২৬, সেপ্টেম্বর, ২০২০, শনিবার

পেঁয়াজ কূটনীতিতেও শেখ হাসিনার কাছে হেরেছে ভারত

ঘটনা-১ : তুরষ্কে বাংলাদেশ দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী করোনাকালে তুরষ্ক সফর করবেন কি না এই নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তাকে বললেন, তুরষ্কে যেতে হবে আর তিনি বাংলাদেশ থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুঝতে পারলেন না, কেন প্রধানমন্ত্রী তাকে এই সময়ে তুরষ্কে যেতে বলছেন। এই করোনার মধ্যে দূতাবাস ভবন উদ্বোধনের গুরুত্ব ও রাজনৈতিক তাৎপর্য কী! তবুও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানতেই হবে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেলেন তুরষ্কে। উল্লেখ্য, তুরষ্ক বিশ্বে অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশ এবং রপ্তানিকারকও বটে।

ঘটনা-২ : বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই ইলিশ উৎপাদনে একের পর এক রেকর্ড গড়ছে। বিশেষ করে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কিছু ব্যবস্থা, যেমন- জাটকা আহরণ বন্ধ করা, প্রজ’নন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধ করা, জেলেদেরকে এ সময়জুড়ে সরকারিভাবে চাল বরাদ্দ করা- ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে ইলিশের ফলন এখন বাড়বাড়ন্ত। স্বল্প মূল্যে যেমন মানুষ ইলিশে স্বাদ পাচ্ছে, তেমনি দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইলিশ দেশের বাইরেও রপ্তানিও করা যাচ্ছে। আর এ জন্যই ইলিশ রপ্তানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে। ভারতে ইলিশ রপ্তানি করা হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বললেন, পূজোর সময় ভারতে ইলিশের চাহিদা থাকে, কাজেই ইলিশ রপ্তানি করা হবে। গতকালই প্রথম ইলিশের চালান বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে চলে গেছে।

ঘটনা-৩ : ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হলো, তারা বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এখন থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি করা হবে না। ভারতের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সবাই অবাক হয়ে গেল। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নূন্যতম শিষ্টাচারটুকু ভুলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলো।

এই ৩টি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, শেখ হাসিনার কূটনীতিক দূরদর্শিতার কাছে কীভাবে ভারত পরাজিত হল। এর আগেও কিছু ঘটনা রয়েছে যা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশীকে ডেকে বললেন, পেঁয়াজের সং’কট হতে পারে। কাজেই এখন থেকেই পেঁয়াজ আমদানি করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী টিপু মুনশির নেতৃত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলার সিদ্ধান্ত নিল। ৫টি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ। তিনি জানতেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরের মতো এবারও ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করতে পারে। আর এ কারণেই তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীকে আগে থেকেই পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তুরস্কে পাঠিয়েছিলেন, যেন তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কটা আরও প্রগাঢ় হয়। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে তুরস্ক থেকে দ্রুত গতিতে পেঁয়াজ আনা যায়।

আবার তিনি প্রতিহিং’সার কূটনীতি না করে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পরেও ভারতে ইলিশের চালান পাঠালেন। অর্থাৎ সংকীর্ণ কূটনীতি, সংকীর্ণমনা প্রতিবেশীসুলভ রাষ্ট্রের আচরণের প্রতিবাদ তিনি করলেন উদারতা দিয়ে। এটাই হল কূটনীতির নতুন ব্যাকরণ। যা রচনা করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি কূটনীতিক শিষ্টাচার ও উদার কূটনীতির এক নতুন নজির স্থাপন করে ভারতকে কূটনীতিকভাবে পরাজিত করলেন। বাংলাদেশে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর আকস্মিকভাবে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বেশিক্ষণ থাকবে না। পেঁয়াজের ঘাট’তি থাকবে না। আগামী ২-৪ দিনের মধ্যেই চীন, তুরস্কসহ বেশ কিছু দেশ থেকে পেঁয়াজ আসবে। সেই পেঁয়াজ আসার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখন বাংলাদেশেও পেঁয়াজ আছে। কৃত্রিমভাবে যে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে তারাও দাম কমাতে বাধ্য হবে। কারণ, পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য। জমিয়ে রাখলে কোনো লাভ নেই। তাই বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল হবে।

এখানেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, আরেকটি পেঁয়াজ কূটনীতি হতে যাচ্ছে। এজন্য তিনি পেঁয়াজ রপ্তানিকারক সম্ভব্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তুরস্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়ে তিনি সম্পর্কের একটা নতুন মেলবন্ধনও তৈরী করে রেখেছিলেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্টলেডিকেও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

দ্বিতীয়ত, তিনি ভারতের সংকীর্ণ পেঁয়াজনীতির জবাব দিলেন ইলিশ উদারতা দিয়ে। এর ফলে ভারত আরেকবার শেখ হাসিনার কাছে কূটনীতিকভাবে পরাজিত হলো। যেমন- অতীতে বহুবার এভাবেই কূটনৈতিক উদারতা দিয়ে শেখ হাসিনা বিজয়ী হয়েছিলেন। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। এবার পেঁয়াজ কূটনীতিতেও তিনি দেখালেন, সংকীর্ণতা দিয়ে জয়ী হওয়া যায় না, জয়ী হতে হয় উদারতা দিয়ে। বাংলাইনসাইডার।

সর্বশেষ নিউজ