২৫, সেপ্টেম্বর, ২০২০, শুক্রবার

পুলিশে পদোন্নতি নিয়ে নতুন করে বৈসম্য ও অসন্তোয় বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গত ২৮ জুলাই পুলিশের পলিসি গ্রুপের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পুলিশের ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি) হবেন। এএসপি (সহকারী পুলিশ সুপার) পদে পদোন্নতিতে দীর্ঘদিন ধরে জট থাকায় বিকল্প হিসাবে ডিএসপি পদ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রালয়ে পাঠানো প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, ডিএসপি পদ বাস্তবে কোনো পদোন্নতি নয়। এটা ইন্সপেক্টরদের উচ্চতর পদের সাময়িক দায়িত্ব পালনকালীন পদবি মাত্র। ডিএসপি পদে কর্মকর্তারা অস্থায়ীভাবে এএসপি পদে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। ডিএসপি পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টরদের বেতন গ্রেডের কোন পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। এ ব্যাপারে সারাদেশের সাব-ইন্সপেক্টর ও ইন্সপেক্টরগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান যে, পুলিশের নিয়োগ পদ্ধতির ক্রটির কারণে দেশের সেরা মেধাবী ছাত্ররা সহকারী পুলিশ সুপার(এএসপি) হিসাবে চাকুরিতে নিয়োগ পেয়ে অনেকে পুলিশ সুপার হিসাবে অবসর গ্রহন করে তখন তার সহপাঠি অন্য ক্যাডারে নিয়োগ পেয়ে পূনাঙ্গ সচিব পদমযর্দার কর্মকর্তা হিসাবে অবসরে যাচ্ছে। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে যে হারে সরাসরি এএসপি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সে হারে এসপি, ডিআইজি, আইজি’র পদমর্যদার পদ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

এতো ছোট একটি দেশে এটা করা সম্ভবও নহে। যদিও বিভিন্ন কৌশলে পুলিশের নতুন নতুন ইউনিট তৈরি করে নতুন নতুন পদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি সুপার নিউমরিক পদোন্নতি দেওয়া হলেও এতেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এতে আরো প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। আবার সর্বোচ্চ শিক্ষগত যোগ্যতা নিয়ে সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকুরি যোগদান করে চাকুরি জীবনে একটি মাত্র পদোন্নতি নিয়ে ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) হিসাবে চাকুরি হতে অবসরে যাচ্ছে। ফলে একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত পুলিশ সদস্যরা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে আরো বেপরোয়া ও দুর্নীতি গ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা যায় এএসপি পদ পূরণে ৩৩ ভাগ ডিপার্টমেন্টাল পুলিশ (ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি হওয়া কর্মকর্তা) ও ৬৭ ভাগ সরাসরি বিসিএস ক্যাডার অফিসার নেয়া হয়। বর্তমানে মোট ইন্সপেক্টরদের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৬ ভাগ পুলিশের ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) পদোন্নতি পেয়ে এএসপি হন। ফলে ৯৩ ভাগ ইন্সপেক্টর পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে চলে যান। এ কারণে ইন্সপেক্টরদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে সময় এক ধরনের হতাশা কাজ করে। ২৫/৩০ বছর এক পদে চাকরি করার কারণে তাদের কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলে পুলিশ বিভাগে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, যা পুলিশের হাই অফিসিয়াল কর্মকর্তাগণ অবহিত আছেন। এক্ষেত্রে পদোন্নতি পদ্ধতি সংস্কার করে প্রতিবছর মোট ইন্সপেক্টরদের মধ্যে হতে যোগ্যতার ভিত্তিতে ৩৩% ইন্সপেক্টরকে এএসপি হিসাবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাযহারুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার শাষন আমলে ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিপার্টমেন্টাল পুলিশ ও বিসিএস ক্যাডার পুলিশের সংখ্যা পুলিশে অর্ধেক-অর্ধেক করার নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। কিন্তু সেটা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। পুলিশের মাঠ পযায়ের পুলিশ সদস্যদেরকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হচ্ছে না এসব নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। চাপা অসন্তোস বাড়লেও প্রকাশ্য কেউ মুখ খুলছে না। আর এর মূল কারণ হিসাবে দায়ী করা হচ্ছে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।

