২৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০, সোমবার

দ্য সেরাম রান টু নোম : যেখানে মানুষ ও কুকুর মিলে ঠেকিয়েছিল এক মহামারী

১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাস। আলাস্কার একটা ছোট্ট শহর…”নোম”। আর্কটিক সার্কেলের দক্ষিণে ১৫০ মাইল দূরে। নভেম্বর থেকে জুলাই মাস অবধি সারা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। গোটা শহর শীত আসার আগেই প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করে রাখে কারণ কোনো দরকারে বহির্বিশ্বের কাছে পৌঁছনো একপ্রকার অসম্ভব।

সেই শহরে মাত্র একজনই ডাক্তার , চারজন নার্স আর ২৫ বেডের একটা ছোট হাসপাতাল। ডাক্তার কার্টিস ওয়েলচ সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন শুধু মারণ-রোগ ডিপথেরিয়ার ভ্যাকসিনটাই একমাত্র ছিল না। যদিও তার দোষ নেই কারণ উনি আগেই অর্ডার দিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু কোনো কারণে বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেই ভ্যাকসিন নোমে এসে পৌঁছয়নি।

কপাল খারাপ থাকলে যা হয়,সেটাই হলো শেষ পর্যন্ত।১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সেই সাংঘাতিক মারণ-রোগ থাবা বসলো নোমের শিশুদের ওপর। কোয়ারেন্টাইন করা সত্ত্বেও জানুয়ারীর শেষে দুটি শিশুর মৃত্যু , ২০টা কনফার্মড কেস আর ৫০টা সম্ভাব্য কেস। ডাক্তার বুঝে গেলেন যে বিপর্যয় আসতে চলেছে আর অচিরেই এই ছোট্ট শহরের ১০০% মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।

কার্টিস ওয়েলচ টেলিগ্রাম করলেন আলাস্কার অন্য বড়ো শহরে আর আমেরিকার পাবলিক হেল্থ সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে। জানা গেল যে ভ্যাকসিন আছে কিন্তু মুশকিল হলো নোমে পৌঁছে দেওয়ার উপায় নেই। চারদিক বরফে ঢাকা তার ওপর আর্কটিক রিজিয়ন। জাহাজ চলাচল বন্ধ। প্লেন চালানোটাও একপ্রকার অসম্ভব কারণ ৫২১ মাইল দূরের ফেয়ারব্যাংকস থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত “water-cooled” প্লেন -৫০ডিগ্রী ফাহরেনহাইটে পরীক্ষিত নয়। তাছাড়া , দিনের আলো থাকে খুব কম সময়…সাথে তুষার ঝড়।

তাহলে উপায় কি?বিনা ভ্যাকসিনে নোমের সমস্ত মানুষ মারা যাবে এই ভাবে? নেওয়া হলো এক দুঃসাহসিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। ঠিক করা হলো আলাস্কার এক শহর “নেনানা”-তে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়া হবে। সেখান থেকে নোমের লোকেদের ভ্যাকসিন গিয়ে নিয়ে আসতে হবে ৬৭৪ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে।।ভ্যাকসিন আনতেও হবে খুব চটপট…দেরী হলে সংক্রমণ গোটা শহরটাকেই গ্রাস করবে। আনার উপায় একমাত্র “স্লেজ-ডগ”। এও এক সাংঘাতিক প্রায়-অসাধ্য প্ল্যান.. বিপদ পদে পদে।মৃত্যু ঘটার সম্ভবনাটাই বেশি।

কিন্তু , নোম কে বাঁচাতে হলে এটাই শেষ ও একমাত্র উপায়। ঠিক করা হলো “রিলে” পদ্ধতিতে কাজটা করতে হবে। ১৫০টি কুকুর আর তাদের ২০জন মালিক/স্লেজ-ড্রাইভার বেছে নেওয়া হলো। সব থেকে কঠিন পর্যায়ের জন্য বাছা হলো সেরা স্লেজ-ড্রাইভার “লিওনহার্ড সেপ্পালা”কে আর তার টিমের সেরা সাইবেরিয়ান হাসকি “টোগো”কে সেই টিমকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। শুরু হলো এক দুঃসাহসিক অসম্ভব রেস যা ইতিহাসের পাতায় আজো স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে “The Serum Run” বা “Great Race of Mercy”।

২৭শে জানুয়ারি , ১৯২৫… শুরু হলো রেস। বিল শ্যানন…ড্যান গ্রীন…জনি ফলজার…স্যাম জোসেফ…টিটুস নিকোলাই…ডেভ কর্নিং…এডগার কালান্ড…হ্যারি পিটকা…বিল ম্যাকারটি…এডগার নলেনার…জর্জ নলেনার…চার্লি এভান্স…টমি প্যাটসন…জ্যাক নিকোলাই…ভিক্টর অন্জিএক…মাইলস গোনাঙ্গনান…হেনরি ইভানফ। এই ১৭ জনের আর তাদের টিমের কুকুরদের হাত ঘুরে ভ্যাকসিন এসে পৌঁছলো “শাকতুলিক” শহরের বাইরে।

ততক্ষণে লিওনহার্ড সেপ্পালা নোম থেকে মরণপণ লড়াই করে টোগো কে নিয়ে শাকতুলিকে পৌঁছে ভ্যাকসিনের ব্যাটন হাতে তুলে নিলো। নোম থেকে শাকতুলিক ২৬০ মাইল। -৩০ ডিগ্রী ফাহরেনহাইট তাপমাত্রা , -৮৫ ডিগ্রী ফাহরেনহাইটের কনকনে বাতাস আর ঝড় সহ্য করে টোগো স্লেজ টেনে ৩১শে জানুয়ারী প্রস্তুত হলো ফেরার পথে। ফেরার পথ এই তিনদিনে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।

