২৫, জানুয়ারী, ২০২১, সোমবার

কেমন ছিলো এই দিনের সেই দিনটি

পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব প্রকাশের দিন আজ। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলার মুক্ত আকাশে মুক্তির নিশান উড়ানোর দিন আজ। শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা আর বাংলার লাখো মানুষের আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে ছিনিয়ে আনা একটি রাঙা প্রভাতের দিন আজ। আজ বাংলার বুকে লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা পতপত করে উড়ার দিন। আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। আজ দেশের ১৬ কোটি মানুষের গর্ব আর উল্লাসের দিন আজ।

কিন্তু কিভাবে এসেছিল জাতির জীবনে এ মাহেন্দ্রক্ষণ। বিজয় অর্জনের ৪৯ বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা প্রতিবছর এই দিনে পাকিস্তানের নতজানু হওয়া আর আত্মসমর্পণের সেই দৃশ্য বুক টান করে স্বগর্বে স্মরণ করি। স্মরণ করি, জাতির সেইসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যারা মায়ের স্নেহের আঁচল থেকে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলা মায়ের মুক্তির সংগ্রামে। যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার সবুজ জমিন।

কেমন ছিল মুক্তির এই দিনের সেই দিনটি। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত অভিনেতা, আবৃত্তিকার এবং সৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমামের ভাষ্য- ‘১৬ ডিসেম্বরের আগেই খবর পেয়েছিলাম, পাক হানাদাররা সারেন্ডার করবে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সব কার্যক্রম পরিচালিত হতো কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের একটি বাড়ি থেকে। বাড়িটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয়। অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, ওসমানী সাহেব, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারসহ অনেকের দফতর ছিল সেই বাড়িটি। সেই বাড়িটি থেকেই পরিচালিত হয়েছিল ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামের রণকৌশল। ১৫ ডিসেম্বর কোনও এক কাজে ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। এ কে খন্দকার আমাকে ডেকে বললেন- ‘কালকে বিকেলে সারেন্ডার হবে। আপনি যাবেন?’ ‍কথাটা শোনার পর চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি সেদিন। যদিও শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আসা হয়নি। তবে কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে সবাই এক হয়েছিলাম। সেখানে লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করে সবাই একসঙ্গে গান করেছিলাম। গোটা কলকাতার মানুষ বাংলাদেশের বিজয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল সেদিন। সেদিনের স্মৃতি কখনও ভুলার নয়। সেদিন রাতে কলকাতার ‘কোয়ালিটি রেস্টুরেন্টে আমি আমার স্ত্রীকে (লায়লা হাসান) নিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছিলাম।’

হানাদারদের আত্মসমর্পণের দিনটিতে কেমন ছিল ঢাকার পরিবেশ। আজকালকার মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা তথ্য-প্রযুক্তির এত সুবিধা না থাকলেও নয় মাসের প্রতিটি দিনই গোটা দেশের চোখ থাকতো ঢাকার দিকে। মানুষ জেনে গিয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করবে পাকিস্তান। এ খবর শোনার পর ঝলসে যাওয়া এই ঢাকার বুকে সেদিন দুপুর থেকেই মানুষের বাঁধভাঙা ঢল নামতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরাও আসতে শুরু করেছিলেন। সাধারণ মানুষ তাদের বুকে টেনে নিচ্ছিলেন।

তবে আত্মসমর্পণের ঠিক আগ মুহূর্তে রাস্তায় নেমে আসা নিরীহ বাঙালির ওপর নির্মমভাবে গুলি চালায় পাকিস্তানিরা। রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের সেদিন পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল পাক হায়েনারা। তারপরও বিজয়ের উল্লাসে মানুষ সেদিন একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিল।

১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই পাক সেনাদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া চলছিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে দিশেহারা পাক সেনারা সেদিন আত্মসমর্পণের অপেক্ষায় প্রহর গুণছিল।

