২৬, অক্টোবর, ২০২০, সোমবার

ওয়াসার এমডি তাকসিমের দুর্নীতির তালগাছ আকাশে ঠেকেছে!

আ’কণ্ঠ দুর্নীতিতে নিম’জ্জিত ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। তার বিরু’দ্ধে ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে আর্থিক অ’নিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছিল ২০১৫ সালে। ঢাকা ওয়াসার পদ্মা যশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য দরপত্র ও ভেটিং (দর-কষাকষি) ছাড়াই নিম্নমানের পাইপ আমদানির মাধ্যমে আর্থিক অ’নিয়মের অভিযোগে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকসিমের বিরু’দ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। তৎসময়ে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পরেও অদৃশ্য কারণে তার বিরু’দ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

এর ফলে, পরবর্তীতে তাকসিম এ খান আরও বে’পরোয়া হয়ে উঠেন। প্রবাদে পরিণত হয়, ওয়াসায় দুর্নীতি ধরা পড়ে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়না। নিয়োগ বাণিজ্য, আউটসোর্সিং বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে অ’নিয়ম ও বিদেশ ভ্রমণে অ’নিয়মসহ নানা অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও কোন সময়ে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। যার ফলে দুর্নীতির এই তালগাছের চারা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে, ঠেকেছে আকাশে। এ পর্যন্ত তার চাকুরীর মেয়াদ ৬-৭ বার বাড়ানো হয়েছে। সরকারি চাকুরিবিধির কোন কোন ধারা অনুসরণ করে তার চাকুরীর মেয়াদ বার বার বাড়ানো হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।

কথিত আছে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কর্মচারীগণ তাদের বেতনের বাইরে প্রকারভেদে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা করে প্রতিমাসে ওভার টাইম বিল উত্তোলন করেন। ওয়াসার কর্মচারী নেতা জাতিয় শ্রমিক লীগের সভাপতি জনাব হাফিজ আহম্মদের চাকুরীর মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। অথচ তিনি এখনও ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে ওয়াসা নিয়ন্ত্রণ করেন। ওয়াসা ভবনে তার জন্য বরাদ্দকৃত অফিসকক্ষ এখনও সরগরম থাকে নিয়মিত।

মূলতঃ বিগত ১৫ বছরের অধিক কাল নতুন কোন লোক ওয়াসায় নিয়োগ দেয়া হয়নি। যে কয়জন দেয়া হয়েছে তা শুধুমাত্র অতি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে, কেবলমাত্র অ’চলাবস্থা নিরসনকল্পে। অথচ আউটসোর্সিং (ঠিকাদারির মাধ্যমে দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে) এর মাধ্যমে কর্মচারীর ঘা’টতি পূরণে ওয়াসা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা জলে ঢেলে দিচ্ছে, কিছু কামিয়ে নিচ্ছে তারা সবাই মিলে। বছরান্তে ৩০০ থেকে ৫০০ আউটসোর্সিং এর লোক নিয়োগ দেখালেও বাস্তবতায় ৩০ থেকে ১৫০ জনের অধিক লোক নিয়োগ দেয়া হয় না। বাদবাকিদের টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়দের সহযোগীতায় বয়ঃজেষ্ঠ্য কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন নেতাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশ স্থানীয় প্রভাবশা’লীদের সঙ্গে মিলে সংস্থাটির নিজস্ব জমি দখ’ল থেকে শুরু করে অনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি পর্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যবহারে নিয়ে গেছেন বলে জানা যায়।

বিগত ২০১৩ সাল থেকে ওয়াসার দুর্নীতির বিষয়ে বার বার প্রকাশ্য, অ’প্রকাশ্য তদন্ত হলেও কারো বিরু’দ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

২০১৭ সালের শুরুতে দুদক সরকারি বেসরকারি সেবা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি তদন্তে টিম গঠন করে তদন্ত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দুদক পরিচালক বেলাল হোসেনের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি টিম রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ওয়াসা অফিসে অভিযান চালায়। টিম সদস্যরা সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাসকিম এ খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকাল ৩টায় বেরিয়ে এসে বেলাল হোসেন বলেন, আমরা ওয়াসার দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা করেছি। সেবাধর্মী এ সংস্থায় নানা ধরনের অ’সংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এ অভিযানের সময় ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দুদক অভিযান চালিয়ে দুর্নীতির কী প্রমাণ পেয়েছে সেই সম্পর্কে কিছুই সংবাদ মাধ্যমকে জানায়নি। তবে ওয়াসার বিরু’দ্ধে আর্থিকসহ নানা ধরনের অ’সংগতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে আমরা ঐ সমস্ত অ’নিয়ম প্রতিরোধে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।