“Norton sound”এর উন্মুক্ত বরফ যেন হিমশীতল মৃত্যুর হাতছানি।মৃত্যু সেখানে খেলা করে জীবনের সাথে…মোকাবিলা করা দূরের কথা,কেউ ভাবতেও পারেনা সেখানে জীবনের বাজি রাখতে। দিনের স্বল্প আলো আর রাতের অন্ধকারে blizzard-এর মাঝে টোগো এগিয়ে চললো অসীম সাহসে লিওনহার্ড সেপ্পালাকে নিয়ে।তার পিঠে বাঁধা জীবনদায়ী ভ্যাকসিন… যেভাবে হোক নোম কে বাঁচাতে হবেই। তুষার ঝড়ে লিওনহার্ড সেপ্পালা পথ হারিয়ে ফেললো।সামনে রাস্তা দেখা যাচ্ছেনা। মৃত্যু ছাড়া গতি নেই।

কিন্তু , টোগো হার মানলোনা। সে একা রাস্তা চিনে পুরো টিমকে ৮৪ মাইল রাস্তা স্লেজ টেনে রাত ৮টা নাগাদ এনে পৌঁছে দিলো “Issac’s point”এর একটা রোড হাউসে।নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে পুরো টিমকে বাঁচিয়ে টোগো তখনই হিরো। ৬ ঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে রাত ২টোর সময় টিম বেরিয়ে পড়ল আবার। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে…বাঁচাতে হবে নিজের শহরকে, নিজের মানুষদের।

তাপমাত্রা তখন -৪০ ডিগ্রী ফাহরেনহাইট…পায়ের তলায় বরফের চাদর ভেঙে যাচ্ছে।প্রত্যেক মুহূর্তে মৃত্যু ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের। সাথে বিষাক্ত ঝড় সারা শরীরকে অবশ করে হাইপোথারমিয়া সৃষ্টি করছে। গভীর অন্ধকারের মাঝে স্লেজ টেনে টোগো এগিয়ে চললো যতক্ষণ না তারা পৌঁছলো “Little Mckinley” পর্বতের সামনে। শুরু হলো ৫০০০ ফিট উচ্চতার পাহাড় চড়া। এ এক অসম্ভব রেস…অবাস্তব প্রচেষ্টা।

লিওনহার্ড সেপ্পালা তখন প্রায় নিঃশেষ… শরীর, মন আর কোনোটাই দিচ্ছে না কিন্তু টোগো তখন সাক্ষাৎ ঈশ্বর। একটি সাইবেরিয়ান হাসকির ওপর ভর করেছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা।তার প্রিয় মানুষদের সে যেভাবে হোক রক্ষা করবেই… মালিককে মরতে সে দেবে না।মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে এক সারমেয়র ঐতিহাসিক কীর্তির চিত্রনাট্যের শেষ চ্যালেঞ্জ।

ওই বিভীষিকার মধ্যে জীবন বাজি রেখে টোগো পুরো টিমকে টানতে টানতে পাহাড় টপকে নেমে এলো “গোলোভিন”এর রোড হাউসে। টোগো এর মধ্যে ২০০ মাইল রাস্তা অতিক্রম করেছে ওই ভয়াল পরিস্থিতির মাঝে যেখানে পা রাখতে মানুষের বুক কেঁপে ওঠে।আসা যাওয়া মিলিয়ে ৩৪০ মাইল যা এক কথায় ভাবাটাই দুরূহ আলাস্কার ওই ভয়াবহ পরিবেশে।

এখান থেকে লিওনহার্ড সেপ্পালার হাত থেকে ভ্যাকসিন নিলো চার্লি ওলসেন আর শেষ রিলেতে গুননার কাসেন তার কুকুর বালটো কে নিয়ে ভ্যাকসিন পৌঁছে দিলো নোম শহরে। সাড়ে পাঁচ দিনের মাথায় ভ্যাকসিন পেলো নোম। গোটা শহরের মানুষ বাঁচার সুযোগ পেলো।
সারা পৃথিবীতে হৈহৈ পড়ে গেল এই অসম্ভব রেস সফল হওয়ার জন্য।
স্লেজ-চালকদের অনেকেই ফ্রস্ট-বাইট ও নানা রকম রোগের শিকার হলো।

দুর্ভাগ্যবশত ১৫০ কুকুরের অনেকগুলিই মারা গেল এই যুদ্ধে। তারা নিজেদের জীবন দিয়ে মানুষকে রক্ষা করে গেল।যদিও সুপারহিরো “টোগো” সুস্থ্য শরীরেই ফেরৎ এলো। ইতিহাসের পাতায় এই Serum Run এর সাথে Togo -র নাম ও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সেরাম রানের উপর লেখা হয়েছে বই, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। ২০০৩ সালে প্রকাশিত বেস্টসেলিং বই “দ্য ক্রুয়েলেস্ট মাইল” সিরাম রানের বিশদ ইতিহাস বর্ণনা করছে। তারও অনেক আগে ১৯৩০ সালে এলিজাবেথ রাইকারের লেখা “সেপালা: আলাস্কান ডগ ড্রাইভার” বইতে সেপালার নিজের বয়ানে সেরাম রানের বৃত্তান্ত পাওয়া যায়।

এছাড়া ১৯৯৫ সালে ডিজনি বাল্টোকে নিয়ে একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তবে ২০১৯ সালে তারা “টোগো” নামে আরেকটি চলচ্চিত্র ডিজনি প্লাসে প্রদর্শন করে, যেখানে সেরাম রানের ইতিহাস মোটামুটি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আগ্রহীরা চাইলে তা দেখতে পারেন।cd-Mohsinul Haque

সর্বশেষ নিউজ