৩০, নভেম্বর, ২০২০, সোমবার

ইমাম মেহেদী দাবী করা মুশতাক খান কি আরেকটা ‘ডুমস ডে কাল্ট’ গঠন করে ফেলতে পারে?

এই মুশতাক খানকে দ্রুত না থামানো গেলে সে কি আরও শিষ্য জোগাড় করে আরেকটা ‘ডুমস ডে কাল্ট’ গঠন করে ফেলতে পারে? মার্শাল এ্যাপল হোয়াইট, জিম জোন্স, ডেভিড কোরেশ, শোকো আশারা বা ভগবান রজনীশ ওশোর মতো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করতে পারে?

জহিরুল ইসলাম

১. জুলাই মাসে নিউওয়াইস ধূমকেতু দেখতে পেরেছেন কে কে? বাংলাদেশে ওইসময় অবশ্য প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। নিজের চোখে নিউওয়াইস না দেখতে পেয়ে টিভি বা ফেসবুকে অন্য দেশ থেকে তোলা ছবি দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। (আমি নিজেও কিছু দেখি নাই)

১৯৯৭ সালে আকাশে Hale-Bopp নামে একটা ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল। এ্যালান হেল এবং থমাস বপ মিলে এটা আবিষ্কার করেন। সেই সময়ে এই ধূমকেতু দেখা নিয়ে ভালই হুলস্থূল পড়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানী বা অনুসন্ধিতসু মহল ছাড়াও আরো অনেকেই এই ধূমকেতু নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।

আমেরিকার কথিত ‘নবী’ মার্শাল এ্যাপলহোয়াইট এই হেল বপ ধূমকেতুর আগমনকে কোনো সাধারণ মহাজাগতিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি। তিনি এটাকে দেখেছিলেন ঐশ্বরিক ইশারা হিসেবে। সেই ইশারা মেনে নিয়ে তিনি এবং তার ৩৮ জন অনুসারী একসাথে আত্মহত্যা করেন। ১৯৯৭ সালের ২৬ শে মার্চ পুলিশ আমেরিকার নিউ মেক্সিকোতে তাদের এপার্টমেন্টে গিয়ে দেখতে পায় ৩৯ টা মৃতদেহ সুন্দরমত জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। বিষপান করে তারা আত্মহত্যা করেছিল।

বাইবেলের বুক অফ ইজেকিয়েলে যেমন স্পেসশিপে করে এ্যাঞ্জেল/এলিয়েনের আগমনের বর্ননা আছে, সেটাকে ভিত্তি করে মার্শাল বিশ্বাস করতেন, স্পেশাল মানুষেরা স্পেসশিপে (বা ধূমকেতু-গ্রহানু-মহাজাগতিক কিছু) করে বহির্জগত থেকে পৃথিবীতে আসে এবং চলে যায়। যীশুর আত্মা এইরকম একটা স্পেসশিপে করে এসেছিল। তাকে যখন ক্রুসিফাই করা হয়, তখন তার আত্মা এইভাবে আবার স্পেসশিপে করে চলে গিয়েছিল।

পৃথিবীতে যখন অন্যায়-অবিচার বেড়ে যাবে, তখন আবার পৃথিবীতে যীশুর আগমন ঘটবে- এমনটাই বলা হয়েছে বাইবেলের বুক অফ রিভিলেশনে। মার্শাল দাবি করলেন, প্রায় দুই হাজার বছর পরে আমেরিকার টেক্সাসে মার্শাল এ্যাপল হোয়াইটের শরীরের মধ্যে আবার যীশুর পুনর্জন্ম ঘটেছে।

বেশ কয়েকজন তার কথা বিশ্বাস করল। বাইবেলের বুক অফ রিভিলেশনের আলামতের সাথে মার্শালের আলামত অনেকগুলা মিলল। তার অনেক অন্ধ অনুসারী জুটে গেল। মার্শাল তার অনুসারীদের বলতেন, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই লুসিফার (শয়তান) এর দাস হয়ে গেছে। তারা সঠিক জিনিস বুঝতে পারছে না। তাদের অন্তঃকরন অন্ধ হয়ে আছে। একমাত্র তোমরাই সত্যের পথে আছো।

