৬, ডিসেম্বর, ২০২২, মঙ্গলবার

আশরাফ ইকবালের প্রবন্ধ : সাহিত্য চর্চার অন্তরায়

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার মানবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধন সম্ভাবিত হয়। সাহিত্যচর্চা করার প্রথাটা সভ্যতার একটা প্রধান অঙ্গ। – প্রমথ চৌধুরী।

বর্তমান সভ্যতা যে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই সভ্যতাই আধুনিকতার ধুয়া তুলে তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাই যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। বলাবাহুল্য সাহিত্যচর্চা হচ্ছে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ। সাহিত্যচর্চাই ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। জাতির সেই উন্নতির পথকে পণ্ড করে চণ্ডনীতি অবলম্বন করে ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠছি। কেউবা বিভিন্ন অভিনব নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছি। মোবাইলে প্রেমালাপতো নস্যি! একথাও মেনে নেয়া যায়, দিনদিন আমরা বিদেশি টিভির সিরিয়ালের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছি। খেলাধুলার পাশাপাশি মার্ক জুকারবার্গ প্রবর্তিত ফেইসবুক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়াশুনা উচ্ছন্নে যাক সে চিন্তার ধারে নেই।

প্রখ্যাত একজন মনীষী বলেছেন- If you live too long with a machine you begin to grow like it. এ কারণেই হয়ে পড়েছি আজ যান্ত্রিক। হৃদয়, মন, অনুভূতি সবই যন্ত্রের সুরে বাঁধা। যে যেটির প্রতি আসক্ত সেটি নিয়ে কালাতিপাত করছি। কেউ টিভির নেশায় পড়লে রাত-দিন টিভি আর টিভি, ফেইসবুকের নেশায় পড়লে ফেইসবুক আর ফেইসবুক, ব্লগিং এর নেশায় পড়লে ব্লগিং আর ব্লগিং। এভাবে মাদক-দ্রব্যের প্রতি আসক্তি, কম্পিউটার গেমস এসবের ফিরিস্তি লিখে শেষ করা যাবে না। তাহলে সাহিত্যচর্চার সময়টুকু কোথায় পাই! মিছে আলেয়ার পিছনে ছুটছি। দেশকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে, নিজেকে নিয়ে ভাববার একদম ফুরসৎ পাই না। এর মাঝে যারাই নেশা থেকে দূরে আছি তারাও সাহিত্যচর্চার কথা চিন্তাও করি না।

তাই মানবকল্যাণে উৎসর্গিত প্রাণ প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আলবার্ট সুইৎজার বলেছেন, With the sprite of the age I am in complete disagreement because it is filled with disdain for thinking. চিন্তার প্রতি এই বিরাগ ও বিতৃষ্ণা মানবসমাজে এক মারাত্মক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। আজ মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে অসারতা নেমে এসেছে তাই আমরা নতুন করে সাহিত্যচর্চার কথা মোটেও ভাবছি না। তবে এই না ভাবার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে ভয়। এটিই আমাদের সাহিত্যচর্চার চিন্তাকে লয় এবং ক্ষয় করে দেয়। অনেকে ভাবি আমরাতো আর কাজী নজরুল বা রবি ঠাকুর হতে পারব না, তাহলে সাহিত্যচর্চা করে লাভ কী! এই হীনমন্যতা ও ভাবনাটিই জাতি হিসেবে আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছা করলেই আমরা স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে প্রত্যেকে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। মানুষকে ঝাঁকি দেবার ক্ষমতা অল্পবিস্তর সকলেরই আছে। নেতৃত্ব, বক্তৃতা বা লেখনীর মাধ্যমে সেই ক্ষমতাটি প্রয়োগ করতে পারি। এটি কেবল আমাদের প্রবৃত্তিসাপেক্ষ।

একটি কথা বলে রাখা সংগত মনে করছি, যারা কিছু করে কমবেশি সবাইকে নিন্দার পাত্র হতে হয়ে কালেভদ্রে। তিনটি সম্মানীয় পেশার লোকদের মধ্যে চিকিৎসককে কসাই, প্রকৌশলীকে ডাকাত ও আইনজ্ঞকে মিথ্যাবাদীর তকমা লাগিয়ে দিচ্ছি। এক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের নীচু মানসিকতারই পরিচয় বহন করে।