উইটনেস টু সারেন্ডার বইয়ে সিদ্দিক সালিক লিখছেন, মেজর জেনারেল নাগরা একটা বিষয়ে খুবই চিন্তিত যে ভারতীয় বাহিনী প্রধান জেনারেল মানেক’শ রেডিও মারফত জেনারেল নিয়াজীকে তার সম্পূর্ণ বাহিনীসহ ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, এরপরও যদি আমার আবেদন মোতাবেক আপনি পুরো বাহিনীসহ ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে আমার মিত্রবাহিনীকে জলে, স্থলে ও আকাশে পূর্ণোদ্যমে ঢাকার বুকে আঘাত হানার জন্য নির্দেশ দিতে আমি বাধ্য হব। তিনি এই আহ্বান উর্দু ও ইংরেজিতে প্রচারপত্র আকারে বিমানযোগে বাংলাদেশে বিতরণ করেন। মেজর জেনারেল নাগরা মিরপুর ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে বার বার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন। ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা। এর মধ্যে ব্রিগেডিয়ার ক্লার কাছে খবর এলো জেনারেল নিয়াজী বিভিন্ন সেক্টরে ও ঘাঁটিতে সকাল ৬টা থেকে যুদ্ধ বন্ধ করার বার্তা পাঠাচ্ছেন। সেই বার্তা ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে। আশাপ্রদ এ খবরের পর মেজর জেনারেল নাগরা, কাদেরীয়া বাহিনী প্রধান কাদের সিদ্দিকী, হরদেব সিং ক্লার ও সস্তু সিং শলাপরামর্শ করতে বসলেন। ঠিক হলো এই মুহূর্তেই জেনারেল নিয়াজীর কাছে মিত্রবাহিনীর তরফ থেকে চিঠি দিয়ে দূত পাঠাতে হবে। মেজর জেনারেল নাগরা ছোট্ট কাগজে জেনারেল নিয়াজীকে একটি বার্তা লিখে কমান্ডো ব্যাটালিয়নের দু’জন অফিসারকে দিয়ে জিপে একটি সাদা পতাকা লাগিয়ে জেনারেল নিয়াজীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বার্তাতে লেখা ছিল- ‘প্রিয় নিয়াজী আমার পুরো বাহিনীসহ আমি মিরপুর ব্রিজের ওপর। আপনি জানেন, ঘটনার পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরামর্শ হচ্ছে এখন আপনি আপনার পুরো বাহিনীসহ আমার কাছে আত্মসমর্পণ করুন। সেক্ষেত্রে আমরা আপনারদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেবো। শিগগিরই আপনাদের প্রতিনিধি পাঠান, নাগরা।

মেজর জেনারেল নাগরা জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিন চার বছর আগে মেজর জেনারেল নাগরা যখন ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসে মিলিটারি এ্যাটাচি, তখন থেকে জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে তার পরিচয়।

সাদা ফ্ল্যাগ উড়িয়ে জিপটা যখন ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারে প্রবেশ করল, বাইরে কর্তব্যরত পাকিস্তানী সৈন্যরা অবাক বিস্ময়ে ভারতীয় জিপটার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ঘড়িতে সকাল ৯টা। হেডকোয়ার্টারে বসে আছেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে পরিচিত ‘টাইগার’ জেনারেল নিয়াজী, মেজর জেনারেল জামসেদ, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং নৌবাহিনী প্রধান রিয়াল অ্যাডমিরাল শরিফ। দু’জন অফিসার জেনারেল নিয়াজীকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে চিঠি তার হাতে দিলেন। চিঠি পড়ে জেনারেল নিয়াজীর মুখ মুহূর্তেই ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল। চিঠিটা সেখানে উপস্থিত সকলে পড়ে শলাপরামর্শ করে ঠিক করলেন যে মিত্রবাহিনী যখন আমাদের একেবারেই দ্বারপ্রান্তে এবং এদের প্রতিরোধ করার মতো আমাদের যথেষ্ট রিজার্ভ বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র নেই, তখন নাগরা যা বলছে তা করাই শ্রেয়।