নিজের অনুসারীদের নিয়ে তিনি Heaven’s Gate অর্থাৎ স্বর্গের দরজা নামে একটা গ্রুপও তৈরি করলেন, যারা মূলধারার খৃস্টান ধর্মের বাইরে আলাদা রিচুয়াল পালন করত।

মার্শাল তার অনুসারীদের প্রায়ই বলতেন, কেয়ামত/ আরমাগেড্ডন/মহাপ্রলয়/ডুমস ডে খুব শীঘ্রই ঘটবে। ১৯৯৩ সালে ৩০ হাজার ডলার খরচ করে তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় একটি বিজ্ঞাপনও দেন। সেখানেও বলেছিলেন, কেয়ামত খুব নিকটে। সবাই সাবধান হও।

১৯৯৭ সালে হেল-বপ ধূমকেতুর আগমনের পরে, মার্শাল তার অনুসারীদের বললেন, এটা খুব খারাপ আলামত। পৃথিবী আর কিছুদিন পরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। অনেক উলটাপালটা ঘটনা ঘটবে। যুদ্ধ-হানাহানি-রক্তপাত হবে অনেক। প্রায় সবাই মারা যাবে। এবং তারা সবাই নরকবাসী হবে। কেবলমাত্র আমরা, হেভেন্স গেটের অনুসারীরা যদি এখনই শহীদ হই, তাহলে আমাদের আত্মা এই হেল-বপ ধূমকেতু (বা এর আশেপাশে থাকা স্পেসশিপে) করে চলে যেতে পারবে স্বর্গে। এটাই আমাদের লাস্ট চান্স।

এমনকি, মার্শাল দাবি করলেন, তার মৃত স্ত্রী Nettle এর আত্মা এই স্পেস শিপের মধ্যেই আছে। সে মার্শালের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য এসেছে।

তার ব্রেইন ওয়াশড হওয়া ৩৮ জন শিষ্য কোনো প্রশ্ন করল না। বিনা দ্বিধায় সবাই বারবিচুরেট জাতীয় বিষ পান করে যন্ত্রনাবিহীনভাবে সুইসাইড করল। মৃত্যুর আগে তারা সবাই ছোট ছোট ভিডিও ইন্টার্ভিউ রেকর্ড করে রেখে গেল। সেখানে তাদের মৃত্যুর উদ্দেশ্য, মার্শাল এ্যাপলহোয়াইট এর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা এবং হেভেন্স গেট ধর্মের প্রতি তাদের বিশ্বাসের কথা জানিয়েছিল।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মার্শাল এ্যাপলহোয়াইটকে ‘প্যারানয়াল সিজোফ্রেনিয়া’ নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগী বলে ধারণা করেছেন। তিনি নিজে যে অলীক বিশ্বাস ধারণ করতেন, সেটা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেন। বিপরীত কোন কথা শুনতেন না। নরমাল ঘটনাকেও প্যারানর্মাল ঘটনা বানিয়ে ফেলতেন। দড়ি দেখলে সাপ মনে করতেন। হেল বপ ধূমকেতু দেখলে মনে করতেন এটা স্বর্গ থেকে পাঠানো স্পেশাল স্পেসশিপ।

তার অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে তার সাথে থাকার কারণে, তার কথা শোনার কারণে তাদের মধ্যে shared delusion তৈরি হয়েছিল। সোজা বাংলায়, ব্রেইন ওয়াশ। মার্শাল যা বলেছেন, নিজেরা বিচার বিশ্লেষণ না করে বাকি ৩৮ জনও সেটা ফলো করেছে।

২. আপনার কাছে কি অবিশ্বাস্য লাগছে? ভাবছেন, ৩৯ জন একসাথে ব্রেইন ওয়াশড হয়ে সুইসাইড করে কীভাবে? দাঁড়ান, এটা তো খালি স্যাম্পল দেখালাম। এবার আসল জিনিস দেখাই। ১৯৭৮ সালের ১৮ই নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের জোন্সটাউনে ৯০৮ জন একসাথে সুইসাইড করেছিল। বিশ্বের ইতিহাসে এটা বৃহত্তম গণআত্মহত্যা ।

