১৫, অক্টোবর, ২০২০, বৃহস্পতিবার

টাঙ্গাইলে অপহরণের পর গণধর্ষণের দায়ে পাঁচ যুবকের মৃত্যুদন্ড

ইমরুল হাসান বাবু, টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ছাব্বিশা গ্রামের নবম শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে অপহরণের পর গণধর্ষণের দায়ে পাঁচ যুবককে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক খালেদা ইয়াসমিন এ রায় দেন। একই সঙ্গে দ-িত প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি ‘মৃত্যুদ-‘ করে অধ্যাদেশ জারির পর এটাই প্রথম ফাঁসির রায়।
মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হচ্ছেন, টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গোলাবাড়ি গ্রামের সুনিল চন্দ্র শীলের ছেলে সাগর চন্দ্র শীল(৩৩), দিগেন চন্দ্র শীলের ছেলে গোপি চন্দ্র শীল(৩০), চারালজানি গ্রামের বাদল চন্দ্র মনিঋষির ছেলে সঞ্জিত চন্দ্র মনিঋষি(২৮), সুনিল চন্দ্র মনিঋষির ছেলে সুজন চন্দ্র মনিঋষি(২৮) এবং মনিন্দ্র চন্দ্র মনিঋষির ছেলে রাজন চন্দ্র মনিঋষি(২৬)।
রায় ঘোষণার সময় তাদের মধ্যে সঞ্জিত চন্দ্র্র মনিঋষি ও গোপি চন্দ্র শীল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাকি তিন আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সরকারি কৌশুলী (পিপি) একেএম নাছিমুল আক্তার নাছিম জানান, বিগত ২০১২ সালে সাগর শীলের সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভূঞাপুরের চরঅলোয়া দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির এক মুসলিম ছাত্রীর পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে ওই বছরের ১৫ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে শালদাইর ব্রিজের কাছে পৌঁছলে সাগর শীল এশটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ে এসে ওই ছাত্রীকে কৌশলে মধুপুরে নিয়ে যান। সাগর শীল মধুপুরের চারালজানি গ্রামে রাজন মনিঋষিদের বাড়িতে নিয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় মেয়েটি বিয়েতে রাজি না হওয়ায় সাগর তাকে ধর্ষণ করেন। পরে সেখানে মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়। দুই দিন আটকে রেখে ১৭ জানুয়ারি রাতে মধুপুরের বংশাই নদীর তীরে নিয়ে মেয়েটিকে সাগরসহ পাঁচজন মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তারা ওই মাদ্রাসা ছাত্রীকে সেখানে ফেলে রেখে পালিয়ে যান। পরদিন (১৮ জানুয়ারি) সকালে স্থানীয়রা মেয়েটিকে উদ্ধার করে। পরে তার অভিভাবকরা এসে তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। ওইদিনই (১৮ জানুয়ারি) ওই ছাত্রী নিজে বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে ভূঞাপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের দিনই পুলিশ আসামি সুজন মনিঋষিকে গ্রেপ্তার করে। ১৯ জানুয়ারি সুজন মনিঋষি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে অন্য আসামিরাও গ্রেপ্তার হন।

ভূঞাপুর থানার পুলিশ তদন্ত শেষে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করার পর ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
তিনি আরও জানান, এ মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মামলার বাদী(ভিকটিম) সহ মোট ১০জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ রায় দিলেন আদালত।
মামলায় বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ছিলেন, অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ও গোলাম মোস্তফা মিয়া। আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা মিয়া রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, রায়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ন্যায় বিচার পেতে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আতাউর রহমান আজাদ জানান, মামলার বাদীকে সংস্থার পক্ষ থেকে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি জানান, রায়ে তারা সন্তুষ্ট। তারা ন্যায় বিচার পেয়েছেন।

ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউপি চেয়ারম্যান রইজ উদ্দিন আকন্দ জানান, অপহরণের পর দলবেঁধে ধর্ষণের ওই ঘটনায় ফাঁসির আদেশটি একটি যুগান্তকারী রায়। এ রায়ে তারা সন্তুষ্ট ও উৎফুল্ল। মাত্র ক’দিন আগে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করায় ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মধুপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শরীফ আহমেদ নাসির জানান, মধুপুরের চারালজানি ও গোলাবাড়ি গ্রামের শীল ও ঋষি পরিবারের পাঁচ যুবকের মৃত্যুদ-ের রায় হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গণধর্ষণের ঘটনায় মৃত্যুদ- হওয়ার যুগান্তকারী এ রায়কে স্বাগত জানান তিনি।

সর্বশেষ নিউজ