৬, জুলাই, ২০২২, বুধবার

হট কেকের মত বিক্রি হচ্ছে ভয়েস অপারেটেড বাংলাদেশি ব্র্যান্ড ‘বাংলা কার’!

পোশাক শিল্প ও কৃষি খাতের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এক সময়ের অনুন্নত এই দেশটিতেও। বর্তমানে নতুন নতুন যানবাহন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে করে বাংলাদেশও নিজেকে উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটিতে হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলা কার লিমিটেড ইতোমধ্যে গাড়িগুলো প্রস্তুত করেছে। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রকার বিপণন কার্যক্রম চালু না করেই গাড়িগুলোর একটি বড় অংশ বিক্রিও করে ফেলেছে। বলা যায়, ক্রেতা মহলে সাড়া ফেলেছে হট কেকের মত।

হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাকির হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কোটি টাকা খরচে মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ গাড়িতে একজন গ্রাহক যে সুবিধা পান ‘বাংলা কার’-এ সে সুবিধা মিলবে মাত্র ৩০ লাখ টাকায়।

করোনার প্রকোপ হ্রাসসহ সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরই দেশীয় ব্র্যান্ড ‘বাংলা গাড়ি’ রপ্তানিতে যাবে হোসেন গ্রুপ।

করোনার কারণে বাজারজাতকরণে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও চলতি বছরেই প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ডিজাইনিং টিমের সাথে ১২টি বিভিন্ন ধরণের যানবাহন বাণিজ্যিকভাবে তৈরির পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে প্রাইভেট কার, ট্রাক, বাস, লরি ট্রাক, পিকআপ ছাড়াও বিদ্যুৎচালিত গাড়িও রয়েছে।

জাকির হোসেন বলেন, আমরা দেশীয় ব্র্যান্ড, দেশীয় ডিজাইনে গাড়ি ম্যানুফ্যাচারিংয়ে যাচ্ছি। ইশুজু জাপানিজ ইঞ্জিন, চায়না বডি এবং ইন্দোনেশিয়ার চেসিস দিয়ে গাড়িগুলো তৈরি করছি। ফোটন বা মিতসুবিশি একটা বা দুটি মডেলের গাড়ি তৈরি করতে পারবে, কিন্তু বাংলা কারস সব মডেলের গাড়ি তৈরি করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, ১৫০০ থেকে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত যেটা ক্রেতার চাহিদা সেটা আমরা তৈরি করে দিতে পারব। আবার ৮ রঙের গাড়ি থাকলেও ক্রেতা যদি অন্য কোনো রঙ পছন্দ করেন, আমরা সেটাও দিতে পারব। দেশের মাটিতে দেশের তৈরি গাড়ি হলো ‘বাংলা কার’।

এটা বিদেশি গাড়ি নয়, নিজেদের নামে নিজেদের গাড়ি প্রথমবারের মতো আমরা উৎপাদন করছি। আগামী বছরের শুরু বা মাঝামাঝিতে রপ্তানিতে যাওয়ার চিন্তা করছি। প্রতিটি গাড়িতে থাকছে ৫ বছরের ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি, ব্যাক টু ব্যাক। প্রতি বছরের নতুন গাড়ি প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসেই পেয়ে যাবেন ক্রেতারা, বলেন তিনি।

জাকির হোসেন বলেন, টয়োটা জাপানি কোম্পানি, হাভেল চায়নিজ কোম্পানি কিন্তু বাংলা কার আমাদের দেশীয় কোম্পানির গাড়ি। টাটার মতো আমরাও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করব। আগামী মাসেই আমাদের আরও গাড়ি আসবে, পুরো বিশ্ব দেখবে মেইড ইন বাংলাদেশের ‘বাংলা গাড়ি।’

বাংলা কারের বৈশিষ্ট্য

– ১শরও বেশি ভয়েস কমান্ডের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ভার্চুয়াল সহকারী ব্যবস্থা এবং যে কোনো স্থান চিহ্নিত করার জন্য ২৮টি স্বতন্ত্র ভয়েস কমান্ড রয়েছে।
– থাকছে দেড় লিটার টার্বো ইঞ্জিন এবং ট্রিপ্টোনিক মুড পাওয়ার প্যাক স্বয়ংক্রিয় থেকে ম্যানুয়াল এবং ম্যানুয়েল থেকে স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সমিশনে খুব সহজে পরিবর্তন করার জন্য।
– নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের পাশাপাশি বোল্ড স্পোর্টি লুক।
– সুরক্ষার নিমিত্তে আপনার যাত্রা রেকর্ড করার জন্য আধুনিক এলইডি পার্কিং লাইট, ফগ ল্যাম্প এবং ইনফিনিট স্টারলাইট গ্রিল ডিভিআর ক্যামেরাসহ হেডলাইট।