ওখানে, ওদের নবীর নাম ছিল জিম জোন্স। নিজেকে তিনি যীশু, মহাত্মা গান্ধী, গৌতম বুদ্ধ এবং লেনিন, এই সবার ‘পুনর্জন্ম নেওয়া রুপ’ বলে দাবি করতেন।

প্রথম জীবনে জিম জোন্স বিশ্বাসী খৃস্টান ছিলেন। পরে সেই বিঃশ্বাস থেকে সরে আসেন। কিছুটা কমিউনিজম এর দিকেও ঝুঁকেছিলেন। পরে নিজেই আলাদা বিশ্বাসের একটা সংগঠন তৈরি করেন। তার গ্রুপের নাম ছিল people’s Temple.

তার গ্রুপ টাও কেয়ামত/মালহামা/আর্মাগেডডন নিয়ে ব্যাপক মাতামাতি করত। একবার তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ১৯৬৭ সালের ১৫ই জুলাই এক বিরাট বড় নিউক্লিয়ার যুদ্ধ শুরু হবে। অনেক মানুষ মারা যাবে। তার পিপলস টেম্পলের অনুসারীদের রক্ষা করার জন্য তিনি গায়ানার একটা এলাকায় চলে যান। নিজের নামে সেই শহরের নাম রাখেন জোন্স টাউন। সেখানে নিজেদের ধর্মের মন্দির টন্দির বানিয়ে রাজত্ব করতে থাকেন।

৬৭ সাল এলো, এবং চলেও গেল। কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস হল না। জিম জোন্স তার অনুসারীদের নতুন নতুন ডেট লাইন দিয়ে ঠান্ডা রাখলেন। তারাও ব্রেইন ওয়াশড হয়ে বসে থাকল।

জিম জোন্স আদেশ দিয়েছিলেন, পিপলস টেম্পলের বাসিন্দারা তাদের বিধর্মী (অর্থাৎ যারা পিপলস টেম্পল ধর্ম গ্রহন করেনি) আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। এ কারণে তারাও যোগাযোগ করত না।

উদ্বিগ্ন আত্মীয়-স্বজনরা আমেরিকান সরকারের কাছে আবেদন করল, ওদেরকে যেন গায়ানা থেকে আমেরিকায় ফেরত আনা হয়। এট লিস্ট, তাদের সাথে যোগাযোগের যেন একটা ব্যবস্থা করা যায়।

তখন আমেরিকার একজন এম পি, লিও রায়ান একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে জোনস টাউনে পরিস্থিতি দেখতে যান। সেখানে তাকে বুঝানো হয় যে, পিপলস হেভেনের সবাই খুব সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু লিও রায়ান ফেরার সময় জোন্সের বাহিনী তাকে এয়ার স্ট্রিপে আক্রমন করে। রায়ান সহ তার বেশ কয়েকজন সহযোগী মারা যান।

ওই রাতেই জিম জোন্স তার গ্রামে বিশাল একটা মিটিং ডাকেন। মাইকে জানান- আমি জানতে পেরেছি, লিও রায়ানের প্লেনে একটা গন্ডগোল হবে। আমেরিকা থেকে আমেরিকান সৈন্যরা ঝাকে ঝাকে প্যারাস্যুট দিয়ে নামবে এখানে। আমাদের লাইফ স্টাইলে বাধা দিবে। আমাদের বাচ্চাদের ফ্যাসিজমে দীক্ষা দিবে।

এখন আমাদের সামনে উপায় হচ্ছে রাশিয়া বা অন্য কোন দেশে চলে যাওয়া, যেখানে আমরা শান্তিতে থাকতে পারব। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব হচ্ছে না। তার চেয়ে ভাল, আমরা সবাই এখন revolutionary suicide করি। এর ফলে, আমরা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিব।

(you can go down in history, saying you chose your own way to go, and it is your commitment to refuse capitalism and in support of socialism)

