২৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০, সোমবার

হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত ‘নিলুয়ার বিল’

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হাজার হাজার পাখি সারাক্ষণ মুখরিত করে রেখেছে এই বিল। পাখি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছে পাখিপ্রেমীরা। বিলটির অবস্থান মানিকগঞ্জের ঘিওর-দৌলতপুর উপজেলার মাঝখানে। পাশ দিয়েই চলে গেছে আরিচা-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক। যদিও বিলটি এখন পানি অনেকটাই কমে গেছে, তবুও এর সৌন্দর্য্য কমেনি একফোঁটাও।

নিলুয়ার বিলে অতিথি পাখির আনাগোনা বেড়েছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিলটি যেন হয়ে যায় পাখির আবাসস্থল। এবারও এ বিলে বাসা বেঁধেছে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখিসহ হাজারো অতিথি পাখি। ফলে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাখিপ্রেমীরা দল বেঁধে আসছেন পাখি দেখতে।
শীতকাল এলেই এই নিলুয়ার বিল অতিথি পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে। খুব বড় না হলেও বিলটি পাখির কারণে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে।

পাখির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, উড়েচলা, নীরবে বসে থাকা- মানুষকে আকৃষ্ট করে। তাই দূরদুরান্ত থেকে লোকজন একনজর পাখি দেখার জন্য এখানে আসেন।
চলমান এ রাস্তার লোকজন গাড়ি থামিয়ে অথবা পায়ে চলার পথে এখানে একদম দাঁড়াতে বাধ্য হন। প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় জমান এখানে। উপভোগ করেন মনোরম দৃশ্য।
নিলুয়ার বিলে পাখির মেলা থাকে নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত। দলবেঁধে যখন পাখিগুলো আকাশে ওড়ে, তার সঙ্গে যেন উড়ে চলে মনও। পুরো এলাকাটিই সরব করে রাখে এই পাখপাখালি।

পাখিদের এই মিছিলে আছে দেশিয় বক, বালিহাঁস, পানি কাউর, পানকৌড়িসহ নাম না জানা অনেক অতিথি পাখি। গ্রামের গাছে গাছে বাসা বেঁধে বাচ্চা ফোটায়। আর বাচ্চা বড় হলেই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
সরেজমিন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শান্ত জলের বুকে কচুরিপানার সবুজ গালিচার মাঝে ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলছে অতিথি পাখির দল। উড়ে চলা পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত চারিপাশ।
পিয়াং হাঁস, পাতি সরালি, লেঙজা হাঁস, বালি হাঁস, পাতিকূটদেশী জাতের শামুকখোল, পানকৌড়ী, ছন্নি হাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির নাম নাজানা অতিথি পাখী, বিল এলাকা মুখরিত করে তুলছে। কিন্তু পরিমাণে গত বছরের প্রায় অর্ধেক। এবছর তির্ব্বতীয় মানিকচক, সাইবেরিয়ান ফিদ্দাসহ অনেক অতিথি পাখিই চোখে পড়েনি।
নাম নাজানা এক পাখী প্রেমিক জানান, নভেম্বর এলেই পাখিগুলো যে কোথা থেকে আসে তা জানি না। তবে প্রচুর পাখি আসে এই গ্রামে, যা মানিকগঞ্জের আর কোথাও তা দেখা যায় না।
বিল ঘেঁষে মানিকগঞ্জ-দৌলতপুর সড়ক হওয়ায় বিল সংকীর্ণ হয়েছে এবং যানবাহন চলাচলের কারণে অনেক পাখি অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

তিনি জানান, সম্প্রতি কিছু দুষ্কৃতকারী বন্দুক ও বিভিন্ন ফাঁদ দিয়ে পাখি ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
ঢাকার গাবতলী থেকে টাঙ্গাইলের ধুবড়িয়াগামী বিআরটিসি কিংবা ভিলেজ লাইন বাসে উঠলে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন নিলুয়া। ভাড়া নেবে ১০০ থেকে ১২০ টাকার মত।
বাসস্ট্যান্ডে নামলে পাশেই দেখবেন এই বিলটি। চাইলে নৌকা করে ঘুরতেও পারেন বিলের মধ্যে। পাখির কিচিরমিচিরে ভালো সময়ই কাটবে আপনার।

এবার আসছি প্রকৃতির সৌন্দর্য রাজ্যের কথায়। সরিষার জন্য মানিকগঞ্জ এমনিতেই বিখ্যাত। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড পার হলেই দুচোখে শুধু হলুদ আর হলুদ দেখবেন। নিলুয়া গ্রামের আশেপাশেও অনেক সরিষার খেত আছে। পথিমধ্যে চোখে পড়বে অগণিত সবজি ও বিভিন্ন ফসলি জমি। এসব মনোরম দৃশ্য দেখে মনের অজান্তেই ছবি তুলতে ইচ্ছা করে।
এলাকার মানুষও খুবই ভালো, সরলতা আর আতিথিয়তা মুগ্ধ করবে অপনাকে। ঘিওর বাজারের একটু আগে পাঁচ রাস্তার মোড়ে (ঘিওর প্রেসক্লাবের বিপরীতে) বিখ্যাত নিজাম সুইটসের বাহারী স্বাদের মিষ্টি খেয়ে যেতে ভুলবেন না।

ঘিওরের ইউএনও আইরিন আক্তার বলেন, পাখি প্রকৃতির অলংকার। এ অলংকার ধ্বংস করা মানে পরিবেশ ধ্বংস করা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাখির বিচরণ ক্ষেত্র মুক্তভাবে রক্ষা করতে হবে।
আমাদের দেশ ক্রমে ক্রমে অতিথি পাখির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠছে। শুধু আইন দিয়েই পাখি শিকার বন্ধ করা যাবে না। সর্বস্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। গ্রাম ও শহরের সব বয়সী মানুষ অতিথি পাখি দেখতে ভিড় করেন এখানে। বিলটির উন্নয়ন ও অতিথি পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম করার লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করেছি। সংশ্লিষ্ট দফতরে এ ব্যাপারে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে।

সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের সঙ্গে অতিথি পাখিদের হৃদয়ের সম্পর্ক অনেক গভীর ও প্রাচীন। আমাদের অসচেতনতার অভাবে সামান্য স্বার্থের কারণে বা শখের কারণে আমরা শীতের পাখিদের শিকার করে মেরে ফেলছি। এতে করে আমরাই আমাদের এই সুন্দর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছি।
পাখিরা নিজ আবাস ভূমি ছেড়ে চলে আসে। সেই পাখিগুলোর বেশিরভাগই আবার তাদের নিজ ভূমিতে শীত শেষে ফিরে যেতে পারে না এক শ্রেণির অর্থ লোভী পাখি শিকারিদের অত্যাচারে। এটা আমাদের জন্য খুবই মর্মদায়ক।

মানুষের সৃষ্ট কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যেহেতু প্রকৃতির বড় একটি উপাদান পাখি সমাজ। তাই আমাদের দেশীয় পাখি কিংবা অতিথি পাখি বা পরিযায়ী পাখিই বলি না কেন তাদের রক্ষা করতে হবে। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র সুরক্ষা করতে হবে। মুক্ত আকাশে উড়া খালে, বিলে, হাওর বাওড়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে তার ব্যবস্থা অবশ্যই আমাদের করতে হবে। কেননা অতিথি পাখীরা শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, পাখীরা পকৃতির বিষাক্ত পোকা মাকড় খেয়ে দেশের ভারসম্ম রক্ষা করে।।

সর্বশেষ নিউজ