২২, সেপ্টেম্বর, ২০২৩, শুক্রবার

দল-ভোটারের আস্থা অর্জন ছাড়া ইভিএম নয়

রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন ছাড়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা উচিত হবে না। এতে আগামী সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট তিন নাগরিক।

তাদের মতে, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে কিনা-সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ তিনজন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে দুজন বলেছেন, বর্তমান ইভিএম-এ পেপার অডিট ট্রেইল (যে প্রতীকে ভোট পড়ে, তার চিহ্নযুক্ত কাগজ) নেই। অথচ ভারতে ব্যবহৃত ইভিএমে এ পদ্ধতি রয়েছে।

ইভিএমে এ পদ্ধতি যুক্তের পরামর্শ দেন তারা। অপরজন বলেছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের ইভিএম উন্নত প্রযুক্তির। সোমবার যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা এসব কথা বলেন।

এদিকে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখনো যে সময় বাকি আছে তাতে তিনশ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ইসির ইভিএম কারিগরি কমিটির সদস্য কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম।

তবে তিনি বলেন, ইভিএমে পেপার অডিট ট্রেইল যুক্ত করা হলে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। শনিবার আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

যদিও নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাননি।

আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের বিষয়ে ইসি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নির্বাচন কমিশনের কাছে যে সংখ্যক ইভিএম রয়েছে তাতে আগামী নির্বাচনে ১০০-১৩০টি আসনে ভোটগ্রহণ করা সম্ভব।

রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন ও বিদ্যমান ত্রুটি সংশোধনের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, ইভিএম-এর ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। তারাই নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার।

তাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন ছাড়া এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচনের ফলাফল বিতর্কিত হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যে ইভিএম ব্যবহার করা হয় তাতে পেপার অডিট ট্রেইল নেই।

ভারতের এ প্রযুক্তি চালু আছে। আমাদের মেশিনেও এ প্রযুক্তি যুক্ত করা যেতে পারে। এতেও মানুষের আস্থা বাড়বে। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে ইভিএম নাকি কাগজের ব্যালটে ভোট হবে সেই সিদ্ধান্ত ইসিকেই নিতে হবে।

ইভিএমে ভোটগ্রহণ হলে নির্বাচন আবারও বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের ইভিএম নিুমানের।

এতে পেপার অডিট ট্রেইল নেই। এ মেশিন কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ মেশিনের মাধ্যমে ডিজিটাল জালিয়াতি করা যায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল তাই প্রমাণ করেছে। এছাড়া অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে বলে শুনেছি। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ মেশিনে ভোট নেওয়া হলে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনে বিগত কেএম নূরুল হুদা কমিশন। প্রকল্পের বাইরে আরও দুই হাজার ৫৩৫টি ইভিএম কিনেছিল ইসি।

সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় অনেক জেলায় ইভিএমের সরঞ্জাম ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বলে ইসির কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে। যদিও এসব মেশিন সঠিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে ইসি সচিবালয় থেকে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন মনে করেন ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের ইভিএম অনেক উন্নত। তবে তিনিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের তাগিদ দেন।

ছহুল হোসাইন বলেন, ইভিএম-এ অকাজ-কুকাজ করা যায় না এবং একজন একাধিক ভোট দিতে পারেন না-এই বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবে। এ মেশিনের ওপর মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে, তিনি যাকে ভোট দিয়েছেন সেই প্রতীকে ভোট পড়েছে।

এরপরই নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহার করা হলে ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকবে না। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি নির্বাচন কমিশনার থাকাবস্থায় ভারতের নির্বাচন দেখতে গিয়েছিলাম।

তখন সেখানে কোথাও ইভিএম আবার কোথাও কাগজের ব্যালটে ভোট হয়েছিল। ওই ইভিএমের চেয়ে আমাদেরটা অনেক ভালো। এখন দরকার আস্থা অর্জন করা। মানুষের কাছে এ মেশিনের প্রচার চালানো।

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী বছরের শেষদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে পারে। এ হিসাবে মাত্র ১৫ মাস সময় রয়েছে ইসির হাতে। এ সময়ের মধ্যে বাকি ইভিএম সংগ্রহ ও জনবল প্রশিক্ষণ দিতে হবে ইসিকে।

তবে হাতে যে সময় আছে তাতে তিনশ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ইসির ইভিএম কারিগরি কমিটির সদস্য কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এখন থেকে উদ্যোগ নিলে সম্ভব। কারণ ইসির কাছে ইভিএম অর্থাৎ প্রযুক্তি রয়েছে। একই ধরনের মেশিন সংগ্রহ করা চ্যালেঞ্জিং নয়। এছাড়া ইভিএম নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। তাহলেই সচেতনতা আরও বাড়বে।

ইভিএমে পেপার অডিট ট্রেইল যুক্ত হলে কারিগরি সমস্যা দেখা দেবে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ভোটারদের গোপনীয়তা নষ্ট হতে পারে। কোনো ভোটার ব্যালট বক্সে পেপার অডিট ট্রেইলের পরিবর্তে বাহির থেকে প্রিন্ট করে আনা কাগজ ফেলে রাখলে তা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে।

এছাড়া কারিগরি সমস্যাও রয়েছে। কোনো কারণে পেপার অডিট ট্রেইল প্রিন্ট না হলে, কাগজ না থাকলে, প্রিন্টারে সমস্যা দেখা দিলে তখন নতুন ঝামেলা তৈরি হবে।- যুগান্তর

সর্বশেষ নিউজ