৩০, নভেম্বর, ২০২০, সোমবার

বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় পুলিশের ভাবমূর্তি

বিশ্বব্যাপি পুলিশের দর্শন এবং মূলনীতি হলো অপরাধ দমন এবং অনিয়মকে প্রতিহত করা। এই দর্শন এবং মূলনীতিকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাষ্ট্র গঠন করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ পুলিশের নিকট হতে সারা বছরই ইতিবাচক পুলিশিং সেবা প্রত্যাশা করে। জনগণের প্রত্যাশা আমাদের দেশে পুলিশিং ব্যবস্থায় এমন কালচার তৈরি করা হবে যেখানে প্রত্যেক সদস্য আধুনিক ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় জনমুখী পুলিশিং এর চর্চা করবে এবং ফলশ্রুতিতে সেখানে জবাবদিহীতা, দায়বদ্ধতা, পদায়ন ও নিয়োগ বাণিজ্য রহিতকরণ, অন্যদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধকরণ, ঘুষের প্রচলন বন্ধ করা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের পদন্নতি নিশ্চিত করা, প্ররোচনায় নির্দোষীকে অভিযুক্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা রদকল্পে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণই বাংলাদেশের পুলিশের মর্যাদা ও সেবার মানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

পুলিশ কিভাব কাজ করলে আপামর জনসাধারণের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারবে সে বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালেই। সে কথাগুলি যদি পুলিশ সদস্যগণ হ্নদয়ে ধারন করতো এবং কর্ম জীবনে কাজে লাগাতো, তবে আজ জাতির কাছে পুলিশ ভাবমূর্তি করনো কালীন মানবিক পুলিশের ন্যায় ঈর্ষণীয় অবস্থায় বিরাজ করতো। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পুলিশ সপ্তাহে ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন। যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন— ‘‘ত্রিশ লক্ষ লোকের সঙ্গে পুলিশের অনেক লোকও আত্মত্যাগ করেছে। তাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। তাদের সম্মান আপনারা রক্ষা করবেন। আপনাদের কর্তব্য অনেক। যেকোনও সরকারের, যেকোনও দেশের সশস্ত্র বাহিনী গর্বের বিষয়। একটা কথা আপনাদের ভুললে চলবে না। আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন, জনগনের পুলিশ। আপনাদের কর্তব্য জনগণের সেবা করা, জনগণকে ভালোবাসা, দুর্দিনে জনগণকে সাহায্য করা। আপনাদের বাহিনী এমন যে, এর লোক বাংলাদেশের গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। আপনাদের নিকট বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি জিনিস চায়। তারা যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তারা আশা করে, চোর, বদমাইশ, গুন্ডা, দুর্নীতিবাজ যেন তাদের ওপর অত্যাচার করতে না পারে। আপনাদের কর্তব্য অনেক। বাংলাদেশের মানুষ গরীব, যুগ যুগ ধরে তারা শোষিত হয়েছে। আপনারা ভাড়াটিয়া নন। আপনারা বাংলা মায়ের ছেলে। তাদের অবস্থা আপনারা জানেন। গ্রামে গ্রামে আপনারা দেখেছেন মানুষ হাহাকার করে, না খেয়ে কষ্ট পায়। বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে কষ্ট আরও বাড়ছে। আমি আপনাদের কাছে এই আশা করব যে, আপনারা হবেন গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ যেন আপনাদের জন্য গর্ব অনুভব করতে পারে। আপনারা যদি ইচ্ছা করেন, আপনারা যদি সৎ পথে থেকে ভালোভাবে কাজ করেন, যদি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকেন, তাহলে দুর্নীতি দমন করতে পারবেন। আপনারা যদি আজকে ভালোভাবে থাকেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, যে থানায় ভালো অফিসার আছেন এবং ভালোভাবে কাজ করছেন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনও প্রকার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ, তারা সবসময় সজাগ থাকেন এবং দুষ্টকে দমন করেন। যিনি যেখানে রয়েছেন, তিনি সেখানে আপন কর্তব্য পালন করলে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে না।

মনে রাখবেন, আপনাদের মানুষ যেন ভয় না করে। আপনাদের যেন মানুষ ভালোবাসে। আপনারা জানেন, অনেক দেশে পুলিশকে মানুষ শ্রদ্ধা করে। আপনারা শ্রদ্ধা অর্জন করতে শিখুন। জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই কথা মনে রাখতে হবে। আমি বা আপনারা সবাই মৃত্যুর পর সামান্য কয়েক গজ কাপড় ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই নিয়ে যাব না। তবে কেন আপনারা মানুষকে শোষণ করবেন। মানুষের ওপর অত্যাচার করবেন? গরীবের ওপর অত্যাচার করলে আল্লাহর কাছে তার জবাব দিতে হবে। যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে, তাদের সেবা করুন। যাদের জন্য, যাদের অর্থে আজকে আমরা চলছি, তাদের যেন কষ্ট না হয়, তার দিকে খেয়াল রাখুন। আর যারা অন্যায় করবে, আপনারা অবশ্যই তাদের কঠোর হস্তে দমন করবেন। কিন্তু সাবধান, একটা নিরপরাধ লোকের ওপরও যেন অত্যাচার না হয়। তাতে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। আপনারা সেই দিকে খেয়াল রাখবেন। আপনারা যদি অত্যাচার করেন, শেষ পর্যন্ত আমাকেও আল্লাহর কাছে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কারণ, আমি আপনাদের জাতির পিতা, আমি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আমি আপনাদের নেতা। আমারও সেখানে দায়িত্ব রয়েছে। আপনাদের প্রত্যেকটি কাজের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমার ঘাড়ে চাপে, আমার সহকর্মীদের ঘাড়ে চাপে। এজন্য আপনাদের কাছে আমার আদেশ রইলো, আপনারা মানুষের সেবা করুন। মানুষের সেবার মতো শান্তি দুনিয়ায় আর কিছুতে হয় না। একটা গরিব যদি হাত তুলে আপনাকে দোয়া করে, আল্লাহ সেটা কবুল করে নেন। এজন্য কোনদিন যেন গরিব-দুঃখীর ওপর, কোনদিন যারা অত্যাচার করেনি, তাদের ওপর যেন অত্যাচার না হয়।