– সেরা লেদার এবং প্রাইম গ্রেড উপকরণ দিয়ে সজ্জিত আভ্যন্তরীণ সজ্জা।
– মাল্টিমিডিয়া কনসোল নিয়ন্ত্রক দ্বারা চালিত বিনোদনের বৃহৎ এবং বর্ধিত ইন্টারফেসের জন্য ৯ ইঞ্চির ইনফোটেইনমেন্ট ডিসপ্লে।
– ব্লুটুথ সংযোগ- সহজ সংযোগের জন্য ইউএসবি এবং সহায়ক আর্মরেস্ট।
– শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বয়ংক্রিয় এসি।

– পর্যাপ্ত লেগরুমসহ ৭টি সিট।
– ড্যাশবোর্ডের স্টিয়ারিং হুইলে রাখা ৪টি এয়ারব্যাগ এবং হাঁটুর সুরক্ষার জন্য লো-মাউন্ট।
– আনন্দদায়ক শ্রবণ অভিজ্ঞতার জন্য একাধিক স্পিকার সমৃদ্ধ অডিও সিস্টেম।
– পাওয়ার আউটপুট এবং স্কিল ডেভেলপড নিউ জেনারেশনের ৬ স্পিড সিভিটি গিয়ারবক্স।

– টায়ারে বাতাসের চাপের ওপর নজর রাখার জন্য টায়ার প্রেশার মনিটরিং সিস্টেম।
– চলন্ত অবস্থায় স্মার্ট টায়ার সেন্সরগুলির সাথে ডাইনামিক ৩৬০ ডিগ্রি পার্কিং ক্যামেরা সমস্যা ছাড়াই গাড়ি পার্ক করতে সক্ষম।
– আঁকাবাঁকা বা ভাঙা রাস্তায় ব্যালেন্স রেখে তীক্ষ্ণ বাঁক নেয়ার শক্তি যোগাতে অত্যাধুনিক ট্র্যাকশন কন্ট্রোল সিস্টেম।
– ডিজিটাল এবং অ্যানালগ স্পিডোমিটার ক্রুজ কন্ট্রোল।

– বিল্ট-ইন নেভিগেশন সিস্টেম।
– ট্রাঙ্কে সুবিধাজনক অ্যাক্সেসের জন্য গাড়ির ভিতরে এবং বাইরে উভয় দিক থেকে বোতামের সাহায্যে ট্রাঙ্ক খোলার স্বয়ংক্রিয় পাওয়ার সিস্টেম।
– রেড ক্যালিপার্সের সাথে ১৮ ইঞ্চি অ্যালয় রিম্স যা আপনাকে বোতাম চেপে অথবা আপনার ভার্চুয়াল সহকারীকে ভয়েস কমান্ড দিয়ে শক্ত গ্রিপের সাথে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ক্ষমতা দেয়।

– সামনের এবং পিছনের উভয় সিট থেকে প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য ২ স্তরের প্যানোরামিক সানরুফ।
– পাঁচ বছরের ওয়্যারেন্টি এবং গ্যারান্টি।

বাংলা কার এবং বাংলাদেশে গাড়ি শিল্প:

মা এন্টারপ্রাইজ- এর মাধ্যমে ডিএফএসকে- এর গ্লোরি আই অটো সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, বাংলা কার লিমিটেড ডিএফএসকে- এর অনুমোদিত অ্যাসেম্‌ব্লার। বাংলা কার এবং ডিএফএসকে-র মধ্যে চুক্তিটি ছিল দেড় বছরের। করোনার কারণে তাদের মধ্যকার কার্যকলাপ আর সামনের দিকে এগোয়নি।

কিন্তু বাংলা কার লিমিটেড চীন, ভারত, জাপান এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশ্বব্যাপী নামী-দামী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ দেশে এনে গাড়ি তৈরি করে আসছে। গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য জাপানের ইশুজু, চীন থেকে বডিপার্টস এবং ইন্দোনেশিয়ার চেসিস নিয়ে তারা গাড়ি তৈরি করছে।

যেখানে হাভাল কোম্পানির গাড়িগুলো আসে সরাসরি চীন থেকে, টয়োটা গাড়িগুলো আমদানি হয় জাপান থেকে, সেখানে বাংলা কার তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ বাংলাদেশে।

