২৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০, সোমবার

সব দোষ কি শুধু বিএনপি-জামায়াতের?

তাদের ভাষায়- ‘নাস্তিক ব্লগারদের সাজা এবং ইসলাম ধর্মের অব’মাননাকারীদের কঠোর সাজার বিধান সহ ব্লাসফেমি আইন’ করার দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামের একটি সংগঠন তাদের ‘লং মার্চ’ শেষে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্তরে সমাবেশে করে। সারাদেশ থেকে আসা হাজার হাজার মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক ও কিছু কট্টর আওয়ামী লীগ বিরো’ধী মানুষ এতে যোগ দেয়। ফলে মতিঝিল শাপলা চত্বরকে ঘিরে চারপাশের এলাকা বিরাট এক জনসমূদ্রে পরিণত হয়। মহাসমাবেশ ডেকেছিল তবে শনিবার শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতারা ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করে সেগুলো মেনে নেয়ার জন্য পরবর্তী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরো’ধী কু-খ্যাতরা, যাদের সামর্থ্য ছিল তারা অধিকাংশই পালিয়ে বিদেশে চলে যায়। যারা টাকা পয়সা নিয়ে পালাতে পারেনি কিংবা বিদেশে যাবার ভিসা ম্যানেজ করতে পারেনি তারা অধিকাংশই নিজ এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজের নাম পরিবর্তন করে দাড়ি রেখে টুপি পরে ইসলামের মেকি সেবক হয়ে ব্যবসা শুরু করে। বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসার সাথে যুক্ত হয়ে যায়। বাকীরা অধিকাংশই অ’নৈতিক ব্যবসা শুরু করে কিংবা কর ফাঁকি দিয়ে টাকা পয়সার মালিক হয়ে যায়।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট সপরিবারের বঙ্গবন্ধুকে হ’ত্যার পরে যারা দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়েছে, ফাঁ’সি বা বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরি’মানা হয়েছিলো যাদের, তারা জেল থেকে ছাড়া পায় জিয়ার বদৌলতে। স্বাধীনতাবিরো’ধীদের অধিকাংশই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসা বাণিজ্যের নামে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তাদের আওলাদরা কাজ পায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে, আদালতে, সেনাবাহিনীতে, পুলিশে, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায়, বিদেশি দাতা সংস্থা, দেশী বিদেশী দূতাবাসে। বলতে গেলে সমাজের সবখানেই তারা তাদের শক্ত ভিত গড়ে নেয়। যারা ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে বিদেশে গিয়েছিলো, তারাও বিদেশে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করে নেয়। এদের একটি বড় অংশ যায় ব্রিটেনে আরেকটি দল যায় আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

দুই একটি উদাহরণ দিই এই প্রসঙ্গে। কুষ্টিয়ার কু-খ্যাত রাজাকার চিকন আলীর ফাঁ’সির আদেশ হলেও তা কার্যকর হবার আগেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহ’ত হন। যার সুবাদে সে পরে মুক্তি পায়। কুষ্টিয়ার আরেক রাজাকার নেতা এডভোকেট সা’দ আহাম্মেদের ৩১ বছরের জেল হলেও পরে তার জেল খাটা লাগেনি। তার লু’টের টাকায় ‘রিজিয়া সা’দ ইসলামিক সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেখানে এলাকার রাজাকার ও তাদের আওলাদদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা হয়। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার জামায়াত নেতা জ্বালানি কাঠ ব্যবসায়ী কসাই সিরাজ এখন ঢাকার বড় ব্যবসায়ী। নোয়াখালীতে ১৯৭১ সালে খু’ন, ধ**ণের জন্য কু-খ্যাত রাজাকার কমান্ডার কালাম এখন সাভারের কোটিপতি ব্যবসায়ী মনসুর সাহেব। একই জেলার খু’ন, ধ**ণ, অগ্নি-সংযোগের নায়ক রাজাকার আবুল কালাম আজাদ এখন ঢাকার আদম ব্যবসায়ী এ কে আজাদ। মাগুরার রাজাকার কমান্ডার রেজাউল করিম রিজু এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক। টাঙ্গাইলের কু-খ্যাত রাজাকার আ ন ম শহীদুল্লাহ পরে হয়েছিল জেলা আওয়ামী লীগের নেতা। এ সবই বিশাল তালিকার একটা খণ্ডিতাংশ মাত্র।

২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর এক নারী বাদী হয়ে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় প’র্নগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় ইটিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমানের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ইটিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামের স্বীকারো’ক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে কনক সারওয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকেও ওই একই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। তালিকাভুক্ত রাজাকার নুর হোসেনের পুত্র শিবির নেতা ইলিয়াস হোসেন দেশ থেকে পালিয়ে যান যখন ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর একুশের চোখ অনুষ্ঠানে বিমানবন্দরে সোনা চোরা কারবার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। তাতে মানহা’নির অভিযোগ তুলে হাসান উল হায়দার মামলাটি করেন। এই মামলায় ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ইলিয়াস হোসেনের ৬ মাস এবং অখিল পোদ্দারের ৩ মাসের জেলের আদেশ হয়েছে। রায়ের সময় উপস্থিত অখিল পোদ্দারকে আপিলের শর্তে জামিন দেন বিচারক। ইলিয়াস হোসেনকে পলাতক দেখিয়ে রায় ঘোষণা হয়।

