২২, সেপ্টেম্বর, ২০২০, মঙ্গলবার

রাজনীতিতে খালেদার আর আপন কেউ নেই!

খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন অনেকটা নাটকীয়ভাবে। জিয়াউর রহমানের মৃ’ত্যুর পর প্রথমে বিএনপির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। কিন্তু তার নেতৃত্বে বিএনপি ক্রমশ সঙ্কুচিত এবং বি’ভক্ত হতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরার জন্যে বিএনপির একটি অংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে।

সেই সময় খালেদা জিয়া কিছু মানুষের ওপর বিশ্বাস এবং আস্থা রেখেছিলেন। যারা সে সময়ে খালেদা জিয়াকে পরিচালিত করতেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশ্বস্ত লোকদের পরিবর্তন হল। কয়েকজন মানুষ ছিল যারা খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক বিশ্বস্ততার এবং নির্ভরতা হিসেবে দলের ভেতর ছিলেন। এ কারণে তারা দলে প্রভাবশা’লীও ছিলেন। কিন্তু এখন খালেদা জিয়া রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার অবস্থায়, রাজনীতিতে তার আর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সে সময় তিনি যাদের ওপর নির্ভর করতেন, যাদের কথায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন, তারা আসলে এখন কেউ-ই বিএনপিতে নেই বা বিএনপিতে থাকলেও নীতিনির্ধারনী জায়গায় নেই।

খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত লোকদের মধ্যে অনেকেই মৃ’ত্যুবরণ করেছেন। তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন- সাইফুর রহমান, মেজর জেনারেল (অবঃ) এম মজিদ উল হক, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল অবসরপ্রাপ্ত মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। কিন্তু এরা চলে যাওয়ার পরও খালেদা জিয়ার একটি বিশ্বস্ত নীতিনির্ধারণী নেতাদের একটি দল ছিল যাদের কাছ থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। এদের মধ্যে কর্ণেল অলি আহমেদ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিরো’ধে জড়িয়ে দলত্যাগ করেছেন। অনেকে মনে করেন, কর্ণেল অলির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিরো’ধের মূল কারণ তারেক জিয়া। তারেকের কারণেই কর্ণেল অলি শেষ পর্যন্ত বিএনপি ছেড়েছিলেন।

এরশাদবিরো’ধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়া তরুণদের নিয়ে একটি বিশ্বস্ত বলয় তৈরি করেছিলেন। যাদের ওপরে অনেককিছু নির্ভর করতো এবং যারা খালেদা জিয়াকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করতে পারতেন। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন- মোসাদ্দেক আলী ফালু, সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াঁ, আবদুল্লাহ আল নোমানের মতো নেতারা। তারা খালেদা জিয়ার ‘কিচেন এডভাইজার’ হিসেবে বিএনপিতে পরিচিত। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তারেক যুগের সূচনা হয় বিএনপিতে। আস্তে আস্তে খালেদার বিশ্বস্ত গ্রুপ দলের ভেতরেই কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে।

২০০১ এর নির্বাচনে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তিনি ছিটকে পড়েন। পরবর্তী পর্যায়ে আবদুল্লাহ আল নোমানের অবস্থাও দলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সাদেক হোসেন খোকা ওয়ান ইলেভেনের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পর সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে একটি দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল খালেদা জিয়ার। অনেকেই মনে করেন, এই দুরত্ব তৈরির পেছনেও তারেকের ভূমিকা ছিল। তারেক জিয়া কখনই খোকার কর্তৃত্ব পছন্দ করেননি, অন্যদিকে খোকাও তারেক জিয়াকে নেতা হিসেবে মেনে নেননি।

তবে খালেদার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে দলে পরিচিত ছিলেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ফালু এরশাদ বিরো’ধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আইন পরিবর্তন করে ফালুকে একান্ত সচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া বিরো’ধী দলে গেলেও ফালুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা কমেনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে ফালু খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হলেও এই সময় থেকে বিএনপিতে ফালু কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকেন। তারেক জিয়ার কারণেই বিএনপিতে ফালুর দুঃসময় শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিক সচিব পদ থেকে বাদ দিয়ে আব্দুল মান্নানের ছেড়ে দেওয়া তেজগাঁও-রমনা আসনের এমপি করা হয়। এমপি হয়ে তিনি রাজনীতিতে অন্য সব সাধারণ নেতার মতো থাকলেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অটুট। এ কারণে বিএনপিতে তার প্রভাব বলয় ছিল। ওয়ান ইলেভেনের পর বিএনপিতে সর্বশেষ যে কমিটি হয়েছে। সেই কমিটিতে বিএনপিতে যে পদ দেওয়া হয়েছিল, তাতে ফালু খুশী না হয়ে পদত্যাগ করেন। তারপর বিএনপির রাজনীতিতে তার ভূমিকাও শেষ হয়ে যায়।

বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন যে, খালেদা জিয়ার রাজনীতির প্রতি আজকের যে অ’নাগ্রহ, তার প্রধান কারণ চারপাশে বিশ্বস্ত লোকের অভাব। কারণ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সবসময় অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এ কারণে তাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার লোক নেই। সাম্প্রতিক সময়ে একদিকে যেমন তারেকের আধি’পত্য বিএনপিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অন্যদিকে খালেদা জিয়াও রাজনীতির ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। বাংলাইনসাইডার।

সর্বশেষ নিউজ