প্রতিবছরই আবাসিক অনাবাসিক পানির বিল বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অ’কারণে। কিন্তু সেবার মান তুলনামূলক বাড়েনি। সমগ্র ওয়াসাকে ডিজিটিলাইজড করার একাধিকবার উদ্যোগ গ্রহণ করেও মাত্র দুটি ইউনিটকে ডিজিটিলাইজড করে অ’জ্ঞাত কারণে অন্য ইউনিটগুলোকে আগেকার এনালগ পদ্ধতিতে চালিয়ে নিচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে কিছু কিছু খাতে ব্যয়ের অঙ্ক প্রকল্পকেই প্রশ্নবি’দ্ধ করছে। অ’স্বাভাবিক ব্যয় প্রাক্কলন বা বরাদ্দের কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও অনেক বেশি হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার পরিশোধিত পানি ঢাকা শহরে সরবরাহ করতে মেইন লাইন নির্মাণ প্রকল্পে আউটসোর্সিং জনবলের মাথাপিছু বেতন ধরা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। যেখানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্রের ভৌত নিরাপত্তা প্রকল্পে জনপ্রতি মাসে বেতন ৩৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। আউটসোর্সিং খাতে ৮ জনের জন্য ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পরিকল্পনা কমিশনে। বিষয়টিকে মাত্রাতিরিক্ত বলেও অভিহিত করেছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

ঢাকা ওয়াসার প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ৬৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকায় পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগারের (ফেজ-১) পরিশোধিত পানি ঢাকা শহরে সরবরাহের জন্য মেইন লাইন নির্মাণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। ২ বছরের এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হবে মিটফোর্ড, বাবুবাজার, সদরঘাট, লালবাগ, ধানমন্ডি, পিলখানা, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া ও তৎসংলগ্ন এলাকার জনগোষ্ঠী। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার জনগণ উপকৃত হবে।

ঢাকা ওয়াসা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নগরবাসীকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ‘পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার (ফেজ-১)’ নামে প্রকল্পটি চলমান আছে। ওয়াসার দায়িত্ব হলো পাইপ লাইনের মাধ্যমে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের মানুষের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ করা। বর্তমানে ওয়াসা দৈনিক গড়ে ২৪০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। যার ৭৮ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রায় ৯০০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে এবং ২২ শতাংশ ভূ-পৃষ্ঠস্থ উৎস থেকে ৫টি পানি শোধনাগারের মাধ্যমে সরবরাহ করে থাকে।

সরবরাহ লাইন নির্মাণ প্রকল্পে বিভিন্ন খাত ও ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে খোদ ভৌত পরিকল্পনা বিভাগ আ’পত্তি জানিয়েছে। তারা প্রকল্পের অনেক খাতের ব্যয়ের অঙ্কের ব্যাপারে স্বচ্ছতা পাচ্ছেন না বলেও জানান। ওয়াসার প্রস্তাবনায় প্রকল্পের আওতায় ১১ কর্মকর্তাকে নতুন করে নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের জনবল সংক্রান্ত কমিটির কোনো সুপারিশই গ্রহণ করা হয়নি। নিয়ম অনুসারে এ কমিটির সুপারিশ ছাড়া জনবল সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব দেয়ার কথা যৌক্তিক নয়। এখানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৮ জন লোক নেয়া হবে। তাদের জন্য ২ বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

প্রস্তাবনায় ওয়াসা এখানে প্রশাসনিক বিবিধ ব্যয়ও উল্লেখ করেছে। কিন্তু বিস্তারিতভাবে কোনো কিছু প্রকাশ করেনি। এই ৮ জনের বেতন ২ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা ধরা হলে তাতে জনপ্রতি মাসে ব্যয় হবে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। অথচ রূপপুর প্রকল্পের ভৌত নিরাপত্তার প্রকল্পে ১১ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে। ওই জনবলের জন্য ৪২ মাসে ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এখানে মাসে জনপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৩৫ হাজার টাকার কিছু বেশি।

অন্য দিকে, ৪০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কাজসহ এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৪ কোটি ৫১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে প্রতি কিলোমিটারে লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে ১১ কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। যেখানে সদ্য সমাপ্ত ৩৭ জেলায় পানি সরবরাহ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে নতুন সরবরাহ লাইন নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৯৮ কোটি টাকা। আর ১২টি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনা বাবদ মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ টাকা। কোন কম্পিউটারে কত ব্যয় হবে তারও উল্লেখ নেই।

এদিকে প্রস্তাবনায় নতুন করে নিয়োগ দেয়া ১১ কর্মকর্তার জন্য বেতন ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা। এর বাইরে দায়িত্বভার ভাতা ৬ লাখ টাকা। অন্য কোনো প্রকল্পে এ ধরনের খাতের উল্লেখ নেই। সেখানে বদলি ভাতা বলে খাত পাওয়া গেছে। আপ্যায়ন ভাতা ৫ লাখ টাকা ও সম্মানী ভাতা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ। অর্থাৎ ২ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ১১ কর্মকর্তার পেছনে মোট ব্যয় হবে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিস্তারিতভাবে ব্যয়গুলো উল্লেখ না করাটা অ’পরিচ্ছন্ন বলেও কমিশনের সংশ্লিষ্টরা অভিমত প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা বিভাগের যুগ্ম প্রধানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এখনো পিইসি সভা হয়নি। বিভিন্ন খাতের বিস্তারিত ঢাকা ওয়াসাই ভালো বলতে পারবে। এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসানের সাথে গত রাতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।

তথ্য সুত্রঃ বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য।

সর্বশেষ নিউজ