চার জন সাংবাদিক এখন আমেরিকায় অবস্থান করে সরকারের বিরু’দ্ধে আধা সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ দিয়ে বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, বর্তমান সরকারের বিরু’দ্ধে নানারকম নোং’রা ভাষায় ইউটিউবে ভিডিও প্রচার করে দেশের মানুষের মাঝে হিং’সা বিদ্বে’ষ, আর অ’স্থিরতা তৈরির কাজে নিয়োজিত আছে। ৪ জন সাংবাদিকের মধ্যে মুশফিকুল ফজল আনসারী অর্থ যোগান ও সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করছে। ইলিয়াস হোসেন রাজনীতি নিয়ে দেশের মানুষের মাঝে ভারতবিদ্বে’ষ ছড়াতে ইউটিউবে কনটেন্ট প্রচার করে খুব বা’জে ভাষায়। অন্যদিকে কনক সারোয়ার চায় দেশে সেনাবাহিনীর মাঝে অ’সন্তোষ সৃষ্টি হউক বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে হউক বেসামাল আর মন্ত্রীদের নানা কাজের সমালোচনা করা, যদিও তার একটা ইউপি চেয়ারম্যান হবার যোগ্যতা নেই। অন্য দিকে জনকণ্ঠের লোগো নিয়ে নিজের পরিচিত তৈরী করা মনির হায়দার নানা ধরণের কাল্পনিক দুর্নীতির গাল গল্পেভরা মুখরোচক পোস্ট ছাড়েন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এরা সবাই আদতে শিবিরের প্রোডাক্ট।

দুই একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। গত ২৭ জুন একটি ছবি বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে যা বর্তমানে ভাইরাল হয়েছে। ছবিটি শেয়ার করে দাবী করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসে আক্রা’ন্ত শিশুকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করতে না পেরে বাবা তাকে কোলে নিয়ে মুগদা হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে বসে পড়েছে। হাতে একটি ব্যাগ এবং খেলনা নিয়ে তিনি এবং শিশুটি ঘুমিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অপ’প্রচার। অথচ এই ছবিটি মিশরের এবং Fareed Kotb নামে মিশরের এক ফটোসাংবাদিক গত ঈদুল ফিতরের দিন মিশরের রাজধানী কায়রো শহরের Mohandessain district থেকে ছবিটি তোলেন। পরবর্তীতে ৮ জুন তিনি Facebook-এ ছবিটি শেয়ার করে বড় একটি পোস্ট দেন। লিংক- এখানে।

এই ছবিটি বাংলাদেশে ভাইরাল করা শুরু করে ২৭ জুন মিরসরাই নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নামের একটি Facebook group. যদিও পরে এই ফেইক পোস্ট সরিয়ে নেয়া হয়। তবে পোষ্টটি delete করার আগেই ১০০০ এর বেশী মানুষ react করে এবং প্রায় ১০০ শেয়ার হয়। এর পর “সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন সমর্থকগোষ্টি” নামের একটি ফেসবুক পেজ মিশরের ছবিটি ভাইরাল করার কাজে যুক্ত হয়। এটি তার লিংক। এই পেজের পোস্ট ১০৯ জন শেয়ার করে এবং ৫০২ জন react করে।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর হ’ত্যাকাণ্ড নিয়ে উল্লাস করা স্বঘোষিত রাজাকার হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা জেলার ১৯৭১ সালের রাজাকার নুর হোসেন। দেশ স্বাধীন হবার পরে দালাল আইনে চুয়াডাঙ্গায় যে ১১৬ জন কু-খ্যাত রাজাকার গ্রেপ্তার হয় তাদের একজন হচ্ছে ইলিয়াস হোসেনের বাবা নুর হোসেন। চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া গ্রামের জহির হোসেনের ছেলে নুর হোসেন তাদের একজন যারা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযু’দ্ধের সময় খু’ন, ধ**ণ, অগ্নি-সংযোগ ইত্যাদি জ’ঘন্য কাজের দায়ে সাধারণ ক্ষমা না পেয়ে গ্রেপ্তার হয়। আমেরিকায় পালিয়ে যাবার পর ইলিয়াস হোসেন তাই বুক ফুলিয়ে বেলে সে একজন গর্বিত রাজাকারের ছেলে।

ইলিয়াস হোসেনরা যখন অনেক মামলা মাথায় নিয়ে দেশ থেকে পালিয়েছে, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার পরেও সরকারের ভেতরে থাকা কাদের সহযোগীতায় এতো মামলার আসামী হয়েও ইলিয়াস হোসেনরা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে দেশ ত্যাগ করে বিদেশে যায়, তার জবাব কে দেবে? কারা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনে রাজাকার বিএনপি আর লু’টেরাদের জায়গা করে দিচ্ছে কামিনী কাঞ্চনের বিনিময়ে তাদের কি কিছুই হবে না? সব দোষ কি শুধু জামায়াত বিএনপির?

সুত্রঃ বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া।

লেখক: সায়েদুল আরেফিন
পরিচিতি: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

সর্বশেষ নিউজ