এর পরের ঘটনা সম্পর্কে একাত্তর পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, সকাল ৮টায় ঢাকা শহরের প্রান্তসীমায় ছোট মিরপুর সড়কের হেমায়তপুর সেতুর মেজর জেনারেল নাগরা এক টুকরো কাগজ জিপের বনেটে রেখে শত্রু পক্ষের কমান্ডার আমির আব্দুল্লাহ নিয়াজীকে যৌথবাহিনীর পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণের জন্য লিখেছেন- প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমরা এসে গেছি। তোমার সব ভেল্কি খতম হয়ে গিয়েছে। আমরা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছি। বুদ্ধিমানের মতো আত্মসমর্পণ কর। না হলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য। আমরা কথা দিচ্ছি, আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে। তোমাকে বিশেষভাবে লিখছি, আত্মসমর্পণ করলে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া হবে। তোমারই মেজর জেনারেল নাগরা। ১৬/১২/১৯৭১, ৮টা ৩০ মিনিট।

নৌবাহিনীর চার সদস্য, তিনজন মিত্রসেনা ও একজন মুক্তিযোদ্ধা নাগরার লেখা এই বার্তা নিয়ে সাদা পতাকা না থাকায় একটি সাদা জামা উড়িয়ে শত্রু অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর দিকে দুটি জিপে ছুটে চলল। আত্মসমর্পণের বার্তা নিয়ে চার সাহসী যোদ্ধা চলে যাওয়ার পর আমরা আমিনবাজার স্কুলের পাশের পুলের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলাম। কিন্তু হরিষে বিষাদের ঘটনা ঘটল। দূত পাঠানোর এক ঘণ্টা পর ঠিক সাড়ে ৯টায় মিরপুর সেতুর দিক থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসা গাড়ির গর্জন শোনা গেল। দ্রুত ধেয়ে আসা গাড়ির গর্জনে আমাদের সৈনিকরা উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল। পরক্ষণেই মাটি কাঁপিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ ভেসে এল। চার পাঁচটা মেশিন গান একসঙ্গে বিকট শব্দে গর্জে উঠে থেমে গেল। চকিতে ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর আবার নীরবতা। ছুটে আসা গাড়ির ওপর গুলি ছুড়তেই দ্রুত অগ্রসরমান দুটি গাড়িই নিশ্চল হয়ে গেল। কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমাদেরও ভুল ভাঙল। গাড়ি দুটো শত্রুর নয়। আমাদের পাঠানো গাড়িই ফিরে আসছিল। কিন্তু গাড়ির ওপর কোন সাদা পতাকা কিংবা কাপড় না থাকায় শত্রুরা ধেয়ে আসছে ভেবে অগ্রবর্তী দলের সৈন্যরা গুলি ছুড়েছে।