তিনি একটি বড় লোহার চৌবাচ্চা আনালেন মন্দিরের সামনে। সায়ানাইড বিষ গুলালেন সেই পানিতে। তারপর সবাইকে গ্লাসে করে সেই বিষ পান করতে বললেন।

৯০৮ জন ব্রেইন ওয়াশড পাবলিক এক এক করে সেই বিষ পান করে মারা গেল। Ruletta Paul এবং তার ১ বছর বয়সী বাচ্চা হচ্ছে প্রথম আত্মহত্যাকারী। বাচ্চাটা এত ছোট ছিল যে তার মুখের মধ্যে গ্লাস ঢুকছিল না। এ কারণে ইনজেকশনের সিরিঞ্জে বিষ ঢুকিয়ে সেই সিরিঞ্জ বাচ্চাটার মুখের মধ্যে পুশ করা হয়।

উইকিপিডিয়াতে জোন্স টাউনের পেজে ৪৫ মিনিটের একটা অডিও আছে। বিষ পান করার সময়ে পিপলস টেম্পল এর মাইকে জিম জোন্স যে ভাষন দিচ্ছিল, সেই রেকর্ডটা আছে সেখানে। ভাষনের সময়ে আশেপাশে বেশ কিছু বাচ্চাদের কান্নাকাটিও শোনা গিয়েছিল। সম্ভবত সবাই বিষ পান করতে রাজি হয়নি। যারা রাজি হয়নি, তাদেরকে জোন্সের ক্লোজ সাথীরা পিটিয়ে পিটিয়ে জোর করে বিষ খাইয়ে দিয়েছিল।

নিচের ছবিটা পরদিন জোন্সটাউনের আকাশ থেকে প্লেনের সাহায্যে তোলা। মূল মন্দিরের আশেপাশে শত শত ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। জিম জোন্স নিজেও সুইসাইড করেছিলেন। ওই ঘটনায় কেবলমাত্র ২ জন বেঁচেছিল। তাদের শরীরে সায়ানাইডের বিষক্রিয়া কম কাজ করেছিল, কিংবা তারা চালাকি করে একটু কম খেয়েছিল সম্ভবত।

বিশেষজ্ঞরা জিম জোন্সকে মানসিক রোগী বলে মনে করেন। নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি সিনড্রমসহ তার বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ছিল। এ্যাম্ফেটামিন নামক মাদক ও গ্রহণ করতেন তিনি, যেটা তাকে সব সময় একটা কাল্পনিক জগতে আচ্ছন্ন রাখত। এই এ্যম্ফেটামিনের প্রভাবে তার কথাবার্তায় একটু অসংলগ্নতা দেখা গিয়েছিল। অডিও ভাষনেও সে প্রমাণ পাওয়া যায়।

কমপক্ষে ২০ টা সিনেমা এবং ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছিল জিম জোন্সের এই ঘটনা নিয়ে। লোমহর্ষক সিনেমা একেকটা।

৩. বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের অনেক ধর্ম গুরু আছেন, যারা সবসময় কেয়ামত বা পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে আতংকিত থাকেন, এবং অন্যের মধ্যেও সেই আতংক ছড়িয়ে দেন। এরা কেয়ামত আসার জন্য দিন গুনতে থাকেন। কেয়ামত না আসলে নিজেরাই পৃথিবীতে কেয়ামত ঘটয়ে দিতে চান। এদের সংগঠনগুলাকে ডুমস ডে কাল্ট বলা হয়। বাইবেল অনুযায়ী, কেয়ামতকে Dooms Day বলা হয়। এ কারণে ইংরেজিতে এমন নামকরন করা হয়েছে ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই মানুষগুলো আশেপাশের পরিবেশ বা প্রচলিত সমাজের সাথে তাল মেলাতে পারেন না। এই কারণে একটা কাল্পনিক জগত তৈরি করে তার মধ্যে বাস করতে পছন্দ করেন। নিজের বিশ্বাস অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান।