একটি সূত্রে জানা যায় যে, বিট্রিশ আলমে বিট্রিশ অফিসারদের সাথে চাকুরি করলেও এদেশীয় একজন সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর চাকুরির ২০/২৫ বছরের মধ্যে ডিআইজি হতো। আর এখন একই স্বদেশী অফিসারদের সাথে চাকুরি করলেও ৩০ বছরেও একই পদে কর্মরত থাকতে হচ্ছে। ডিএসপি পদায়ন কে নতুন এক বৈষম্য এবং চিরতরে পদোন্নতি বঞ্চিত করার জন্য নতুন এক সরযন্ত্র বলে বলে মনে করছেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও ইন্সপেক্টরগণ। ডিএসপি পদায়নের মধ্যে দিয়ে ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক)দের চোখে এএসপি, এডিশনাল এসপি ও এসপি পদে পদোন্নতি স্বপ্ন থেকে যাবে। অনেক পুলিশ সদস্য প্রশ্ন ? বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার সেই ফাইল কোথায়। এটা হারিয়ে কি গেছে ? না অদৃশ্য হয়েছে ? পুলিশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর দেখা প্রায় সব স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূরণ করেছে।

কিন্তু এএসপি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫০% ইন্সপেক্টর হতে এবং ৫০% সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরন করার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাধা কোথায় ? কতিপয় স্বার্থবাদী জন্য পুলিশের নিয়োগ ও পদোন্নতি দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। বাস্তব অবস্থার নিরিখে সরকারের উচিত বিট্রিশ আমলের পদোন্নতি নিয়ম র্নীতির সংকার করে সহকারী পুলিশ সুপার(এএসপি) নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি ৫০% এবং ইন্সপেক্টরদের মধ্যে হতে যোগ্যতার ভিত্তিতে ৫০% নিয়োগ দেওয়া। সাব-ইন্সপেক্টর এবং সাজের্ন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর হতে ৬০% এবং সরাসরি ৪০% নিয়োগ দেওয়া মাধ্যমে পদোন্নতির জট ও জঠিলতা নিরসন করা।

এতে বিভাগীয় পুলিশ অফিসারদের পদোন্নতি পেলেও তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুযোগ না থাকায় সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। আবার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ নিরশন হবে। কাজের র্স্পা বৃদ্ধি পাবে। এএসপি ও সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার এরুপ সিদ্ধান্ত নিলে পুলিশ বাহিনীতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে অভিমত ব্যক্ত করেন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা।

পুলিশের কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অভিমত, বঞ্চিত ও শোষিত করে মানবিক পুলিশ গঠন করা সম্ভব নয়। পুলিশের রেশনের মতো পদোন্নতির বৈসম্য ও অসন্তোয় দূর করা এখনই সময়। কারন যার যা প্রাপ্য তা তাকে দিয়ে দিলে পুলিশ বাহিনীতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পদোন্নতির প্রত্যাশায় পুলিশ কর্মচারীরা আরো দায়িত্ববান হবেন। এএসপি পদে ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতি দিলে তাদের বেতন গ্রেডের কোন পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। ফলে আলাদা কোন অর্থ সরকারের ব্যয় হবে না। মাঠ প্রশাসনে ক্ষোভ নিরশন হবে।

মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নতি হবে। সঠিকভাবে পদোন্নতি দেয়া হলে পদোন্নতি প্রত্যাশায় পুলিশ সদস্যগণ আরো দায়িত্ববান হবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করবে। যা আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞগণ।

সর্বশেষ নিউজ