প্রতিনিধি দলটি নিয়াজীর কাছে নাগরার চিঠি পৌঁছে দিলে নিয়াজী আত্মসমর্পণে রাজি আছে বলে জানিয়ে দেয়। সামনে রক্তক্ষয়ী বিরাট যুদ্ধ আর হচ্ছে না এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে জেনে আনন্দে প্রতিনিধি দল নিজেদের সেনাপতির কাছে এই দারুণ সুখবরটি পৌঁছে দিতে হাওয়ার বেগে ছুটে চলে আসছিল। ফেরার পথে আনন্দ-উদ্বেল আবেশে আনমনা হয়ে গাড়িতে লটকানো সাদা পতাকাটি কখন যে প্রচন্ড বাতাসে উড়ে গেছে তা তারা জানতেই পারেনি। তাই এই বিরাট বিভ্রাট। ভুল যখন ভাঙল- তখন যা হওয়ার হয়ে গেছে। তিনজন সঙ্গে সঙ্গে নিহত।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা ঘটনাস্থল আমীনবাজার স্কুলের পাশে দৌড়ে গিয়ে দেখলাম দুটি জিপই বিকল হয়ে গেছে। একটিতে তিনজনের মৃতদেহ। রক্তে সমস্ত জীপটা ভেসে গেছে। তখনও তাদের দেহ থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। এত বেদনার মধ্যেও অন্যজন স্টিয়ারিং ধরে বসেছিলেন। দারুণ সুখবরটা যত তাড়াতাড়ি দিতে পারবেন তত তাড়াতাড়িই যেন সহযোদ্ধা হারানোর দুঃখ ও গুলিতে আহত হওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণার উপশম হবে। আহত অবস্থায় গলার স্বর জড়িয়ে আসা সত্ত্বেও যতদূর সম্ভব স্পষ্টভাবে প্রত্যয় মেশানো কণ্ঠে বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল ‘শত্রুরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে। তাদের দিক থেকে এখনই কোন জেনারেল আত্মসমর্পণের প্রথম পর্ব সারতে আসছেন।’ কাদের সিদ্দিকী সেই সৈনিকের স্মৃতিচারণ করে বলেন, যে মিত্র সেনা এই সংবাদ দিলেন তার হাঁটুর নিচের অংশ বুলেটবিদ্ধ হয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। কাদের সিদ্দিকী সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন এর কয়েক মিনিট পরেই আত্মসমর্পণের প্রথম সামরিক পর্ব সারতে ঢাকার দিক থেকে একটি মার্সিডিজ বেনজ ও দুটি জিপে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর একজন মেজর জেনারেল, দু’জন লে. কর্নেল, একজন মেজর, দু’জন ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন সিপাই আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিক পর্ব সারতে এলো।

পাকিস্তান হানাদারদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীর সিএএফ প্রধান মেজর জেনারেল জামশেদ আত্মসমর্পণের প্রথম পর্ব সারতে এসেছে। আমরা যথারীতি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালাম। মেজর জেনারেল নাগরার বামে ব্রিগেডিয়ার সানসিং, তার বামে ব্রিগেডিয়ার ক্লে ও সর্বশেষে আমি কাদের সিদ্দিকী। মেজর জেনারেল জামশেদ যৌথবাহিনীর সেনানায়কদের সামনে দাঁড়িয়ে সামরিক কায়দায় অভিবাদন করার পর নাগরার সামনে এসে কোমর থেকে রিভলবার বের করে প্রসারিত দু’হাতে নাগরার সামনে বাড়িয়ে দিল। মেজর জেনারেল নাগরা ছ’টি বুলেট খুলে রেখে রিভলবারটি আবার জামশেদের কাছে ফেরত দিলেন।

এর পর সকাল ১০টা ১০ মিনিটে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাপতি লে. জেনারেল নিয়াজী তার অফিস ঘরে এল। অফিস ঘরে ঢুকে তার চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বিজয়ী সেনাপতিদের সামরিক অভিবাদন জানাল। আত্মসমর্পণ করার জন্য মেজর জেনারেল নাগরা প্রথমে নিয়াজীকে ধন্যবাদ জানালেন এবং তাকে বুদ্ধিমান সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করে ভূয়সী প্রশংসা করছেন। তারপর নিয়াজীর ছেলেমেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন। পারিবারিক কথা শেষ করে মেজর জেনারেল নাগরা নিয়াজীর সঙ্গে তার সাথীদের পরিচয় করিয়ে দেন। এসময় কাদের সিদ্দিকী নামটা শুনে নিয়াজী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামরিক অভিবাদন করলো এবং হাত বাড়িয়ে দিলো। কাদের সিদ্দিকী সেই দুর্লভ ও কঠিন মুহূর্তটির স্মৃতিচারণ করে বলছেন, ‘নিয়াজী হাত বাড়িয়ে দিলেও আমার দিক থেকে কোনও সাড়া ছিল না। মুহূর্তে আমার কপাল এবং হাতে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। আমার মনে হচ্ছিল, লাখ লাখ বাঙালির হত্যাকারী পাপিষ্ঠের সঙ্গে হাত মেলাবো কোন অধিকারে?’