যে সব অনুসারী এই ‘গুরু’ দের ফলো করেন, তাদের বিশ্বাস এতই গাঢ় হয়, যে গুরুর ভবিষ্যদ্বাণী যদি না মেলে, তাহলেও তারা নিজেদের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নেন। বা গুরুর নতুন ব্যাখ্যা মেনে নেন। গুরু মিথ্যা বলছে বা ভুল বলছে- এই চিন্তা একদমই মানেন না।

জিম জোন্স বা মার্সাল এ্যাপলহোয়াইট ছাড়াও বিশ্বের কোনায় কোনায় অনেক ধর্ম গুরু আছেন, যারা ডুমস ডে কাল্ট চালান। অনেকে আবার বেশি চালাক। নিজেরা সুইসাইড করেন না, কিন্তু সাংগ পাংগদের দিয়ে ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটান। জাপানের শোকো আশারা এইরকম একজন গুরু। নিজেকে তিনি যিশু বলে দাবি করেছিলেন। Declaring Myself the Christ নামে একটা বই লিখেছিলেন। তার গ্রুপের নাম ওম শিন রিকিও (Aum Shinrikyo)।

বাইবেলের বুক অফ রিভিলেশন থেকে মিলিয়ে মিলিয়ে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে একটা ‘নিউক্লিয়ার আর্মাগেড্ডন’ হবে। এটা হবে তৃতীয় মহাযুদ্ধ। এবং এই যুদ্ধ হওয়া মানব জাতির জন্যই ভাল। কারণ যুদ্ধের পরেই আসবে শান্তি।

আমেরিকা-রাশিয়া বা অন্য কোন দেশই তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাধাচ্ছে না দেখে শোকো আশারা নিজেই জাপানের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বোম ফুটানো শুরু করলেন। ১৯৯৫ সালের ২০শে মার্চ জাপানের আন্ডার গ্রাউন্ড রেল স্টেশনে বিষাক্ত সারিন গ্যাস প্রয়োগ করল তার দল ওম শিনরিকিও। ১৩ জন নিহত এবং অনেকে আহত হন ওই ঘটনায়। জাপান সরকার এরপর শোকো আশারাকে এ্যারেস্ট করে। তার দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়। শোকোকেও ফাঁসিতে ঝুলায় ২০১৮ সালের ৬ই জুলাই।

আমেরিকার টেক্সাসে আরেকটা ইন্টারেস্টিং গুরু ছিলেন ডেভিড কোরেশ। এই লোকের ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যা ছিল। ডিসলেক্সিয়া রোগের কারণে লেখাপড়া খুব বেশি করতে পারেনি। খ্রিষ্ট ধর্মের বিভিন্ন ধরনের সেক্ট এর সাথেই মিশেছে বিভিন্ন সময়ে। পরে নিজেই একটা গ্রুপে জয়েন করে, নাম ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান। নিজেকে বাইবেলে কথিত মেসায়া কিংবা লাস্ট প্রফেট বলে দাবি করে এক সময় । টেক্সাসে ‘প্যালেস্টাইন’ নামক একটা শহর খুঁজে পেয়ে সেখানেই আস্তানা বানায়। তার জন্মগত নাম ছিল ভার্নন হাওয়েল, সেই নাম চেঞ্জ করে ডেভিড কোরেশ (হিব্রু উচ্চারন- দাউদ সাইরাস) রাখল বাইবেলের সাথে মিলানোর জন্য।

ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান গ্রুপে আগে থেকেই একজন নবী /মেসায়া ছিল। নাম- লুইস রডেন। এই রডেনের সাথে কোরেশের মারামারি বাঁধল, কে আসল মেসায়া আর কে এন্টিক্রাইস্ট/দাজ্জাল সেটা নিয়ে। চ্যালেঞ্জ উঠল, যে একটা ডেডবডিকে জ্যান্ত করতে পারবে, সে আসল নবী। কবর খুড়ে একটা ডেডবডি আনা হল। কেউই সেটাকে জ্যান্ত করতে পারল না। এই নিয়ে অনেক কেস-কামারি হল। আল্টিমেটলি, লুইস রডেন হেরে গেল। ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান গ্রুপের নেতা হল ডেভিড কোরেশ।

