২২, অক্টোবর, ২০২০, বৃহস্পতিবার

ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নারীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক) ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসছে রাজধানীসহ সারা দেশ।

রীতিমতো নিন্দার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। বসে নেই উচ্চ ও নিু আদালতও।

বেগমগঞ্জ মডেল থানায় ৭-৮ জন অজ্ঞাতসহ ৯ জনের নামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করেছেন নির্যাতিতা।

এরই মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবার দুই আসামিকে দুই মামলায় ছয় দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

এদিকে গৃহবধূকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অপসারণ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

পাশাপাশি বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে ভিডিওটি পেনড্রাইভ বা সিডিতে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় করা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত নারী ও তার পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পাশাপাশি নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

ওই নারীর নিরাপত্তা, জবানবন্দি নেয়া, দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ সার্বিক ঘটনায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো অবহেলা আছে কি না, তা অনুসন্ধান করবে এই কমিটি। নির্যাতনের এ ঘটনা সোমবার নজরে আনার পর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. মহিউদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ এ আদেশ দেন।

তদন্ত কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া ওই ঘটনায় করা ফৌজদারি মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে ২৮ অক্টোবর আদালতকে প্রতিবেদন দিতে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শুনানিতে আদালত বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ায় টনক নড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

রোববার দুপুরের দিকে ঘটনার ৩২ দিন পর গৃহবধূকে নির্যাতনের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ পেলে তা ভাইরাল হয়- টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের।

ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্থানীয় দেলোয়ার, বাদল, কালাম ও তাদের সহযোগীরা নির্যাতিত গৃহবধূর পরিবারকে কিছু দিন অবরুদ্ধ করে রাখে।

একপর্যায়ে তার পরিবারকে বসতবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করলে পুরো ঘটনা দীর্ঘদিন স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ প্রশাসনের অগোচরে থাকে।

নির্যাতিতার জবানবন্দি : সোমবার বেগমগঞ্জ থানার সাব-ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের আবেদনে নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট নবনীতা গুহ ভিকটিমের ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

জবানবন্দি দেয়ার সময় ভিকটিম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি সন্ত্রাসীদের নাম উল্লেখ করে জানান, অপরাধীরা সব সময় তাকে কুপ্রস্তাব দিত। রাজি না হওয়ায় ঘটনার দিন এজাহারে উল্লিখিত সন্ত্রাসীরাসহ আরও ৭-৮ জন রাতে লাথি মেরে তার ঘরের দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে।

তার স্বামীকে পাশের ঘরে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তিনি বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তাকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তার বিবস্ত্র শরীরের ছবি ভিডিও করে।

এ সময় তিনি চিৎকার শুরু করলে তারা চলে যাওয়ার সময় বলে যায় কাউকে কিছু বললে তাকে মেরেই ফেলবে এবং এ ছবি ভাইরাল করে দেবে।

সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনার রেষ কাটতে-না-কাটতে রোববার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এরপর সোমবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ ও ধর্ষকদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। এসব প্রতিবাদ সমাবেশে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় সর্বস্তরের মানুষ।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের প্রতিটি নারী ও শিশু সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার মাত্রা, ধরন ও নিষ্ঠুরতা বেড়েছে বহুগুণ।

এর মূল কারণ নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ। নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতি এক দিকে নারীকে নিপীড়ন করার প্রবণতা সৃষ্টি করে, অন্য দিকে নিপীড়িত নারীকেই দোষারোপ করে।

বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তাঘাট, বাজার, কর্মস্থল ও বাড়িঘর- কোথাও আজ নারী-শিশুরা নিরাপদ নয়।

স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। অবুঝ শিশুকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এর থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে।

সোমবার সকালে মামলার ১নং আসামি বাদলকে ঢাকা থেকে ও স্থানীয় দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং লিডার ও দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আটক করে র‌্যাব-১১।

আটক বাদল (২২) একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মধ্যম একলাশপুর গ্রামের মোহর আলী মুন্সিবাড়ির রহমত উল্যার ছেলে, দেলোয়ার একই গ্রামের কামাল উদ্দিন ব্যাপারী বাড়ির সাইদুল হকের ছেলে।

এ ছাড়া একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের খালপাড় এলাকার হারিদন ভূঁইয়াবাড়ির শেখ আহম্মদ দুলালের ছেলে মো. রহীম (২০) ও একই এলাকার মোহর আলী মুন্সিবাড়ির মৃত আবদুর রহীমের ছেলে মো. রহমত উল্যাহকে (৪১) গ্রেফতার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, এ পর্যন্ত চার সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভিকটিমকে উদ্ধার করে আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে নির্যাতিত নারী বাদী হয়ে সোমবার রাতে ৭-৮ জন অজ্ঞাতনামাসহ নয়জনকে আসামি করে পর্নোগ্রাফি আইনে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেছেন। এর আগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একই থানায় ওই ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি মামলা করা হয়।