রমনা রেসকোর্স ময়দানে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণপর্ব সম্পন্ন হবে। রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানের প্রস্তাবে নিয়াজী প্রথমে আপত্তি তুলল, কিন্তু তার আপত্তি শোনা হলো না। রেসকোর্স ময়দানেই আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করতে হবে। কারণ ওখান থেকেই বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নিয়াজীর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। পরাজিতকে বিজয়ীর শর্ত মানতেই হয়। নিয়াজীকেও মানতে হলো। নিয়াজীর দফতর থেকে যৌথ বাহিনীর হাইকমান্ডের কাছে সব খবর পাঠানো হলো।

পাক হানাদারদের আত্মসমর্পণের খবর সেদিন পুরো ঢাকায় বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়েছিল। রেডিও, টিভি সব বন্ধ ছিল। তবুও খবর জানতে ঢাকাবাসীর দেরি হলো না। ঢাকার শতকরা আশিভাগ লোকই ঢাকার বাইরে থাকলেও যারা ঢাকায় ছিলেন তারা ঘর ছেড়ে পথে নেমেছিলেন। বারবার বাংলার আকাশে ঢাকাবাসী বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলছিল- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে।

১৬ ডিসেম্বরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মফিদুল হক লিখছেন- ওই দিন দুপুর ১২টা নাগাদ ঢাকায় এলো মিত্রবাহিনীর আরেক দল, সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা। নিরাপদ এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের প্রহরায় নিয়োজিত হলো ছত্রীসেনাদল। মেজর জেনারেল জ্যাকবের নেতৃত্বাধীন দলও দুপুরে ঢাকায় পৌঁছে ক্যান্টনমেন্টে শুরু করেছিল আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা। খসড়া দলিলে বাংলাদেশ বাহিনীর নাম উল্লেখ নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল পাকিস্তানীরা, কিন্তু তাদের আপত্তি ধোপে টেকেনি। স্থির হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানে প্রকাশ্য জনসমক্ষে স্বাক্ষরিত হবে আত্মসমর্পণের দলিল এবং স্বাক্ষরের পর নিয়াজী তার রেজিমেন্টের তরবারি তুলে দেবেন মিত্রবাহিনীর কমান্ডারের হাতে। নিয়াজী জানিয়েছিলেন যে তার তেমন কোনও তরবারি নেই। তাই ঠিক হয়েছিল, তরবারির বদলে তুলে দেয়া হবে নিয়াজীর ব্যক্তিগত পিস্তল।

সেদিন বিকেলে চারটি হেলিকপ্টারে মিত্রবাহিনীর সেনাপ্রধানেরা আগরতলা থেকে এসে পৌঁছান ঢাকা বিমানবন্দরে। এই দলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত সিং আরোরা ছাড়াও ছিলেন বাংলাদেশ পক্ষের প্রতিনিধি উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। আগের দিন সিলেটে ফ্রন্ট পরিদর্শনকালে জেনারেল ওসমানীর হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাকে জরুরি অবতরণ করতে হয়েছিল অজ্ঞাত এক স্থানে এবং তিনি ছিলেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

বিমানবন্দরে মিত্রবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত সিং আরোরাকে স্বাগত জানানোর জন্য হাজির ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী। জেনারেল অরোরার সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, পাকিস্তানী বাহিনীর অপমানের জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিতে। তারা সরাসরি এসে উপস্থিত হলেন আত্মসমর্পণস্থলে। ঘাসে ছাওয়া সবুজ ময়দানের ওপর দিয়ে হেঁটে চলছিলেন জেনারেল অরোরা, মাঝখানে পরাজিত পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজী, আর তাঁর পাশে দৃপ্ত পদক্ষেপে চলছেন মুক্তিবাহিনীর বীর তরুণ ক্যাপ্টেন এ কে এম হায়দার।