এরা তারপর নতুন আস্তানা করল টেক্সাসের ওয়াকোর মাউন্ট কারমেলে। পুলিশের কাছে মাঝে মাঝেই অভিযোগ আসত, ওই আস্তানায় ড্রাগ এবং অস্ত্রের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। কিংবা সেখানে ডেভিড কোরেশ অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে এবং তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক করছে। ১৯৯৩ সালের ২৮শে এপ্রিল পুলিশ তাদের আস্তানা রেইড দেয়। নরমাল তল্লাশীই ছিল পুলিশের উদ্দেশ্য। কিন্তু কোরেশের বাহিনী পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি করা শুরু করে। ৪ জন পুলিশ সদস্য সাথে সাথে মারা যায়। পুলিশ আর ভিতরে ঢুকতে পারে না। তবে তারা আরো ফোর্স জড়ো করে মাউন্ট কারমেলের আস্তানা অবরোধ করে। কোরেশের বাহিনীও বেরুতে পারে না। পুলিশ ও ভিতরে ঢুকতে পারে না। একদম অচলাবস্থা। এভাবে কেটে গেল ৫১ দিন।

১৯৯৩ সালের ১৯শে এপ্রিল পুলিশ সর্ব শক্তি নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এতে ওই কম্পাউন্ডে আগুন ধরে যায়। (অথবা কোরেশের বাহিনী নিজেরাই আগুন ধরিয়ে দেয়)। কোরেশ বাহিনীর ৮২ জন মারা যায় এই ঘটনায়।

এই ঘটনা waco seige নামে পরিচিত। ঘটনাটা নিয়ে অনেক সিনেমা-ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে।

৪. বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের সর্বশেষ বই, বুক অফ রিভিলেশনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, একজন অত্যাচারী শাসক/ এন্টিক্রাইস্ট/দাজ্জাল/ ৬৬৬ সংখ্যাবিশিষ্ট মানুষ বা পশু আসবে পৃথিবীতে। অনেক ভায়োলেন্স চালাবে সে পৃথিবীতে। তাকে দমন করার জন্য যিশু নিজে/ যিশুর একজন প্রতিনিধিও আসবেন তখন।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই বুক অফ রিভিলেশন লিখেছিলেন সেন্ট ইউহান্না। সেই সময়ের রোমের অত্যাচারী শাসক, কাইজার নিরো, ইটালির খৃষ্টানদের উপর খুব নির্যাতন করতেন। রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাশি বাজাচ্ছিল- হ্যাঁ, সেই প্রবাদের নিরোই ছিল এই অত্যাচারী শাসক। এস এ টিভিতে প্রচারিত আসহাবে কাহাফ সিরিয়ালে খৃষ্টানদের উপরে এই নিরোর অনেক নির্যাতন দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশের অনেকে এখন ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করে কিছু লিখতে গেলে ৫৭ ধারায় কেস খাওয়ার ভয়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। যেমন- ‘বাংলাদেশ’ এর দুর্নীতির কথা না বলে ‘উগান্ডা’ নামক দেশের বিভিন্ন দুর্নীতির কথা বলেন। কিংবা বাংলাদেশের সরকার প্রধানের কথা না বলে ‘উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন’ এর কথা বলেন।

সেন্ট ইউহান্না ও সেই সময়ে সরাসরি কাইজার নিরোর নাম না লিখে বুক অফ রিভিলেশনে ৬৬৬ কোড নাম ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ‘কাইজার নিরো’ অক্ষরগুলার সাংখ্যিক মান হল ৬৬৬ (যেমন- বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম এর সাংখ্যিক মান ৭৮৬)।

অর্থাৎ, ৬৬৬ বা এন্টিক্রাইস্ট হল রোম দেশের রাজা- নিরো। তার সাথে যুদ্ধ করার জন্য পাঠানো হয়েছে যিশুর প্রতিনিধি- সেন্ট ইউহানাকে। এটাই বুক অফ রিভিলেশন এর সামারি।

