১৬, জুলাই, ২০২৪, মঙ্গলবার
     

চরম দুর্ভোগে সঙ্গী খাদ্য সংকট

বন্যার পানিতে ভাসছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা। এতে প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। হাট-বাজার, বাড়িঘরে ঢুকছে পানি। ডুবে রয়েছে রাস্তাঘাট। বন্যার পানি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে পড়েছে সেতু।

সংযোগ রাস্তা ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। অসহায় লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। দুর্গত লোকজনের কাছে যে খাবার ছিল তা ফুরিয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

এতে দুর্গত মানুষের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। সরকারিভাবে ত্রাণ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। খাবার পানির অভাবে ঝুঁকি নিয়েই অনেকে দূষিত পানি পান করছেন।

এতে করে পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক এলাকার নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় শৌচাগার সমস্যায় মানুষ চরম বিপাকে আছেন।

বন্যায় ভেসে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি ও পুকুর। পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষতিও বাড়ছে। সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে বানভাসি মানুষ। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে রয়েছেন লোকজন।

ভারতের বরাক নদী হয়ে উজানের ঢল বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারায় ঢুকছে। এতে সিলেটে কিছু কিছু এলাকায় পানি একটু একটু কমছে আবার কোথাও কোথাও একটু একটু বাড়ছে।

তবে তা অত্যন্ত ধীরগতিতে। বন্যার পানিতে সিলেট বিভাগের বেশ কয়েকটি সাবস্টেশন ডুবে যাওয়ায় প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহক তিন দিন ধরে বিদ্যুৎবঞ্চিত রয়েছেন।

সিলেটের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

হাকালুকির হাওড়সহ ছোট-বড় সব হাওড় ডুবে গেছে। কাজ না থাকায় দিনমজুররা চরম বিপাকে পড়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট শহরের বাইরে সুরমা নদীর ওপরের অংশ থেকে পানি কিছুটা নেমেছে। এতে ওপরের অংশে যেমন বন্যা কমেনি, তেমনি তা এসে নিচের দিকে, বিশেষ করে সিলেট শহরে চাপ সৃষ্টি করেছে।

শহরের বিভিন্ন এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে বৃষ্টির প্রবণতা নতুন করে বেড়েছে। এতে ভারতের আসামে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই পানিও নেমে আসছে ভাটির দিকে।

সবমিলে আরও অন্তত ২৪ ঘণ্টা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিুাঞ্চলের কিছু স্থানে বন্যা পরিস্থিতি একইরকম থাকতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এ তথ্য জানিয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সমতলে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি আরও অন্তত ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।

এতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদী তথা সুরমা, কুশিয়ারা, ভোগাই-কংস, ধনু-বাউলাই, মনু, খোয়াই ও মুহুরীর পানি সমতলে কয়েকটি পয়েন্টে সময়বিশেষে দ্রুত বাড়তে পারে।

বর্তমানে সুরমা তিনটি আর কুশিয়ারা দুটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপরে বইছে।

বুধবার যা ছিল ১২৭ সেন্টিমিটার। কিন্তু সিলেটে বেড়ে ৪৭ সেন্টিমিটার হয়েছে। সুনামগঞ্জেও কিছুটা পানি বেড়েছে। বৃহস্পতিবার এটি ১৯ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল, যা বুধবার ছিল ১৮ সেন্টিমিটার।

আর কুশিয়ারার পানি অমলশীদে ১৭৫ সেন্টিমিটার ওপরে আছে। একই নদী শেওলা স্টেশনে ৫৭ সেন্টিমিটার ওপরে আছে, যা বুধবার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে একদিন বিরতি দিয়ে দেশের ভেতরে ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং শেরপুর ও নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। সিলেটের লালাখালে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট : পুলিশ জানায়, সোমবার মমতাজগঞ্জ বাজারের পাশে সুরমা নদীতে নৌকা ডুবে নিখোঁজ হন ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান। তার লাশ বৃহস্পতিবার সুরমা নদীর খুলুরমাটি থেকে উদ্ধার হয়।

এদিকে বুধবার কানাইঘাটের আব্দল্লাহ হাওড়ে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। বৃহস্পতিবার ছত্রপুর গ্রামের উত্তরের হাওড়ে পেকু বিল থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়।

সিলেটের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, সিলেটে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে। তাছাড়া উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় রাজ্যে বৃষ্টি কমছে না। তাই পাহাড়ি ঢল অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী সিলেটে ঝটিকা সফরকালে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন বিদ্যুৎসেবা বঞ্চিতরা। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এরপর বিদ্যুৎ বিভাগ বৃহস্পতিবার থেকে বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যুতের সিলেট বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদের যুগান্তরকে বলেন, বিভাগের ২৩টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কয়েকটি উপকেন্দ্র পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঝুঁকির আশঙ্কায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল।

আমরা ঝুঁকি কমেছে এমন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে তৎপর রয়েছি। তবে বৃহস্পতিবার ২১টি সাবস্টেশন চালু থাকলেও দুটি সাবস্টেশন চালু করা যায়নি। সিলেট নগরীর উপশহর ও বরইকান্দি সাবস্টেশন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই দুটি স্টেশনের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, ১৭টি উপজেলায় ২ হাজার ৩৭৯ হেক্টর বোরো, ১ হাজার ৩৪২ হেক্টর আউশ বীজতলা, ১ হাজার ৫৪ হেক্টর সবজি ও ৭০ হেক্টর বাদামখেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

অপরদিকে লন্ডন সফর সংক্ষিপ্ত করে সিলেটে পৌঁছেই বৃহস্পতিবার দিনভর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণ করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সিলেট জেলা বিএনপি। এ উপলক্ষ্যে জেলা বিএনপি বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) : গোলাপগঞ্জে অসহায় মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র। শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের মেম্বার সাবুল আহমদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, কালাকোর পরক্তিপুর সেতু পানির তোড়ে ভেঙে পড়েছে।

সেতু ভেঙে ও সংযোগ রাস্তাটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম কবির বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বন্যা আক্রান্ত লোকজনের মধ্যে সরকারিভাবে ১২ মেট্রিক টন চাল ও ১৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জকিগঞ্জ (সিলেট) : বরাক নদীর পানিতে জকিগঞ্জ উপজেলায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উপজেলার প্রায় নয়টি ইউপিই বন্যাকবলিত। পুরো উপজেলায় বন্যার পানিতে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : সুনামগঞ্জের ছাতকে বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় বানভাসি মানুষ তকিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সুরমা, চেলা ও ইছামতি, পিয়াইন নদীর পানি বিভিন্ন স্থানে বিপৎসীমার ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) : পাহাড়ি ঢল ও বন্যার তোড়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ভেঙে পড়ে ছাতক-সুনামগঞ্জ সড়কের দোয়ারাবাজার উপজেলাধীন দোহালিয়া ইউনিয়নের পানাইল গ্রামের পশ্চিমাংশের সেতু। একই ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর সেতুও আংশিক ধসে গেছে।

ফলে বন্ধ হয়ে গেছে জেলা শহর সুনামগঞ্জের সঙ্গে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়ক যোগাযোগ। এছাড়া অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তাঘাটে কোমর ও বুকসমান পানি থাকায় জেলা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে ৯ ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক এবং সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : কমলগঞ্জে কেওলার হাওড় ও আদমপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে গেছে। প্রায় ৫শ হেক্টর জমির বোরো ধান ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।যুগান্তর

               

সর্বশেষ নিউজ