কিন্তু ঘটনার মূল নায়ক ও এলাকার কিশোর গ্যাং কমান্ডার দেলোয়ারের নাম মামলার এজাহারে আসেনি বলে এলাকাবাসী হতবাক হয়েছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয় : ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার নূর ইসলাম মিয়ার বাড়িতে গৃহবধূর (৩৫) বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে শ্লীলতাহানি করে স্থানীয় দেলোয়ার, বাদল ও তাদের সংঘবদ্ধ বখাটে যুবক দল।

ওই সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তারা তাকে বিবস্ত্র করে তার লজ্জাস্থানে হাত ঢুকিয়ে দেয় ও বেধড়ক মারধর করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে। তাদের হাত থেকে বেঁচে তিনি তার স্বামীকে নিয়ে মাইজদী শহরের হাউজিং এলাকায় তার বোনের বাসায় আশ্রয় নেন।

রোববার দুপুরে ওই সন্ত্রাসীরা তাকে ফোন করে আবারও কুপ্রস্তাব এবং হুমকি দেয়- তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে তারা মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও ভাইরাল করে দেবে।

নির্যাতিতা রাজি না হওয়ায় রোববার তারা ওই নারীর বিবস্ত্র ছবি ভাইরাল করে দেয়। এ ছবি পেয়ে সাংবাদিকরা খোঁজখবর নেয়া শুরু করলে পুলিশ প্রশাসনের টনক নড়ে।

বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি মো. হারুন উর রশীদ জানান, পুলিশ অভিযুক্ত অপর আসামিদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। আটক আসামিদের বিচারিক আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্যাতিতার পিতা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, তাদের ভয়ে এ এক মাস আমরা কাউকে কিছু বলিনি। কারণ তারা সরকারি দলের নেতা, কেউ আওয়ামী লীগের, কেউ যুবলীগের।

তাদের রয়েছে ইয়াবা বেচার নগদ টাকা, অস্ত্র, ক্যাডার বাহিনী। তারা নেতা, এমপিদের সঙ্গে ছবি তোলে, আমরা তাদের কী করব। স্থানীয় ওয়ার্ডের সোহাগ মেম্বার ও স্থানীয় ইউনিয়ন যুবলীগের চেয়ারম্যানও এ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না।

এ বাহিনী গত ৬ মাসে এলাকায় ৭-৮ জন দরিদ্র নারীকে ধর্ষণ এবং নির্যাতন করলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। এ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আগে রিপোর্ট হলেও পুলিশ তা আমলে না নেয়ায় দেলোয়ার বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তার এ বাহিনীতে রয়েছে ৫০-৬০ জনের সক্রিয় সদস্য। তারা নিজেদের আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা বলে পরিচয় দিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন দিলেও শাসক দল কখনও আপত্তি করেনি।

নেতা-এমপিদের সঙ্গে ছবি দিয়ে ব্যানার থাকায় পুলিশও তাদের সমীহ করে চলতে দেখা গেছে।

এমনকি চন্দ্রগঞ্জে পুলিশের ওপর ও একলাশপুরে ডিবি পুলিশের ওপর মাদক কারবারিরা হামলা করে পুলিশকে মারধর করে আহত করলেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকায় এসব বাহিনীর সাহস বেড়ে গেছে বলে জেলার অভিজ্ঞ মহল মনে করছে।

উত্তপ্ত নোয়াখালী : বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে গৃহবধূকে নির্যাতনের পর বিবস্ত্র ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করার প্রতিবাদে সোমবার গোটা নোয়াখালী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সকাল ১০টা থেকে জেলা শহর মানববন্ধন ও বিক্ষোভের শহরে পরিণত হয়েছে। জেলা শহরের প্রধান সড়ক, জেলা প্রশাসক অফিসের সামনে, পুলিশ সুপারের অফিসের সামনে, প্রেস ক্লাব, আইনজীবী সমিতি, জেলা জজ আদালতের সামনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা শহর।

এ সময় পুলিশ বারবার বিক্ষোভকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে বিক্ষোভ থামাতে ব্যর্থ হয়। তবে পুলিশ ছিল খুব শান্ত। সময় যত বাড়তে থাকে শহরে প্রতিবাদের বিক্ষোভের ঝড়ও বাড়তে থাকে।

রিমান্ডে দুই আসামি : গ্রেফতার হওয়া আবদুর রহিম ও রহমত উল্লাহকে নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান করে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোস্তাক আহমেদ দুটি মামলার প্রত্যেকটিতে সাত দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন।

সোমবার বিকাল ৫টায় দীর্ঘ শুনানির পর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাশফিকুল হক দুই মামলায় প্রত্যেক আসামিকে প্রতি মামলায় তিন দিন করে প্রত্যেককে ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের আদালত থেকেই আসামি আবদুর রহিম ও রহমত উল্লাহকে রিমান্ডে বুঝে নিয়েছেন বলে কোর্টের সরকারি রেকর্ড অফিসার জানিয়েছেন।

