১৬, জানুয়ারী, ২০২১, শনিবার

২০২০ : যেমন ছিল দেশের অর্থনীতি

কয়েক ঘণ্টা পরই ক্যালেন্ডারের পাতা আর জীবনের খাতা থেকে হারিয়ে যাবে আরও একটি বছর। এরই সাথে সাথে শুরু হবে নতুন বছরের পথ চলা। তবে এর আগে এক নজরে দেখে নেয়া যাক, যেমন ছিল ২০২০ সালের দেশের অর্থনীতির হালচাল।

জিডিপিতে পতন
২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে প্রবৃদ্ধিতে পতন হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসেবে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে এই অঙ্ক আরও কম হওয়ার কথা বলে জানিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক।

রিজার্ভে রেকর্ড
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। জানা গেছে, বৈশ্বিক করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে প্রবাসীরা দেশে ফিরে এলেও আয় বাড়ছে। কারণ, বিদেশে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় অবৈধ পথে আয় আসা কমে গেছে। এ জন্য বৈধ পথে আয় বাড়ছে। আর আমদানি কমে যাওয়ায় রিজার্ভে নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এছাড়া প্রবাসী আয় বাড়াতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া শুরু করে সরকার। এরপর থেকেই প্রবাসী আয়ে গতি এসেছে। তবে করোনার পরে তাতে নতুন মাত্রা দেখা দিয়েছে।

পুঁজিবাজারে মিশ্রাবস্থা
জানুয়ারিতে বড় ধসের মধ্যদিয়ে চলতি বছর শুরু করে দেশের পুঁজিবাজার। বেশিরভাগ শেয়ারের দর তলানিতে নেমে যায়। মার্চে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শেয়ারবাজারে লেনদেনও বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৬৬ দিন পর পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হলে মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও মোটামুটি চাঙাভাব লক্ষ্য করা যায়। করোনা মহামারি শুরু হলে গত জুনে ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএস চার হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়, সেই সূচক এখন সোয়া পাঁচ হাজার পয়েন্ট ছাঁড়িয়েছে। লেনদেনও হাজার কোটি টাকার বেশি।

বেড়েছে দরিদ্র
বৈশ্বিক করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে অচলাবস্থা চলছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশও। সরকার লোকসানের বোঝা না বইতে পেরে জুলাইয়ে ২৫টি পাটকল ও ডিসেম্বরে ছয়টি চিনিকল বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া বন্ধ হয়ে গেছে বহু বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এতে অনেক লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরির আশাও ক্ষীণ। এর ফলে দিন দিন দেশের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) হিসেবে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে নতুন করে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

আমদানি-রফ্তানি
২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় কমেছে ৮ দশমিক ৫৬ শংতাশ। করোনা মহামারির কারণে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ভাগে তা আরও কমেছে। অর্থাৎ দেশের মানুষের ভোগ ব্যয় কমেছে এবং নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে ১৫ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম। এদিকে, করোনা ভাইরাসের কারণে ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত এবং বিভিন্ন কারখানা বন্ধ থাকায় এপ্রিলে মাত্র ৫২ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে তিন হাজার ৩৬৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম।

ব্যাংক খাত
করোনা ভাইরাসের কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে খোলা ছিল ব্যাংক। এসময় গ্রাহকদের সেবা দিতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ব্যাংকাররা। আক্রান্ত হয়ে মারা যান অনেক ব্যাংকার। এর ফলে প্রণোদনার বাইরে ব্যাংক খাতের অন্য ঋণ বিতরণ কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির। পাশাপাশি বন্ধ আছে সব ধরনের ঋণের কিস্তি আদায়। বাংলাদেশ ব্যাংক করোনা মহামারির কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ঋণ শ্রেণিকরণে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। পরে দুই দফায় তার মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। তবে ২০২০ সালে নতুন দু‘টি ব্যাংককে কার্যক্রম শুরুর অনুমতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটেজিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টকে অনুমোদন এবং শরিয়াহভিক্তিক ইসলমি বন্ড সুকুক ছাড়ার মাধ্যমে ব্যাংক খাতে গতি আনতে চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এছাড়া, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীর গতি, বড় প্রণোদনা ঘোষণার পর বঞ্চিত ছোট ব্যবসায়ীরা, রাজস্ব আদায়ে ধস, পোশাক খাতে অস্থিরতা সহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত করোনার এ সময়ে টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে অর্থনীতি খাতের সবাইকে। তবে এর মধ্যেও দীর্ঘ প্রতিক্ষিত পদ্মাসেতুর পুরো অবকাঠামো দৃশ্যমান সহ কয়েকটি সম্ভাবণায় নতুন বছরে আশা দেখছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। বিদায় ২০২০, স্বাগত ২০২১।

সর্বশেষ নিউজ