তবে অনেকেই এই ব্যাখ্যা মানতে চায় না। ডুমস ডে কাল্টের নেতারা নিজেদের মন মতো দেশের রাজা বা কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তিকে ৬৬৬ মনে করেন। নিজেদেরকেই যিসাস বা মেসায়া দাবি করেন। এভাবেই গড়ে তোলেন নিজেদের ডুমস ডে কাল্ট।

খৃষ্টান ধর্ম বাদে অন্যান্য অধিকাংশ ধর্মেও কেয়ামত/ ডুমস ডের কনসেপ্ট আছে। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে অন্য ধর্মেও অনেক ডুমস ডে কাল্ট কিংবা একই ধরনের সংগঠন গড়ে উঠেছে। অনেক কাল্ট আবার একাধিক ধর্ম বিশ্বাস রিমিক্স করেও গড়ে উঠেছে।

স্যাক্রেড গেমস টিভি সিরিয়ালেও এইরকম একটা কাল্পনিক ডুমস ডে কাল্ট দেখানো হয়েছে , যেখানে গুরুজি ইন্ডিয়ার প্রধান প্রধান ধর্ম থেকে মহাপ্রলয়ের কনসেপ্ট নিয়ে নিজের মত করে নতুন কাল্ট গড়ে তুলেছেন। সেই কাল্টে সবাই ডুমস ডে’র জন্য ওয়েট করতে থাকে। ডুমস ডে যখন ঘটতেছে না, তখন তারা নিজেরাই ডুমস ডে এগিয়ে আনার চেষ্টা করে। নিজেদের ডুমস ডে ঘটানোর ক্ষমতা না থাকলে তখন ইন্ডিয়া-পাকিস্তানকে একে অন্যের বিরুদ্ধে নিউক্লিয়ার যুদ্ধ শুরু করার জন্য উস্কানি দিতে থাকে, যেন তারা ডুমস ডে শুরু করে দেয়।

মার্শাল বা জিম জোন্স এর দলের মত গণ- আত্মহত্যার ঘটনা আছে বাংলাদেশেও। ময়মনসিংহের একই ফ্যামিলির ১১জন একসাথে সুইসাইড করে ২০০৭ সালে। এরা কোনো একটা ‘আদম ধর্ম’ পালন করত। ফ্যামিলির প্রধান পুরুষ, বাবা, আনোয়ার আদম ছিলেন এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা । তিনি অন্যদের মাঝে তার বিশ্বাস ছড়িয়ে দেন। বাবা মারা যান ২০০০ সালের ১১ই জুলাই। এরপর বাকি ফ্যামিলি মেম্বর রা আনোয়ার আদমের সাথে মিলিত হতে চাইত। বাসার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ধ্যানের মাধ্যমে আনোয়ার আদমের আত্মার সাথে তারা যোগাযোগ করার চেষ্টা করত। অবশেষে ,২০০৭ সালের ১১ই জুলাই তারা একসাথে সবাই রেললাইনে চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যা করে।

মৃত্যুর আগে তারা বাসায় সবাই আলাদা আলাদাভাবে ডায়েরি লিখে রেখে গিয়েছিল। সেই ডায়েরিতে তারা মৃত্যুর কারন, আদম ধর্ম, কেয়ামত এবং আনোয়ার আদমের সাথে মিলিত হওয়ার কথা জানিয়েছে। বেচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে তারা বেশি ভাল বলে মনে করেছিল । তাদের কাছে মৃত্যু মানে ছিল এক নতুন জীবনের শুরু, যে জীবনে তারা তাদের পছন্দমত সব কিছু পাবে।

সাইকোলজিস্ট নাসিমা সেলিম এই ফ্যামিলি মেম্বরদেরকে shared delusion, induced hallucination এবং Folie a family নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত বলে ডায়াগনোজ করেছিলেন।