যেভাবে গ্রেফতার দেলোয়ার ও বাদল : রোববার রাত আড়াইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন চিটাগাং রোড এলাকা থেকে অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেফতার করা হয় দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে।

গ্রেফতারকৃত দেলোয়ারের দেয়া তথ্যমতে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় মূল আসামি বাদলকে।

এদিকে র‌্যাব-১১ এর একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ওই গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে মোবাইলে নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে টাকা দাবি করেছিল আসামিরা। টাকা না দেয়ার কারণেই সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, দেলোয়ারকে গ্রেফতারে র‌্যাবের একটি টিম রোববার সকালেই বেগমগঞ্জ থানায় কাজ করছিল। দেলোয়ারকে গ্রেফতার করার একটি অন্যতম সূত্র ছিল তার মোবাইল নম্বরটি।

কিন্তু রোববার রাত ১২টার পরে সে ফোনটিও বন্ধ করে দেয় সুচতুর দেলোয়ার। এরপর শুরু হয় রাতভর চিরুনি অভিযান।

র‌্যাব সূত্র জানায়, কোনো একটি যাত্রীবাহী বাসে দেলোয়ার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে- এমন সংবাদ পাওয়া যায়। কয়েকটি টিমে ভাগ হয়ে যাত্রীবাহী ও মালবাহী পরিবহনে শুরু হয় রীতিমতো চিরুনি অভিযান।

এক পর্যায়ে রাত আড়াইটার দিকে একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশির প্রাক্কালে বাসের জানালা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এক যুবক। র‌্যাব তখনও জানত না এটাই সেই দেলোয়ার।

দৌড়ে তাকে র‌্যাবের সদস্যরা ধরে ফেলেন। এ সময় দেলোয়ারের কাছ থেকে একটি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নাজমুল আলম জানান, দেলোয়ারের গ্রেফতার ছিল এই অভিযানের টার্নিং পয়েন্ট।

আমরা আশাবাদী ছিলাম মামলার মূল আসামি বাদলকেও পাওয়া যাবে। দেলোয়ারের দেয়া তথ্যমতে বাদলের এক নিকটাত্মীয়কে আমরা পেয়ে যাই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া যায় ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ নিয়েছে বাদল।

আমরা ভোরে সেখানে পৌঁছলে বাদলের থাকার ঘরটিতে গিয়ে এক যুবককে পাই। কিন্তু সে বাদল ছিল না। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি আর টিমের সদস্যদের অক্লান্ত চেষ্টায় হাতে মেলে সেই বাদল।

নাজমুল আলম জানান, পুরো দেশ সোমবার সকালে এই নরপিশাচদের গ্রেফতারের খবর শোনার অপেক্ষায় ছিল। আমরা সেই অপেক্ষা যেন দীর্ঘ না হয় সে চেষ্টাই করেছি মাত্র।

র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন জানান, আমরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এলাকার একলাশপুর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি, নির্যাতনের শিকার ওই নারীর প্রায় ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়।

তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন ওই নারী এবং তিনি তার বাবার বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে থেকে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হওয়ায় ওই নারীর বাড়িতে স্বামীর আসা-যাওয়া শুরু হয়।

গ্রেফতারকৃত বাদল ও দেলোয়ার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ওই নারীর প্রতি আগে থেকেই কুনজর ছিল তাদের। কিন্তু স্বামীর আসা-যাওয়া শুরু হওয়ায় বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারেনি।

ফলে পরিকল্পনামাফিক তারা ঘটনাটি ঘটানোর একটি ছক আঁকে। ২ সেপ্টেম্বর ওই গৃহবধূর সঙ্গে তার স্বামী দেখা করতে এলে তাকে অপরিচিত লোক দাবি করে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ তোলে দেলোয়ার বাহিনী।

তার স্বামীকে বেঁধে রেখেই চলে সেই পাশবিক নির্যাতন ও ভিডিও ধারণ। বিষয়টি জানাজানি যাতে না হয় সেজন্য ওই নারীর পুরো পরিবারকে দেলোয়ার বাহিনী ওই বাসাতেই পরের দিন আটকে রাখে এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেয় ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

কিছু দিন পর তারা ওই নারীর পরিবারের কাছ থেকে টাকাও দাবি করা শুরু করে। পাশাপাশি এক মাস ধরে তারা এ ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিচ্ছিল। অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়।

অপর দিকে নারায়ণগঞ্জের আদমজীনগর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব-১১ অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম জানিয়েছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাদল ও দেলোয়ার বেশকিছু তথ্য দিয়েছে। ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আটককৃতরা।

‘দেলোয়ার বাহিনী’ ওই এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং নানা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত এবং দেলোয়ার এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে এলাকার লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত।

দেলোয়ারের বিরুদ্ধে এর আগে দুটি হত্যা মামলা আছে। আইন মোতাবেক গ্রেফতারকৃত বাদলকে নোয়াখালীর আদালতে ও দেলোয়ারকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হবে।

সর্বশেষ নিউজ