২২, সেপ্টেম্বর, ২০২০, মঙ্গলবার

যে কারণে চীনের ঋ’ণের জালে পাকিস্থান-শ্রীলঙ্কার মত আটকাবে না বাংলাদেশ

অনেকেই প্রশ্ন করেন, চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) কি বাংলাদেশের জন্য হু’মকি? আসুন এর উত্তর খোঁজা যাক।

BRI এর অধীনে চীন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই বিনিয়োগ নিয়ে চীনের বিরু’দ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মূল কারণ হল শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, পাকিস্থানের গোয়াধর বন্দর, জাম্বিয়ার বিমানবন্দর, জিবুতির অবকাঠামোসহ বিভিন্ন দেশে চীনের বিনিয়োগের পর সেসব দেশ ঋ’ণের কিস্তি প্রদান করতে না পারায় অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ চীনকে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক একই রকমের হু’মকি অনেকেই দেখছেন। এজন্য সতর্ক হবার পরামর্শও দিচ্ছেন। কিন্তু আজ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে BRI নিয়ে আলোচনা করব।

একপেশেভাবে চীনের BRI প্রজেক্টগুলো যে প্রশ্নবি’দ্ধ অথবা এটা আর্থিকভাবে লাভজনক না- সেটা কিন্তু নয়। বরং একেক দেশের প্রেক্ষাপটে BRI প্রজেক্টগুলো একেক রকম অর্থনৈতিক বেনিফিট নিয়ে এসেছে। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের যেসব প্রকল্পে চীন যুক্ত আছে সেগুলার সাথে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান, জিবুতি বা জাম্বিয়ার সাথে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

পাকিস্থান, শ্রীলঙ্কা বা ঋ’ণের জালে আটকা পড়া অন্য দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, সেখানে যেসব অবকাঠামো করেছিল সেগুলা “field of dreams” মেথডে (build it and they will come) করেছিল। সোজা কথায় “আগে অবকাঠামো করো, এরপর কাস্টমার এমনিতেই আসবে” এরকম একটা ধ্যান ধারণা কাজ করেছিল। কেন এই কথা বলছি?

পাকিস্থান বা শ্রীলঙ্কার দিকে তাকান। কলোম্বো বন্দরের ফুল ক্যাপাসিটির ৪০% তারা ব্যাবহার করতে পারেনা। বাকি ৬০% এর ক্যাপাসিটি থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যবহারকারী খুঁজে পায়নি। পাকিস্থানের করাচি বন্দরের ৫০% ক্যাপাসিটি ব্যাবহার হয়। ক্লায়েন্ট নেই বিধায় তারা অর্ধেক সক্ষমতাও ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু তারা মোটামুটি একটি স্বপ্নের মত ধরে নিয়েছিল যে, হাম্বানটোটা বা গোয়াধর বন্দর করলে কাস্টমারের অভাব হবে না। ভবিষ্যতে কোটি কোটি ডলার আয় হবে।

কিন্তু তাদের স্বপ্নটা সত্যি হয়নি। আসেনি কাস্টমার। ব্যবহারকারী বাড়েনি, বন্দরগুলো কানেক্টিং হাব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তাদের ঋ’ণ নিয়ে বিনিয়োগ তো হয়ে গেছে। সুদ সমেত সেটা ফেরত দিতে হবেই। উপায় না পেয়ে চীনের হাতেই তুলে দিতে হয়েছে।

(এখানে কেউ উল্টা-পাল্টা ভূগোল বুঝায়েন না যে, পাকিস্থান হবে আফ্রিকার গেটওয়ে, গোয়াধর দিয়ে কোটি কোটি টন পণ্য হ্যান্ডেল হবে। এই হবে শব্দটার ফাঁ’দে পড়েই তাদের এই পরিণতি। যেদিন হবে সেদিন বইলেন যে, হয়েছে। এর আগে বইলেন না)

