২৩, সেপ্টেম্বর, ২০২১, বৃহস্পতিবার

৯০০ টাকার চাকরি থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ

মসজিদে ইমামতির মাধ্যমে মাওলানা রাগীব আহসানের কর্মজীবন শুরু। তবে এখানে বেশি দিন থাকেননি তিনি। পরে ঢাকার একটি এমএলএম কোম্পানিতে ৯০০ টাকা বেতনে চাকরি নেন। এরপরেই গড়ে তোলেন ‘এহসান গ্রুপ’।

এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকার ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও মসজিদের ইমামদের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেন। তিনি ‘শরিয়ত সম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগের’ বিষয়টি ব্যাপক প্রচারণা করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতেন। এছাড়াও ওয়াজ মাহফিলের নামে ব্যবসায়িক প্রচারণাও চালাতেন রাগীব আহসান।

লাখ টাকার বিনিয়োগে মাসিক মাত্রাতিরিক্ত টাকা প্রাপ্তির প্রলোভন দেখিয়ে ধীরে ধীরে গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তবে র‌্যাব বলছে, ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন রাগীব আহসান।

এর আগে শুক্রবার ভোররাতে র‌্যাব-১০ এর একটি দল রাজধানীর শাহবাগ এলাকার তোপখানা থেকে রাগীব ও তার সহযোগী আবুল বাশার খানকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভাউচার বই ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

এর আগে গত রোববার রাজধানীতে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন রাগীবের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা। সে সময় তারা বলেন, লক্ষাধিক গ্রাহক তার মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রতারিত হয়েছেন।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, রাগীব আহসান হাউসিং, ল্যান্ড প্রজেক্ট, ব্যবসায়িক দোকান, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নামে গ্রাহকদের প্রলোভন দিতেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন রাগীব।

কে এই রাগীব আহসান

গ্রেপ্তার রাগীব আহসান ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় অধ্যায়ন শুরু করেন। পরবর্তীতে সে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি সম্পন্ন করেন। এরপর সে পিরোজপুরে একটি মাদ্রাসায় চাকরি শুরু করেন।

রাগীব আহসানের প্রতারণার শুরু

২০০৬-২০০৭ সালে ইমামতির পাশাপাশি ‘এহসান এস মাল্টিপারপাস’ নামে একটি এমএলএম কোম্পানিতে ৯০০ টাকা বেতনের চাকরি করতেন। ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে ‘এমএলএম’ কোম্পানির প্রতারণার বিষয়টি রপ্ত করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে ‘এহসান রিয়েল এস্টেট’ নামে একটি এমএলএম কোম্পানি করেন। ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিকে অপব্যবহার করে ‘এমএলএম কোম্পানির’ ফাঁদ তৈরি করেন রাগীব।

র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, গ্রেপ্তার রাগীব দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ব্যক্তি, মসজিদের ইমাম ও অন্যান্যদের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেন। তিনি ‘শরিয়তসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগ’ এর বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। তাছাড়া ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে ব্যবসায়িক প্রচার-প্রচারণা চালাতেন। লাখ টাকার বিনিয়োগে প্রতি মাসে বিনিয়োগকারীদের মাত্রাতিরিক্ত লাভের প্রলোভন দেখাতেন। ২০০৮ সালে দশ হাজার গ্রাহককে তার কোম্পানিতে যুক্ত করেন। এখন গ্রাহকের সংখ্যা লক্ষাধিক বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এলিট ফোর্সের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারক রাগীবের তিন শতাধিক কর্মচারী রয়েছে। যাদের কোনো ধরণের বেতন দেয়া হতো না। তারাই মাঠ পর্যায় থেকে বিনিয়োগকারী সংগ্রহ করে দিত। এতে ২০ শতাংশ লভাংশের প্রলোভন দেখাতো। এভাবেই রাগীবের দ্রুত গ্রাহক বাড়তে থাকে। তবে বর্তমানে তিনি তার কর্মচারী, গ্রাহক সবাইকেই প্রতারিত করেছেন।

রাগীবের ১৭ প্রতিষ্ঠান

রাগীব আহসান প্রতারণার মাধ্যমে ১৭টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সেগুলো হলো- এহসান গ্রুপ বাংলাদেশ, এহসান পিরোজপুর বাংলাদেশ (পাবলিক) লিমিটেড, এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমেটেড, নূর-ই মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, জামিয়া আরাবিয়া নূরজাহান মহিলা মাদ্রাসা, হোটেল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক), আল্লাহর দান বস্ত্রালয়, পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, এহসান মাল্টিপারপাস কো অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, মেসার্স মক্কা এন্টারপ্রাইজ, এহ্সান মাইক অ্যান্ড সাউন্ড সিস্টেম, এহসান ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, ইসলাম নিবাস প্রজেক্ট, এহসান পিরোজপুর হাসপাতাল, এহ্সান পিরোজপুর গবেষণাগার ও এহসান পিরোজপুর বৃদ্ধাশ্রম।

ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের নামে তিনি অর্থ সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে সম্পত্তি ও জায়গা জমি কিনেছেন। এছাড়া তার পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করেন। শ্বশুরকে প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতি, বাবাকে প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা, ভগ্নিপতিকে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার করেছিলেন প্রতারক রাগীব।

১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের স্বীকারোক্তি

রাগীব আহসান গ্রাহকের টাকা দিয়ে হাউজিং, ল্যান্ড প্রজেক্ট, মার্কেট-দোকান, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এছাড়া রাগীব আহসান সাধারণ গ্রাহককে চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারিত করেছেন। অনেকে পাওনা টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। অনেকেই ভয়ভীতি, লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হতেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছে।

সর্বশেষ নিউজ