এ কে খন্দকার বীরউত্তম তাঁর ‘ভেতরে বাইরে’ বইয়ে লিখেছেন- ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেলে জ্যাকব আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে আলোচনার জন্য দুপুর একটার দিকে হেলিকপ্টারযোগে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকের সিদ্দিকী এবং জাতিসংঘের ঢাকা প্রতিনিধি জন কেলি তাঁকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান। ব্রিগেডিয়ার বাকের জেনারেল জ্যাকব ও কর্নেল খারাকে (ভারতীয়) নিয়ে পূর্বাঞ্চল (পাকিস্তান) বাহিনীর সদর দফতরে পৌঁছান। এয়ার কমোডর পুরুষোত্তম বিমানবন্দরে থেকে যান জেনারেল আরোরাসহ আমাদের অভ্যর্থনার আয়োজন করতে।

জেনারেল নিয়াজীর অফিসে এসে জেনারেল জ্যাকব লক্ষ্য করেন যে নিয়াজী আর জেনারেল নাগরা পাঞ্জাবী ভাষায় পরস্পরকে একটার পর একটা স্থুল আদি রসাত্মক কৌতুক উপহার দিচ্ছেন। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী, জেনারেল মোহাম্মদ জামসেদ খান, রিয়ার এডমিরাল শরিফ ও এয়ার ভাইস মার্শাল ইনাম উল হক। নিয়াজীর সঙ্গে আলোচনার আগে জ্যাকব জেনারেল জি সি নাগরাকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈনিক ঢাকায় আনার নির্দেশ দেন এবং ঢাকার নিরাপত্তা, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি যেমন, গার্ড অনার, টেবিল-চেয়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে পাঠিয়ে দেন।

এরপর দু’পক্ষের মধ্যে আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পিনপতন নীরবতার মধ্যে কর্নেল খারা আত্মসমর্পণের শর্তগুলো পড়ে শোনান এবং খসড়া কপিটি জেনারেল নিয়াজীকে দেন। পাকিস্তানীরা ধারণা করেছিলেন যে আত্মসমর্পণ নয়, যুদ্ধবিরতি হবে। আত্মসমর্পণের সংবাদ পেয়ে তারা বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। জেনারেল ফরমান আলী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের বিরোধিতা করেন, তিনি ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষে মত দেন। জেনারেল নিয়াজী দলিলটি অন্যদের দেখার জন্য দেন। কেউ কেউ কিছু পরিবর্তনের কথা বলেন। দলিলে পাকিস্তানীদের পক্ষে বেশ কিছু শর্ত ছিল, যেমন পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আচরণ করা হবে এবং সার্বিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে। এমনকি পাকিস্তানপন্থি সব বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ও দলিলে উল্লেখ ছিল, যা আগে কখনও কোন আত্মসমর্পণের দলিলে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাকিস্তানীরা আরও কিছু সময় নেয়ার পর আত্মসমর্পণের দলিলে সম্মতি দেয়।

এরপর আত্মসমর্পণের পদ্ধতি নিয়ে আলাপ শুরু হয়। জেনারেল জ্যাকব জানান, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে প্রথমে ভারত ও পাকিস্তানী বাহিনীর সম্মিলিত দল জেনারেল আরোরাকে গার্ড অব অনার প্রদান করবে। এরপর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর হবে এবং জেনারেল নিয়াজী তার অস্ত্র ও পদবির ব্যাজ খুলে জেনারেল আরোরাকে হস্তান্তর করবেন। আত্মসমর্পণের পদ্ধতির কিছু কিছু ব্যবস্থায় জেনারেল নিয়াজী গররাজি ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান তার অফিসেই হোক।

