২৫, অক্টোবর, ২০২০, রোববার

বন্যার পানিতে ভাসছে করটিয়া’র কাপড়ের হাট ॥ রাজস্ব আদায় বন্ধ

ইমরুল হাসান বাবু, টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাণিজ্যিক এলাকা ঐতিহ্যবাহি করটিয়া কাপড়ের হাট ভাসছে বন্যার পানিতে। এতে করে রাজস্ব আদায় বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্রটি দেখা যায়। এতে বিপাকে পড়েছে পাইকারী বিক্রেতা ও স্থানীয় ইজারাদার।

জানা যায়, টাঙ্গাইল শাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে করটিয়া হাটের ইতিহাস। প্রায় দু’শ বছর এর বয়স বলে জনশ্রুতি আছে। প্রবীণ শাড়ি ব্যবসায়ী রঘুনাথ বসাক জানান, প্রাচীনকালে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা মসলিন শাড়ি বুনতেন বলে শোনা যায়। এর স্বার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে আজও টিকে রয়েছে টাঙ্গাইলের জামদানি, বেনারসি ও তাঁতের শাড়ি। অতীতে মুসলমান তাঁতিদের বলা হতো ‘জোলা’। জোলাদের সংখ্যাধিক্য ছিল টাঙ্গাইল শহর, কালিহাতী ও গোপালপুর এলাকায়। অপরদিকে যুগী বা যুঙ্গীদের নাথপন্থী ও কৌলিক উপাধি হিসেবে দেবনাথ বলা হয়। ক্ষৌম বস্ত্র বো মোটা কাপড় বোনার কাজে এদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। সুতা কাটার চরকা ছিল তাদের। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই সুতা কাটা ও কাপড় বুনতেন। যুগীরা ক্ষৌম, গামছা, মশারি তৈরি করে প্রায় স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতেন। আরও জানা যায়, টাঙ্গাইলের হিন্দু তাঁতিদের মৌলিক উপাধি বসাক। বাজিতপুর ও নলসুন্দা গ্রামেই তাদের অনেকে বাস করেন। তবে বল্লা ও রতনগঞ্জে জোলার সংখ্যা বেশি।

দেশ ভাগের আগে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির বাজার বসতো কলকাতায়। টাঙ্গাইলের তাঁতিরা চারাবাড়ি, পোড়াবাড়ি ও নলছিয়া ঘাট এবং সুবর্ণখালী বন্দর থেকে স্টিমার, লঞ্চ ও জাহাজে চড়ে কলকাতায় যেতেন। দেশ ভাগের পর টাঙ্গাইল তাঁতের প্রধান হাট ছিল জেলার বাজিতপুরে। শুধু দেশি পাইকাররাই নন, ভারত ও ইংল্যান্ড থেকেও শাড়ি কিনতে আসতেন ক্রেতারা। টাঙ্গাইল শাড়ির এমন চাহিদা আর দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের আগমন দেখে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত করটিয়া জমিদার পরিবার একটি হাটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। পন্নী পরিবারের সদস্য ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়া করটিয়ার বিশাল এলাকাজুড়ে একটি হাট নির্মাণ করেন। সে সময় করটিয়া ছিল একটি নদীবন্দর। সেখানে সপ্তাহজুড়ে হাট বসতো। শাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু, হাতে তৈরি তৈজসপত্রসহ নানা সামগ্রী বিক্রি হতো। প্রতিষ্ঠার পর পাট ও গবাদিপশুর জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে এ হাট। পরবর্তী সময়ে টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময়ের জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম ছিল নদীপথ। এ হাটটি মাহমুদগঞ্জ কাপড়ের হাট হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে।

প্রায় দুইশ বিঘা জমির ওপর হাটটি প্রতিষ্ঠিত। লক্ষাধিক ব্যবসায়ী ব্যবসা করছেন এখানে। শাড়ির পাশাপাশি শালের জন্যও বিখ্যাত এ হাট। এখান থেকেই অনেক জেলার কারিগরের তৈরি চাদর ভারত, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ও কয়েকটি শীত প্রধান দেশে রফতানি হয়।

বর্তমানে সপ্তাহে দু’দিন বসে হাটটি। সপ্তাহের মঙ্গলবার বিকালে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে শেষ হয়। দেশের নানা স্থান থেকে আসা পাইকাররা এখানের শাড়ি কিনে খুচরা বিক্রি করেন। সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে। খোলা মাঠে শাড়ি বিক্রির পাশাপাশি হাটে তৈরি করা হয়েছে অর্ধশতাধিক বহুতল মার্কেট। টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি প্রিন্টের শাড়িও পাওয়া যায় এখানে। ঢাকার ইসলামপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও এনায়েতপুর থেকে শাড়ি আসে। বর্তমানে শাড়ি ও শালের পাশাপাশি লুঙ্গি, চাদর, থ্রিপিস এবং শিশুদের পোশাক পাওয়া যায় এখানে। পাইকারির পাশাপাশি চলে খুচরা বিক্রিও।

জানা যায়, চলতি বছরে প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা হাটের ডাক হয়েছে। সেই খাজনা পূরণ করেছেন ব্যবসায়িরা। কিন্তু এবার বন্যা ও করোনার কারণে ইজারাদাররা হাটের ডাক তুলতে না পারায় বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

এ বিষয়ে কাপড় বিক্রেতা আমিনুর, রফিক, করিম, উজ্জল, জানান, করটিয়া হাটে পানি উঠায় আমরা বিকিকিনি করতে পারছি না। ঐতিহ্যবাহী এ হাটটি স্বাধীনতার পর চোখে পড়ার মত কোন উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়নের দাবিও জানান তারা।

হাটের স্থানীয় ইজারাদার নুরুল আমিন জানান, করোনা ও বন্যার কারণে তিন মাস যাবত হাটে কোন মহাজন আসতে না পারায় খাজনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও করটিয়া হাট কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আনছারী বলেন, করটিয়ার হাটের চারিপাশের রাস্তাগুলোর বেহাল দশা ও হাটটি নদী ঘেঁষা হওয়ায় রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং নদীর ঘাটটি পাঁকাকরন করা অতীব জরুরী।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েদুল ইসলাম বলেন, করটিয়া হাটের এ সংকটের কথা আমার জানা নাই। তবে করটিয়া হাট উন্নয়নকরনের পরিকল্পনা আছে।

সর্বশেষ নিউজ