২২, অক্টোবর, ২০২০, বৃহস্পতিবার

গ্লোবের করোনা ভ্যাকসিন প্রাণীর দেহে কার্যকর

গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের উদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিন ‘ব্যানকোভিড’ অ্যানিমেল ট্রায়ালে নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখন সরকারের সহায়তা পেলে ভ্যাকসিনটি মানবদেহে পরীক্ষা চালানোর জন্য তারা প্রস্তুত।

সরকারের সার্বিক সহযোগিতাসাপেক্ষে আগামী জানুয়ারি মাসেই কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন বাজারে আনতে চায় গ্লোব বায়োটেক। এটি গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছে গ্লোব বায়োটেক কর্তৃপক্ষ।

তারা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। এই সংক্রমণে ডি৬১৪জি ভ্যারিয়েন্ট শতভাগ দায়ী বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদও (বিসিএসআইআর) বাংলাদেশে সংক্রমণের জন্য ডি৬১৪জি ভ্যারিয়েন্টকে দায়ী বলে নিশ্চিত করেছে।

গ্লোব বায়োটেকের নিজস্ব পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত ব্যানকোভিড ভ্যাকসিনটি ডি৬১৪জি ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র আবিষ্কৃত টিকা। প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যার বিস্তারিত ফলাফল বায়ো-আর্কাইভে প্রি-প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। মাত্র ৬ সপ্তাহে বায়ো-আর্কাইভে ৫ হাজার ৮৫টি গবেষণাপত্র জমা পড়েছে। যার মধ্যে ৬৯তম গবেষণা হিসেবে গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করেন গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের সিইও ড. কাকন নাগ। এ সময় আরও বক্তব্য দেন গ্লোব বায়োটক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশীদ।

ড. কাকন বলেন, বর্তমান বিশ্বে ৬৬টি ভ্যাকসিন ডেভেলপের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৪৪টি ভ্যাকসিন ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। গ্লোব বায়োটেক mRNA প্রযুক্তি ব্যবহার করে mRNA-LNP-তে রূপান্তির করে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। অ্যানিমেল ট্রায়ালে প্রমাণ হয়েছে এই ভ্যাকসিন শরীরে কোনো বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এমনকি রক্তেও কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। গ্লোব আবিষ্কৃত ব্যানকোভিড যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের সমপর্যায়ের বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, এটি প্রয়োগে স্বল্পসময়ে প্রাণীদেহে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রমাণ মিলেছে।

ড. কাকন বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে একটি শক্তিশালী কার্যকর ভ্যাকসিন প্রয়োজন। বিশ্বকে করোনামুক্ত করতে হলে প্রায় ৭ বিলিয়ন ভ্যাকসিন প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা মাত্র দেড় বিলিয়ন। যদিও এই উৎপাদনক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে ইতোমধ্যে ৩ বিলিয়ন করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

আমাদের দেশ ভ্যাকসিনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাত্র ৩ শতাংশ ভ্যাকসিনের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। অথচ দেশের কমপক্ষে ৬০-৭০ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্লোবকে সুযোগ দেয়া হলে সবার আগে আমাদের দেশের মানুষের ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ভ্যাকসিনটির নামকরণ প্রসঙ্গে গ্লোব বায়োটেকের সিইও ড. কাকন নাগ বলেন, তাদের উদ্ভাবিত ব্যানকোভিড (BANCOVID) নামের ইঅঘ একইসঙ্গে বাংলাদেশ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামকে প্রতিনিধিত্ব করে। যা করোনাকে ব্যান বা প্রতিহত করতে সক্ষম। দ্রুততম সময়ে ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীর সেবায় ব্যানকোভিডকে উন্মুক্ত করারও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ বলেন, আমার দৃষ্টিতে এই বাংলাদেশ আজ যে জায়গায় এসেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া এটা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব না। তার ঐকান্তিক চেষ্টায় বাংলাদেশ এই পর্যায়ে এসেছে। আমার আশা করি, আমাদের ভ্যাকসিনটা দ্রুত ফেস-১, ফেস-২-এ নিয়ে যেতে সরকার সহায়তা করবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত বড় কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা অসম্ভব। আমেরিকা থেকে অনেক বিজ্ঞানী আমাদের ফোন করেছেন। তারা বলেছেন: এক্সিলেন্ট, তুলনা করার মতো নয়।

এখানে যে ডেটা তৈরি ব্যবহার করা হয়েছে, এত ডেটা ব্যবহার করার দরকার ছিল না। যেহেতু আমরা গরিব দেশ, এই দেশে যে ভ্যাকসিন বানাতে পারবে-এটা বড়। প্রথমে তো অনেকে বিশ্বাসই করেনি। আমরা বাংলাদেশে অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। এই ভ্যাকসিন পৃথিবীর অন্যতম ভ্যাকসিনের মধ্যে একটা হবে। সরকার ফ্রি অব কস্টে এটা জনগণকে দিতে পারবে। আমাদের যদি সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে ১৮ কোটি জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

সবাই মিলে চেষ্টা করলে আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে সারা বাংলাদেশে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু করতে পারব। এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়: এই ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য কন্ট্রাক রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিআরও)-এর সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রোটোকল তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি, শিগগির বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে (বিএমআরসি) আবেদন করা যাবে।

বিএমআরসি নৈতিক ছাড়পত্র অনুমোদনসাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কাছে প্রোটোকলসহ ট্রায়াল শুরুর আবেদন করা যাবে। দাম প্রসঙ্গে তারা বলেন, এখনই এটির দাম নির্ধারণ সম্ভব নয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে উৎপাদনে গেলেই দাম বলা সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আরও বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ডিন ড. এসএম আতিউর রহমান, ডা. নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান, এফডিআরএসের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ প্রমুখ।

সর্বশেষ নিউজ