২৮, নভেম্বর, ২০২০, শনিবার

ধর্ষণের ঘটনায় সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা!

একটি দেশের সমাজ ব্যবস্থায় কতটা ভাঙ্গন ও অধপতন হলে ধর্ষণের মত জঘন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন খুবই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। পত্র-পত্রিকায় চোখ বুলাতেই পাঠক সমাজ আঁতকে উঠেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি জরিপ দেখে রীতিমত হতবাক হলাম! তাদের মতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১ হাজার ৪১৩ জন। যা গতবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন (গতবছর এ সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭৩২ জন)। অন্য একটি সূত্র বলছে, দেশে প্রতি ১ লাখে ১০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন(ডিডাব্লিউ)। এটাতেই ক্ষান্ত হওয়ার কোন কারন নেই; চমকে উঠার মত আরো কিছু বাকী আছে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন প্রায় ৬০১ জন নারী ও শিশু। বছর শেষে এই সংখ্যাটি কোথায় গিয়ে দাড়াবে সেটা ভাবতেই ইচ্ছা করছে না।

কেনই বা দেশে ধর্ষকদের এত দৌরাত্ম? তবে কি ঘুণে ধরা সমাজের জীর্ণশীর্ণ মেরুদণ্ডটিও ভেঙ্গে পড়েছে, নাকি রাষ্ট্রের অচলায়তনের ফলাফল এটি? পরবর্তী প্রজন্মের ধিক্কারের হাত থেকে কিছুটা বাঁচার দায়বদ্ধতা থেকেই এর কারণ অনুসন্ধানে নেমে পড়েছিলাম। যা দেখলাম তা আরো লৌমহর্ষদ্দীপক। ২০১০ সালে জাতিসংঘ, এশিয়া প্যাসেফিক অঞ্চলের ৬ টি দেশের মধ্যে একটি জরিপকালে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, শহর ও গ্রামভেদে আত্মস্বীকৃত নির্যাতকদের ৭৭ থেকে ৮১ ভাগই মনে করেন; যৌন-সম্ভোগ পুরুষের অধিকার, ধর্ষণ তারা করতেই পারেন। অবাধ পুরুষতান্ত্রিকতার ভয়াল থাবায় সামাজিক-মুল্যবোধ আজ নিষ্পেষিত। এহেন অসুস্থ সমাজে বেড়ে উঠা পরবর্তী প্রজন্মেও এই রোগ ছড়িয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কী।

ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব, সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের কঠোর আইন প্রণয়নই পারে এই কলংকের হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। কিন্তু আইন-ই তো বেআইনি গ্যাড়াকলে বন্দি। বিচারহীনতা, বিচার বিলম্বিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে ধর্ষক। বলা হয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পৃষ্ঠপোষক। সত্যিই তাই। অপরাধী সাজা না পেলে তার অপরাধ করার স্পৃহা আরও বেড়ে যায়। বেগমগঞ্জের সেই নির্যাতিতা জননীর কথাই ধরা যাক। নির্যাতন হওয়ার ৩২ দিন পরেও রাষ্ট্রশক্তি নির্বিকার, তারা নাকি ঘটনা সম্পর্কে অবহিত-ই নন। নির্যাতনের ভিডিও দেখে জনমনে ক্ষোভের উদ্রেক ঘটলে তখন তারা নড়েচড়ে বসেন। এই ৩২ দিনের মাঝে নিশ্চয়ই নরপশুরা বসে নেই, হয়ত হানা বসিয়েছে অন্য কোথাও। এর দায় তো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিতেই হবে।

আশার আলো এটাই যে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যদন্ড আইন জারি করা। তবে দ্রুত বিচারকার্য সমাধা করে প্রকৃত অপরাধী সাজা না পেলে আমাদের এই আশাতেও গুড়েবালি।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে প্রতিদিন গড়ে চারজন নারী ধর্ষণের শিকার হন, সেখানে শেষ অব্ধি সাজাপ্রাপ্ত হন মাত্র ৩ শতাংশ! অর্থাৎ প্রতিবছর ধর্ষণের মামলার নিষ্পত্তি হয় চার ভাগেরও কম। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব বিচার-প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। সংবিধান অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যেই বিচারকার্য শেষ করার কথা থাকলেও কোন কোন ক্ষেত্রে তা ১০/২০বছর পর্যন্তও গড়ায়। শিল্পপতি লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমান ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চূড়ান্ত রায় পেতে সময় লেগেছিল ১৮ বছর। এই দীর্ঘসূত্রিতার ফলে নির্যাতিতাকে বারবার নিজের সাথে ঘটা ভয়াল দৃশ্য প্রমাণের চেষ্টাই তাকে আবার নির্যাতন করে বসে। স্বভাবতই সে বাধ্য হয় পিছপা হতে। তাই এসব কিছুর লাগাম না টেনে ধরে কথার ফুলঝুরিতে মেতে উঠার অর্থ হল; মন্ত্রবিহীন যজ্ঞতে গ্যালন গ্যালন ঘি ঢালার নামান্তর।
মোঃশাকিল হোসেন
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ফোন নংঃ ০১৭৭৯৮১৫০২৭
sakilahsan.007@gmail.com

সর্বশেষ নিউজ