শর্তগুলোর বিষয়ে জেনারেল জ্যাকবের অনড় অবস্থানের কারণে শেষে জেনারেল নিয়াজী সবই মেনে নেন, তবে আত্মসমর্পণের পরও নিরাপত্তার জন্য তাঁর অফিসার ও সৈনিকদের ব্যক্তিগত অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখার অনুমতি চান। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সাধারণত বিজিত সেনাপতি বিজয়ী সেনাপতির সদর দফতরে গিয়ে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর দেন ও অস্ত্র সমর্পণ করেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এটির ব্যতিক্রম ঘটানো হয়। এখানে বিজয়ী সেনাপতি বিজিত সেনাপতির এলাকায় গিয়ে জনসমক্ষে অত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন।

‘ভেতরে বাইরে’ গ্রন্থে এ কে খন্দকার আরও লিখেন- হেলিকপ্টারে করে পড়ন্ত বিকেলে আমরা তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করি। অবতরণ করার সময় দেখি হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তেজগাঁও বিমানবন্দরে জেনারেল নিয়াজী, জেনারেল জ্যাকব এবং আরও কিছু পাকিস্তানী ও মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তা আমাদের অভ্যর্থনা জানান। এরপর জিপে করে আমরা রমনা রেসকোর্স ময়দানে রওনা হই। রেসকোর্সে আমি জেনারেল আরোরার সঙ্গে তার জিপে ভ্রমণ করি। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, মানুষজন উৎফুল্ল, সবার মুখে হাসি এবং প্রশান্তির ছায়া। রমনার চারপাশে মানুষের ব্যাপক ভিড়। এমন পরিস্থিতিতে ভিড় ঠেলে আমরা উপস্থিত হলাম রমনা ময়দানের সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে। অনুষ্ঠানটি ছিল অনাড়ম্বর এবং এটি অর অল্পসময়ে শেষ হয়। অনুষ্ঠানে মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল ছিল। একটি চেয়ারে জেনারেল নিয়াজী ও অন্যটিতে জেনারেল আরোরা বসলেন।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি খুব সুশৃঙ্খলভাবে হয়নি। মানুষের ভিড়ে অতিথিদের দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন ছিল। আমি, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরার এসএম নন্দ ও পূর্বাঞ্চল বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চান্দ দেওয়ান পাশাপশি দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর পাশেই ছিলেন পূর্বাঞ্চল সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল এফ আর জ্যাকব। আমি জেনারেল আরোরার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অশোক রায় আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যদিও ভিড়ের চাপে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছিলাম না।

এর পর এলো আত্মসমর্পণের দলিল। প্রথমে পাকিস্তানী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজী এবং পরে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আরোরা দলিলে স্বাক্ষর করলেন। স্বাক্ষরের জন্য নিয়াজীকে কলম এগিয়ে দেন আরোরা। প্রথমে কলমটি দিয়ে লেখা যাচ্ছিল না। আরোরা কলমটি নিয়ে ঝাড়াঝাড়ি করে পুনরায় নিয়াজীকে দেন। এ দফায় কলমটি আর অসুবিধা করেনি। স্বাক্ষর শেষ হলে উভয়ই উঠে দাঁড়ান। তারপর আত্মসমর্পণের রীতি অনুযায়ী জেনারেল নিয়াজী নিজের রিভালভারটি কাঁপা কাঁপা হাতে অত্যন্ত বিষণ্নতার সঙ্গে জেনারেল আরোরার কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর মুক্তি এবং মিত্রবাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানী সৈন্য ও কর্মকর্তাদের কর্ডন করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যান। বাংলার মাটিতে সেই থেকে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। বাঙালি জাতি নিজের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে খুঁজে পায় নিজের আত্মপরিচয়। আসে স্বাধীনতা, আসে বিজয়, আসে মুক্তি।

[তথ্যসূত্র: সংগৃহিত]

সর্বশেষ নিউজ