২৫, অক্টোবর, ২০২০, রোববার

যে সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী হবে না

মুফতী মাহমুদ হাসান: মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে কুরবানীর সূত্রপাত।মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহ-প্রেমে স্বীয় পুত্রকে কুরবানী করার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন। আমাদের মধ্যে যে কুরবানির নিয়ম চালু রয়েছে, তা মূলত হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবিজড়িত আত্ম-ত্যাগের সর্বোচ্চ ইবাদত। তাই আমাদেরও উচিত কুন্ঠিত না হয়ে কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর প্রেমে ত্যাগের নিদর্শন রাখা। তাই তো আমরা প্রতি বছর ঈদুল আজহায় পশু কুরবানী করি।কুরবানী একটি স্বতঃসিদ্ধ ওয়াজিব ইবাদত।এই ইবাদত আদায় হতে লাগবে ত্রুটিমুক্ত পশু।কুরবানীর পশু মোটা-তাজা হওয়া উত্তম৷ এবং সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী।(সুনানে আবু দাউদ ২৭৯২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৩ হাদীস৷ আল-হিদায়া ৪/৪৩১ পৃষ্ঠা৷)

তাই আসুন জেনেনেই কোন ধরণের ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানী করা যাবে না।

১. মাসআলাঃ

যে পশু এত দূর্বল ও রুগ্ন যে জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেটে যেতে পারেনা, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷)

২. মাসআলাঃ

যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে যদি অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে যায় অথবা শিং এখনো উঠেইনি তবে এরুপ পশু দ্বারাও কুরানী সহীহ হবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৪ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৫ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷)

৩. মাসআলাঃ

যে পশুর দুটি চোঁখই অন্ধ বা একটি চোঁখ পূরো অন্ধ বা একটি চোঁখের তিন ভাগের এক ভাগ কিংবা আরো বেশি দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷

বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪ পৃষ্ঠা৷)

৪. মাসআলাঃ

যে পশুর কোন দাঁত নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে,খাবার চিবিয়ে খেতে পারে না,এমন পশু দ্বারও কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৩ পৃষ্ঠা৷)

৫. মাসআলাঃ

যে পশুর লেজ, কান বা অন্য কোন অংগের এক তৃতীয়াংশ বা তদপেক্ষা বেশি কেটে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা। তবে যে পশুর জন্ম থেকেই কান ছোট সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে। আর যে পশুর জন্মগতভাবেই কান নেই, তা দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪২ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৪৯৮ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮২ পৃষ্ঠা৷)

৬. মাসআলাঃ

যে পশু তিন পায়ে ভর দিয়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারেনা বা এক পায়ে কোনরুপ ভর দিতে পারেনা, এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা সহীহ হবেনা। তবে পা দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে যদি চলতে পারে, তবে কুরবানী করা সহীহ হবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮১ পৃষ্ঠা৷)

৭. মাসআলাঃ

যে পশু এমন শুষ্ক যে, তার হাড়ের মগজ শুকিয়ে গেছে, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে হাড়ের মগজ না শুকালে কুরবানী সহীহ হবে।(সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷)

৮. মাসআলাঃ

যে পশুর এলার্জির কারনে গোশত নষ্ট হয়ে গেছে, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা।

তবে গোশত যদি নষ্ট না হয়ে থাকে, তবে কুরবানী সহীহ হবে। (সুনানে নাসায়ী ৪৩৭১ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৪২ পৃষ্ঠা৷)

৯. মাসআলাঃ

পাগল পশু দ্বারা কুরবানী করা জয়েয। তবে যদি তার পাগলামী এত বেশি হয় যে ঘাশ পানি দিলে খায় না বা মাঠে চরে না তাহলে তা দ্বারা কুরবানী জায়েয নয়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬

১০. মাসআলাঃ

গর্ভবতী পশু দ্বারা কুরবানী করা মাকরুহ হবে। তবে কুরবানী সহীহ হবে৷ গর্ভবতী পশু জবাই করার পর যদি বাচ্চা জীবীত পাওয়া যায়, তাহলে সে বাচ্চা জীবীত সদকাহ করে দেয়া উত্তম হবে৷ (ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া ৩/৩৬৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫০ পৃষ্ঠা৷ মালাবুদ্ধা মিনহু ২৭৬ পৃষ্ঠা৷)

১১. মাসআলাঃ

কেউ কুরবানীর জন্য ভালো পশু ক্রয় করার পর যদি তাতে এমন দোষ দেখতে পায় যে, যার কারনে কুরবানী সহীহ হবেনা,তবে ঐ পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে না। বরং ভিন্ন একটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা যদি গরীব হয়,তাহলে ঐ ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী সহীহ হবে। (ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷

খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯ পৃষ্ঠা৷)

১২. মাসআলাঃ

পশু জবাই করতে গিয়ে যদি ক্রটিযুক্ত হয়ে পড়ে, যেমন ধরতে বা বাধতে বা শুয়াতে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেল ইত্যাদি তাহলে সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে।

(ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৬ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৮২ পৃষ্ঠা৷)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ত্রুটিমুক্ত নিখুঁত পশু কুরবানী করার তাওফিক দিক। আমীন।

মুফতী মাহমুদ হাসান
*দারুল হাদীস (এম এ ইসলামিক স্টাডিজ )
জামিয়াতুল আবরার বসুন্ধরা ঢাকা।
*দারুল ইফতা (ইসলামিক আইন ও গবেষণা বিভাগ) ঢাকা।
*আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ (অনার্স) ঢাকা।

সর্বশেষ নিউজ