একই ধরনের আরেকটা ঘটনা বলি। ২০১৮ সালে ভারতের দিল্লীর বুরারিতে একটি এপার্টমেন্টে ১১ জন ফ্যামিলি মেম্বরের মৃতদেহ গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রত্যেকের মুখ, চোখ ছিল স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। আদম ফ্যামিলির মত এদেরও ডায়েরি ছিল সাথে। ডায়েরির কথা থেকে জানা যায়, এইভাবে সুইসাইড করা হলে তারা আবার পুনর্জন্ম নিবে। এবং, সম্ভবত,এই শরীরেই ফিরে আসবে, এমন বিশ্বাস ছিল তাদের। তবে ডায়েরির লেখাগুলা পরিষ্কার নয়। সেখানে ক্রিয়া (রিচুয়াল) এর অনেক বেশি বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, কিন্ত কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু লেখেনি তারা।

সাইকোলজিস্টরা বলছেন, এরা shared psychotic disorder নামক মানসিক রোগে ভুগছিলেন। তবে তাদের ধর্মবিশ্বাস বা মৃত্যুর কারন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি এখনো।

৫. সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন সৌদি আরব প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার , মুশতাক মুহম্মদ আরমান খান মুন্না , নিজেকে আখেরী জমানার প্রতিশ্রুত পুরুষ অর্থাৎ ইমাম মেহেদি হিসাবে দাবি করছে। সিজোফ্রেনিয়া কিংবা Messiah Complex নামক মানসিক রোগের লক্ষনগুলোর সাথে মুশতাক খানের সকল কর্মকান্ড মিলে যাচ্ছে।

এই লোক বিভিন্ন হাদিস মিলিয়ে মিলিয়ে দেখাচ্ছে, সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি, যার কথা ধর্ম গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে। যে আলামতগুলো মিলছে, সেগুলো জোর গলায় বলছে। যেগুলো মিলছে না, সে সম্পর্কে একদম চুপ করে থাকছে।

অন্যান্য ডুমস ডে কাল্টের গুরুদের সাথেও তার অনেক মিল পাওয়া যাচ্ছে। সেও সবসময় কেয়ামত নিয়ে টেনশন করে। কেয়ামতের আলামত খোঁজে সব কিছুর ভেতরে। নিজের চিন্তাগুলো, কেয়ামত সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চায়। সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে সে তার শিষ্যদের সাবধান করে দিচ্ছে বারবার। যে কোনো ভিডিওতে তার কথাবার্তার ৬০-৭০% ই থাকে কেয়ামত, ইমাম মেহেদি, দাজ্জাল, দুখান, ইয়াজুজ মাজুজ এবং কেয়ামতের অন্যান্য আলামত সংক্রান্ত।

মার্শাল এ্যাপল হোয়াইট এর মতো সেও মহাজাগতিক ঘটনার ভিন্ন অর্থ খোঁজে। সুরাইয়া তারার আবির্ভাব, 1998 OR2 গ্রহানুর আগমন ইত্যাদির সাথে সে কেয়ামতের আলামত মিলাচ্ছে।

তার শিষ্যদের সাথে মুশতাক খানের কথাবার্তার কিছু অডিও ফাঁস হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সে তার শিষ্যদের গোপনে সংগঠিত হতে বলছে। সৌদি আরবে অলরেডি ৩০০ জন শিষ্য সংগ্রহ করে ফেলেছে, ভিডিওতে এমনটাই দাবি করেছে। বাংলাদেশ থেকে ১৭ জনের একটি দল তার বাহিনীতে যোগ দিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে সম্প্রতি।

গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে, তারা ইমাম মাহাদির সৈনিক হিসেবে জিহাদ করতে যেতে চেয়েছে। এই জেহাদে মৃত্যু হলে হোক, সমস্যা নেই, এমন মৃত্যু তাদের কাছে খুব সম্মানের। সেটাই তারা চায়।

এই মুশতাক খানকে দ্রুত না থামানো গেলে সে কি আরো শিষ্য জোগাড় করে আরেকটা ডুমস ডে কাল্ট গঠন করে ফেলতে পারে? মার্শাল এ্যাপল হোয়াইট, জিম জোন্স, ডেভিড কোরেশ, শোকো আশারা বা ভগবান রজনীশ ওশোর মতো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করতে পারে? আপনি কী মনে করেন? এগিয়ে চলো

সর্বশেষ নিউজ