অন্যদিকে BRI এর গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ভেতর রয়েছে- পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল এবং বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন। যদিও পদ্মা সেতুতে চীনের অর্থায়ন নেই কিন্তু BRI এর কানেক্টিং গোলের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিন্তু পাকিস্থানের মত বা শ্রীলঙ্কার মত ভবিষ্যতে ক্লায়েন্ট আসলে চালু হবে- এরকম স্বপ্ন ছিলনা। বরং বাস্তবতা ছিল যে, বাংলাদেশ বাইরের ক্লায়েন্ট নয়, বরং বর্তমান অবকাঠামোতে নিজেদের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর তার ফুল ক্যাপাসিটির থেকেও অতিরিক্ত পণ্য হ্যান্ডেল করে যাচ্ছে। মোংলা শ্যালো ওয়াটার বন্দর হবার কারণে এখানে চাইলেও বড় জাহাজ ভেড়াতে পারছে না। এরপরেও মোংলা দিয়ে গাড়ি, টায়ার এবং অন্যান্য কিছু পণ্য আমদানি করে চট্টগ্রামের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাই আমাদের বন্দর বাইরের ক্লায়েন্টের জন্য বসে নেই। আমাদের ক্রমবর্ধমান ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি রপ্তানির চাপ স্বাভাবিক রাখার জন্যই প্রয়োজন।

কিন্তু এখানেও বাংলাদেশ বেশ সতর্ক ছিল। চীনকে সোনাদিয়া দেয়নি। সেটার দাবি মিটিয়েছে পায়রা বন্দরে চীনকে অন্তর্ভূক্ত করে। BRI-এ পায়রা বন্দর নিয়ে কোন প্রকার ভাবনা নেই। এখানে বন্দর ঘিরে আমাদের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্যই এলএনজি টার্মিনাল, পাওয়ার প্ল্যান্ট গড়ে উঠছে। অর্থাৎ এসব প্রকল্প আমরা অন্য দেশ ব্যাবহার করবে- এই স্বপ্নের চাইতে নিজেদের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যেই নিয়েছি। কারণ আমাদের বর্তমান অবকাঠামো এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।

এখানে একটা ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ঝুঁ’কিটাকে বহুমুখী করেছে। যেটাকে আমরা বলি Risk Diversification। অর্থাৎ আমরা শুধু একটি উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হইনি। বরং আমরা সুন্দরভাবে ব্যালেন্স করেছি।

আমরা বৈদেশিক ঋ’ণের উৎসগুলোকে চীননির্ভর করিনি শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান বা আফ্রিকান দেশগুলোর মত। ঋ’ণঝুঁ’কি আমরা শেয়ার করেছি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ আরো অনেক উৎসের সাথে।

এখানে জাপানের কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশ জাপানের “BIG-B” Bay of Bengal Industrial Growth Belt Strategy এর অধীনে বিনিয়োগ এবং ঋ’ণ নিচ্ছি। যার মাধ্যমে আমরা মাতারবাড়িতে বন্দর, বিদ্যুৎ হাব, এলএনজি টার্মিনাল, ইকোনমিক জোন নির্মাণ করছি।

তাই আমাদের ঝুঁ’কি শুধু চীনকেন্দ্রিক নয়। ব্যালেন্সিংয়ের কারণেই আমরা চীনের ঋ’ণের ফাঁ’দে পড়ব না। সেই সাথে আমাদের বৈদেশিক ঋ’ণ ৩১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইকোনমির বিপরীতে মাত্র ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মত। যেটা বিশ্বের বুকে কম ঋ’ণগ্রস্ত দেশের মধ্যে আমাদেরকে স্থান করে দিয়েছে।

অনেক বড় লেখা হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা আরো বিশদভাবে ব্যাখ্যার দরকার ছিল। কিন্তু সেটা আপাতত সম্ভব না।

শেষ কথা হল, বাংলাদেশ হলো একটা বাঘ, যাকে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এই শিকলগুলো হলো- দুর্নীতি, দুর্বল অবকাঠামো। যেহেতু দুর্নীতি বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই আজ পর্যন্ত বর্তমান, তাই এটা একটা কমন ফ্যাক্টর। কিন্তু অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে বাঘ শিকল ছিঁড়ে হুং’কার দিয়ে লাফ দিতে পারছে না। আটকে যাচ্ছে আমাদের আমদানি রপ্তানির অ’পর্যাপ্ত বন্দর সুবিধার কারণে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য দেশের অনেক অঞ্চল এখনো বিচ্ছি’ন্ন। তবে BRI প্রজেক্টগুলো হলে শিকল ছিঁড়বে। গর্জন শুনবে সারা বিশ্ব।

ছোট করে আরেকটি বিষয় বলতে চাই। ভারতের জন্য BCIM চীনের BRI প্রজেক্ট থেকে বাদ পড়েছে। যদি এটি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে দুটি বৃহৎ অর্থনীতি ভারত এবং চীনের মাঝে কানেক্টিং হাব হয়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু আমাদের উত্থান কেউ থামাতে পারবে না।

লেখক: ওয়াসিমাহিন, ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম

সর্বশেষ নিউজ