যদি হয়- আমাদের স্বাধীনতা বৃথা যাবে। আমার ভাইয়েরা, এক দল লোকের পয়সার লোভ অত্যন্ত বেড়ে গেছে। পয়সার জন্য তাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। মৃত্যু র পর এ পয়সা তাদের কোন উপকারে আসবে না। এই পয়সায় যদি তাদের সন্তানরা মানুষ না হয়, তাহলে তারা নানা অপকর্মে তা উড়িয়ে দেবে। তাতে তারা লোকের অভিশাপ কুড়িয়ে আখেরাতেও শান্তি পাবে না। তাই আমি সকলকে অনুরোধ করি, রাত্রে একবার চিন্তা করবেন, সারাদিন ভালো কিছু করেছেন, না মন্দ করেছেন। দেখবেন, এতে পরের দিন মনে আশা জাগাবে যে, আমি ভালো কাজ করতে পারি। আজ হতে শুরু হোক আপনাদের নতুন জীবন। এই পুলিশ সপ্তাহ থেকে আপনারা নতুন মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করুন, যাতে বাংলাদেশের পুলিশ দুনিয়ার বুকে গর্বের বস্তু হয়ে উঠতে পারে। আমি চাই, আপনারা মানুষকে ভালোবাসুন। তাহলেই শান্তি আসবে। সব পুলিশ কর্মচারী যিনি যেখানেই থাকুন না কেন, সবাই যেন সৎ হওয়ার এবং মানুষকে ভালোবাসার সুযোগ পান। প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা এমন পুলিশ গঠন করবো, যে পুলিশ হবে মানুষের সেবক, শাসক নয়। সৎ পথে থাকতে হবে। ’’

সম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অদৃশ্য অনুজীব করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ যেভাবে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। তৃনমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানবিক পুলিশিং এর গল্প সবার মুখে মুখে ছিল, আপামর জনগণ করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশকে নতুন রুপে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিল। আপামর জনসাধারণ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী, রাজনীতিবিদ প্রত্যেকেই একযোগে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকাকে ঈর্ষণীয় অবস্থায় গ্রহণ করেছিল। মানবিক পুলিশের অনন্য উদাহরণ হিসেবে করোনা সংকট মোকাবেলায় পুলিশের বৈচিত্র্যময় ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কিন্তু আজ পুলিশের ভাবমূর্তি গুটি কয়েক পুলিশ সদস্য কৃতকর্মের জন্য বারবার ক্ষুন্ন হচ্ছে। জাতির কাছে বারবার পুলিশ হিসাবে নিজেদের মাথা নত করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুলতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাব বিস্তর। তারপরও সবাই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, সারা বছরই প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে পুলিশই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সমালোচিত। ফলশ্রুতিতে পুলিশ সম্বন্ধে নানা রকমের নেতিবাচক খবরের শিরোনামও পত্রিকার পাতায় মোটা অক্ষরে ছাপা হয়ে থাকে। সেসব সমালোচনা বহুলাংশে সঙ্গতও। পুলিশ বাহিনীর গুটি কয়েক সদস্য প্রভাব, প্রতিপত্তি, পক্ষপাতিত্ব, নিয়োগ, পদায়ন জটিলতা, রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি প্রভূত কারণে নিজেদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়ে থাকে। থানা ফাঁড়িতে পর্যাপ্ত ও আনুসাঙ্গিক সুযোগসুবিধা অপ্রতুল থাকলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় বর্তমান পুলিশের থানা ফাঁড়ির ৪০% দৃষ্টিনন্দন বিল্ডিং ও আবাসস্থল তৈরি হওয়ায় থানা ফাঁড়ির স্থাপনা সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হয়েছে। আসুন জনগণের দ্বারপ্রান্তে পুলিশিং সেবা পৌছাতে নতুন করে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের মর্ম বাণী আমাদের হ্নদয়ে ধারন করে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণোয় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, সংস্কৃতি, অভিবাসন, অভিগমন ইত্যাদিকে বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে জনবান্ধব পুলিশিং ব্রতী নিয়ে পুলিশিং চর্চা অব্যাহত রাখি। পুলিশের নিরলস ও আন্তরিকতায় ভাল কাজের মধ্যে দিয়ে একদিন পুলিশের ক্রান্তিকাল হয়তো শেষ হবে। আপামর জনগণ পুলিশকে নতুন রুপে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে। পুলিশের পেশাদারিত্বের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হবে।

লেখকঃ মোহাম্মদ সাব্বির রহমান
অফিসার ইনচার্জ, নানিয়ারচর থানা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

সর্বশেষ নিউজ