একটি দৈনিকের স্নোগান আছে ‘বদলে যাও বদলে দাও’। আসুন আমরা নিজ থেকে প্রথমে বদলানো শুরু করি। আজ থেকেই শুরু হোক আমাদের সাহিত্যচর্চা।
ওমর খৈয়াম যথার্থই বলেছেন ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্তযৌবনা- যদি তেমন বই হয়। বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সংসারে জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেয়া’।

আর বইই পারে মনের ভিতর আপন ভুবন তৈরি করতে। ঘুণেধরা এই সমাজকে সাহিত্যচর্চায় অভ্যস্ত করতে হলে প্রথমে নিজেকেই লাইব্রেরিতে যেতে হবে। সাহিত্যিকরা বলে গেছেন, লাইব্রেরির মাধ্যমেই মানুষ অতীতকে বর্তমানের ফ্রেমে বন্দি করেছে। অতলস্পর্শী কাল সমুদ্রের উপর একখানি বই দিয়ে সে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে। লাইব্রেরি মানুষকে সহস্র পথের সন্ধান দেয়। কোন পথ নেমে গেছে মানব হৃদয়ের অতল স্পর্শে। এ পথসমূহ বাধা-বন্ধনহীন। এখানে মানুষ এক অবাধ মুক্তির আনন্দসাগরে অবগাহন করে। মানুষ নিজের মুক্তিকে এভাবেই এতটুকু জায়গার মধ্যে বেঁধে রাখে। সাহিত্য সাময়িকী, ম্যাগাজিন ও প্রচুর বই পড়ে কিছু লেখালেখির অভ্যাস গড়তে হবে। এক্ষেত্রে অনেক বাধা আসবে যেমন- সহচর, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম থেকে। সব বাধাকে উপেক্ষা করে মুক্তবুদ্ধি ও সাহিত্যচর্চা করতে হবে। তাছাড়া স্রষ্টা আমাদের দুটি জিনিস দিয়েছেন, যথা:- মস্তিষ্ক ও সময়।

মস্তিষ্ক বা মেধা : মানুষের সমস্ত দেহের মাত্র ২% হচ্ছে মস্তিষ্ক। আর এটি ঠিক না থাকলে সে মানবসমাজে বসবাস করেও মানুষের মতো জীবন যাপন করতে পারে না। আর ইচ্ছা করলেই মস্তিষ্ক বা মেধা কাজে লাগিয়ে সে অনেক কিছু করতে পারে অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে হয়ে উঠতে পারে। যেমন- জ্ঞানের দিক থেকে স্টিফেন হকিং, ধনের দিক থেকে বিল গেটস, জনের দিক থেকে ওবামা ও বলের দিক থেকে হিটলার। মানুষ মেধা দিয়েই জলে ভেসে বেড়ায়, আকাশে ওড়ে, মঙ্গল গ্রহে যায়, অন্ধকারে আলো পায়, দূর থেকে কথা বলে, দূরের জিনিস দেখতে পায়। তাছাড়া এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে পৃথিবীর যে কোনো সুন্দর জায়গা। এই মেধা দিয়েই মানুষ সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে পারে, স্বপ্ন পূরণ করতে পারে ও জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে পারে।

সময় : আমাদের জীবনটা বয়সের ফ্রেমে বাঁধা, বয়সটা সময়ের ফ্রেমে বাঁধা। সুতরাং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হচ্ছে সময়। সময় এবং নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময় তো দাঁড়িয়ে থাকে না- সে গড়িয়ে চলে মাড়িয়ে যায় এবং কালের আবর্তে হারিয়ে যায়। তাই মানুষের সময় এত কম যে একে অবজ্ঞা করা যায় না। সময় থাকলে মানুষ বেঁচে থাকে না থাকলে মারা যায়। একমাত্র সময় ছাড়া জীবনের সব কিছু টাকা দিয়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
তাই আসুন আমাদের অমূল্য সম্পদ মেধা এবং সময় থাকতে নিজের, সমাজের, জাতির ও সভ্যতার মানবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করি।

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগঠক

সর্বশেষ নিউজ