পিএইচপি বানাচ্ছে ফোটনের গাড়ি, প্রগতি তৈরি করছে মিৎসুবিশির গাড়ি, আর বাংলা কার লিমিটেড তৈরি করছে বাংলাদেশেরই গাড়ি। কিন্তু ফোটন বা মিৎসুবিশির মত দুয়েকটা মডেল নয়, তারা যে কোনো মডেলের গাড়িই তৈরি করতে সক্ষম।

ঢাকার ১৮১-১৮২ তেজগাঁও ঠিকানায় তাদের একটি শোরুম আছে। তারা সেখানে ৮টি ভিন্ন রঙের গাড়ি প্রদর্শন করছে। এগুলো হলো- রেড ওয়াইন, ইলেকট্রিক ব্লু, মিড-নাইট ব্লু, বাদামী, সাদা, সিলভার, লাল এবং কালো। এগুলো ছাড়াও তারা ক্লায়েন্টদের প্রয়োজন মত অন-ডিমান্ড রঙের গাড়ি দিতে প্রস্তুত।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এই জাতীয় একটি এসইউভি (স্পোর্টি ইউটিলিটি ভেহিকল) এর জন্য ১ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়, সেখানে এটি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ লক্ষ টাকায়। কিন্তু করোনার কথা বিবেচনায় আনা হলে, বর্তমানে কমতে থাকা আয়ের মানুষদের পক্ষে ঐ দামেও গাড়ি কেনার ব্যাপারটা কতটুকু অনুকূল হবে তা বলাই বাহুল্য। ইতোমধ্যে গাড়ি ক্রেতাদের মাঝে যে গুঞ্জন উঠে আসছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, দেশীয় গাড়িকে ক্রয়যোগ্য করে তুলতে হলে আরো বেশী বাজেট বান্ধব হওয়া জরুরী।

বাংলা কার-এর ভবিষ্যত:

বাংলা কার-এর সামনের দিনগুলো নিয়ে হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাকির হোসেন খুবই আশাবাদী। ঈদের পর বাংলা কার লিমিটেড তাদের নিজস্ব ডিজাইন দিয়ে গাড়ি তৈরি করবে। নারায়ণগঞ্জের কারখানা থেকে তৈরি করা হবে ১২ ধরণের গাড়ি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক, লরি, পিকআপ ইত্যাদি।

প্রথম পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের প্রত্যেকটিতে শোরুম চালু হবে। তদুপরি, গাড়ি নির্মাতা সংস্থা সারা দেশে আরও ৩০টি শোরুম চালু করতে যাচ্ছে।

প্রতিটি গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে, উৎপাদন সংক্রান্ত সমস্ত কার্য সম্পাদিত হবে ঘরোয়া ব্র্যান্ড এবং ডিজাইনের কথা মাথায় রেখে। অতঃপর, বাংলা কার লিমিটেড গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ১৫০০ থেকে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে। সবকিছু যদি পরিকল্পনা মাফিক চলে, তবে তারা আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে গাড়ি রপ্তানি করতে সক্ষম হবে। এমনকি টয়োটার মতো দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি করার ব্যাপারেও তারা যথেষ্ঠ আশাবাদী।

এখন গাড়িগুলোর পরীক্ষামূলকভাবে প্রোডাকশন চলছে। শীঘ্রই বাণিজ্যিকভাবে আরও গাড়ি নামাতে পারবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন। এভাবে তারা বাংলাদেশের তৈরি গাড়িগুলোকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হবে।

উপরন্তু, আগামী বছর তারা চালু করতে চলেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। সেই সূত্রে, বিশ্ব জুড়ে অটোমোবাইল শিল্পে বাংলাদেশের নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হবে।

বাংলা কার ব্যবহারকারীরা গাড়ি সংক্রান্ত সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাবেন বাংলাদেশ থেকেই। গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ হাজার গাড়ি বাজারজাত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এভাবে নিশ্চিতভাবেই বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ তারা সব ধরণের যানবাহনকে রাস্তায় নামাতে পারবে। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বাংলা কার-এর তাৎপর্যপূর্ণ অবদান থাকবে।

এখন শুধু দেখার বিষয়, বাংলা কার কতটুকু পরিবেশবান্ধব হবে! তাছাড়া ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকা মহামারী অবস্থায় ভবিষ্যতে গাড়িটি ক্রেতাদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে!

শেষ কথা

পোশাক শিল্পের মতো বাংলাদেশে তৈরি বাংলা কার একটি বড় অর্জন হতে চলেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশিরা সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হবে। গাড়িটিতে সমস্ত হাই টেক সেবা থাকায় এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত হবে। অতঃপর জনসাধারণের আর্থিক উত্তরণে বাংলা কার নিঃসন্দেহে একটি সফল বাজার পেতে পারে। ইউএনবি।

সর্বশেষ নিউজ