১৪, আগস্ট, ২০২২, রোববার

সাবধান, করোনামুক্ত মানেই ‘মুক্তি’ নয়

স্টাফ রিপোটার:

‘বিশ্বাস করতে পারবেন না। এটা এমন একটা রোগ দেখতে পাচ্ছেন না, কামড়ও দিচ্ছে না। কিন্তু মরণ কামড় দিয়ে যাচ্ছে। দু মাস হলো করোনামুক্ত হলেও মুক্তি মেলেনি’ —বলছিলেন সুমিত।

৪৪ বছর বয়সী সুমিত কখন-কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন জানেন না। কিন্তু প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। কানে আসছিল, ‘অক্সিজেন কমে যাচ্ছে’। বুকে ধরে আসছে, পাঁজর ভেঙে যাবে যেন। আর দুচোখে কেবল অন্ধকার। সুমিত বলেন, ‘যার একবার করোনা হয়েছে তাকে আর সতর্ক করতে হবে না। বেশিরভাগই মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করেছে’। তাহলে অনেক আক্রান্ত বলছেন তেমন কিছু হয় না তারা সেটা কেন বলছেন—প্রশ্নে সুমিত বলেন, ‘‘কিছু মানুষের হয়তো কেবল জ্বর হয়েছে। কিন্তু ভয়াবহ পর্যায়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কম না। শুরু থেকেই ‘তেমন কিছু না, জ্বর হবে, গরম পানি খেলে হবে’ এসব না বলে ভয় দেখানো দরকার ছিল।’’

এখন কী কী সমস্যা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব ভুলে যাই। কোথায় কী রেখেছি মনে থাকে না। ফলে কিছুদিন ধরে ভুলে যাচ্ছি এই চিন্তাটা আরও বেশি ক্ষতি করে ফেলছে, কনফিডেন্স কমে আসছে। আপনার জ্বর সেরে গেলে চলে যায়। কিন্তু করোনা যায় না থেকেই যায়।’

করোনা নিয়ে ২৭ দিন বাসায় একঘরে বন্দি ছিলেন রায়হানুল হক। তিনি এখন নিয়মিত হোম অফিস করছেন ঠিকই। কিন্তু শরীরের ব্যথা, নিঃশ্বাসে সমস্যা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে এনেছে যেটা তিনি করোনাকে ভুলতে পারছেন না। তিনি নিজেও বুঝেন না দিনের পর দিন তিনি যাকে পাচ্ছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে থাকছেন, করোনা আক্রান্তকালে তার কী কী সমস্যা হতো। সামনের মানুষ বিরক্ত হচ্ছেন কিনা সেটা যেমন বুঝতে চান না, এই বারবার বলার কারণে তারও যে সমস্যা হচ্ছে সেটাও তিনি বোঝেন না। এক পর্যায়ে তিনি মানসিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন। কিছু নিয়ম মানার পরে মানসিক সমস্যাগুলো দূর হলেও শারীরিক সমস্যা নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন।

করোনার শুরুতে ২০২০ সালের মে মাসে আক্রান্ত হন সায়েমা খাতুন। তিনি ভীষণ শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আইসিইউতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার দু-তিনবার মনে হয়েছে, আর ফিরবো না। বাচ্চাটাকে আর দেখব না। দম বন্ধ হয়ে এলে কেমন লাগে এখন আমি সেই অনুভূতি জানি।’

করোনা মুক্ত হয়ে দেড় মাসের মাথায় তিনি সুস্থ জীবনে ফেরেন ঠিকই কিন্তু তারপর থেকে শুরু হয় আরেক অসুস্থতা। সারাক্ষণ সবকিছুতে করোনা আছে মনে হয় তার। বাসাতেও সবাইকে মাস্ক পরে থাকতে বাধ্য করেন, সারাক্ষণ হাত ধোয়া, সারাক্ষণ সবকিছু ধোয়াধুয়ি করছেন। আর অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে এখন তিনি চর্মরোগে ভুগছেন, তিনবছরের শিশুটিসহ।

করোনামুক্ত হয়েছেন তারপরও আপনার কী মনে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার পুরো শরীরে করোনা দেখতে পাই। আর যখনই সেসব ভাবি তখনই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সারাক্ষণ অক্সিজেন লেভেল মাপার যন্ত্র গলায় বেঁধে রাখা হয়েছে, সেটা দিয়ে চট করে দেখে নিই আমার অক্সিজেনে সমস্যা হচ্ছে কিনা।’

গবেষণা বলছে, করোনা থেকে সেরে ওঠা এক তৃতীয়াংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ল্যানসেন্ট সাইকিয়াট্রি জার্নালে এ বিষয়ক গবেষণার ফলে উঠে এসেছে, করোনা থেকে সেরে ওঠার ছয় মাসের মধ্যে ৩৪ শতাংশ রোগীর স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যা দেখা গেছে।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, এধরনের রোগীর বা তাদের আশেপাশের মানুষের ঘুমের ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। মহামারিজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার যে ট্রমা, যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে একা থাকার সময়টাতে যেতে হয়, এরপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কেননা, অনেকেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন, মৃত্যু দেখে আসলাম। সেই অনুভূতি থেকে বেরিয়ে এসে বাঁচতে শেখার দরকার আছে।

সর্বশেষ নিউজ