই দেশে নাকি গতবছর ধানের বাম্পার ফলন হইছে। সরকারের মন্ত্রীরা এই কথা বলে খুব গর্ব করে। আর আমাদের মতো গরিব মানুষকে চাল কিনতে হয় ৫৫ টাকা কেজি দরে। দেশের প্রধানমন্ত্রী কী এগুলা দেখে না?’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোকানের পাশে দাঁড়ানো আরেক যুবক বলেন, ‘ এই দিনাজপুর শহরকে বলা হয় দেশের শস্যভাণ্ডার। মাঠের পর মাঠ এখানে ধানের ক্ষেত। ফসলের অভাব নাই। অথচ এখানেও গরিব মানুষের চালের কেজি ৪৫ টাকা। অথচ গতবছর দেশে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। রেকর্ড হয়েছে। কোথায় গেলো সেই ধান? এখন আবার আমদানি করা লাগে? তাও এত দাম চালের?’

বাহাদুরবাজার এলাকার চাল বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, মোটা চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হলো, বর্তমানে ধান নাই। আবার যা চাল আছে তা মিলার মজুত করে ওর ফায়দা লুটতেছে। আর চাল সাধারণ দোকানে এলে লাভ ধরে তো বিক্রি করতে হবেই। কয়টাকাই বা লাভ নেয় চাল বিক্রেতারা, ২০ থেকে ৩০ টাকা বস্তা প্রতি লাভ আসে। এক্ষেত্রে যারা ধান কিনছে তার আর মিলাররা যদি গুটি স্বর্ণা ধানের দাম কমে বিক্রি করে তবে সাধারণ মানুষের জন্য ভালো হয়।

এই চাল বিক্রেতার সরকারের প্রতি বাস্তব পরামর্শ, ‘সরকারকে অবশ্যই মিলারদের প্রতি নজর দেওয়া উচিত। কেননা এর আগের করোনার লকডাউনের অভাবটাই কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমরা, ফের আবার লকডাউন। খেটে খাওয়া মানুষের জন্য অবশ্যই সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।’

সর্বশেষ নিউজ